শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে


বিশেষ প্রতিনিধি , আপডেট করা হয়েছে : 04-02-2026

শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ এ রাজনৈতিক দলসমূহের ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তি ও জাতীয়ভাবে শ্রমিক ইস্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এবং শ্রমিক অধিকার সংগঠনসমূহ সম্মিলিত উদ্যোগে গঠিত ‘শ্রমিক অধিকার জাতীয় এডভোকেসি এলায়েন্স’ এর একটি আলোচনা অনুষ্ঠান গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। শ্রম বিষয়ক একাডেমিয়া, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, গবেষক এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে অনুষ্ঠিত এই আলোচনাটি এলায়েন্স সচিবালয়, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ–বিলস আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা–আইএলও-এর সহযোগিতায় আয়োজন করে। 

অনুষ্ঠানে আইএলও বাংলাদেশ এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, আইএলও চায় শ্রমিক ইশতেহার এবং শ্রম সংস্কার কমিশনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হোক, যাতে করে ভারসাম্যপুর্ণ শিল্প সম্পর্ক নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শিল্প-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানীতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। 

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকার কর্মী শাহীন আনাম বলেন, শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং সকলকে নিয়ে এই দাবি বাস্তবায়নে জোর আওয়াজ তুলতে হবে, যাতে নির্বাচিত সরকারের ইশতেহার বাস্তবায়ন জবাবদিহিতার অন্তর্ভুক্ত হয়।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ শ্রমিক ইশতেহারে মানবিক মর্যাদা, শোষণহীন কর্মপরিবেশ ও সুযোগের সমতার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন। তবে আগামী নির্বাচন শান্তিপুর্ণ না হলে সকল দাবীই গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট সোহরাব হাসান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সংহতি প্রকাশ করে শ্রমিকরাও মাঠে নেমে এসেছেন এবং অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন। সুতরাং শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়নে শ্রমিকদের মাঠে থাকতে হবে। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে বলে তিনিও আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

এলায়েন্স এর সিনিয়র ‍যুগ্ম আহবায়ক মেজবাহউদ্দীন আহমেদ বলেন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, ন্যায্য মজুরী এবং শোভন কাজের পরিবেশ রাজনৈতিক দলগুলোর আমলে নিতে হবে।

সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়নে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে নিয়মিত তাগিদ দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে করে যে নির্বাচিত সরকারই আসুক না কেন এই ইশতেহার এর ভূমিকা, প্রয়োজনীয়তা যেন তাদের কাছে নিষ্ক্রিয় হয়ে না যায়।

আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নাজমা আক্তার বলেন, লিঙ্গ সহিংসতা ও নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসন করতে না পারলে শ্রমিক ইশতেহারের বাস্তবায়ন পরিপূর্ণতা পাবে না।

নাগরিক উদ্যোগ এর নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরের শ্রমিকদের অধিকার বাস্তবায়ন না হলে শ্রমিক ইশতেহারের বাস্তবায়ন পূর্ণাঙ্গ হবে না। তিনি শ্রমিকদের শুধু উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপকরণ কৌশল হিসাবে বিবেচনা না করে নীতিগত পরিবর্তন আনার ওপর জোর দেন।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এর গবেষক মাহিন সুলতান বলেন, নারীদের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে হবে যাতে নারীবান্ধব কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। তিনি মন্তব্য করেন, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কোন সহায়ক কাজ নয়, বরং তারা সমান শ্রম দেন, ফলে তাদের সমান অংশীদার হিসাবে অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক ও গবেষক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির সময়ে শ্রমিককে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে হবে। বয়স্ক মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও তাদের সঞ্চয় নিশ্চিত করতে না পারলে তাদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন।

পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল তার বক্তব্যে শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়নে ন্যায্য রূপান্তর নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকারের পুর্বশর্ত হিসেবে তাদের দর্শনগত অঙ্গীকারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেন।

গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী আবুল হোসাইন বলেন, নারী অধিকার নিশ্চিত এবং নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণকে পাশ কাটিয়ে শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়ন অর্থহীন হয়ে পড়বে। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক সহিংসায় নারী অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

শ্রমিক কল্যান ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো শ্রমিকদের ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করলেও নীতি প্রণয়েনের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অংশীদারিত্ব থাকে না এবং নির্বাচন সম্পন্ন হবার পর শ্রমিক ইস্যুগুলোর অগ্রাধিকার আর থাকে না। এ অবস্থার নিরসন হওয়া দরকার। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শ্রমিকদের বিরুদ্ধে রাস্ট্রীয় কাঠামো ব্যবহার করে দমন পীড়ন নীতি বন্ধ করতে না পারলে শ্রমিকের অধিকার সঠিক বাস্তবায়ন হবে না।

অনুষ্ঠানে ত্রিপক্ষীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট আনোয়ার হোসেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) এর যুগ্ম সমন্বয়কারী আহসান হাবীব বুলবুল, শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরাম (এসএনএফ) এর সদস্য সচিব সেকেন্দার আলী মিনা, কর্মজীবী নারীর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক সানজিদা সুলতানা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সহযোগী অধ্যাপক মোস্তাফিজ আহমেদ, আইএলও ইআইআই প্রকল্পের জাতীয় সমন্বয়ক নওশিন শাহ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আবু সাইদ খান, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের অর্থ সম্পাদক রুহুল আমিন, জাতীয় শ্রমিক জোটের যুগ্ম সম্পাদক সালেহ আহমেদ সহ গবেষক, প্রাবন্ধিক, ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ, শ্রমিক অধিকার সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)