নিউ ইয়র্কে সামগ্রিক অপরাধ কমলেও ব্রঙ্কসে বাড়ছে


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 11-03-2026

নিউ ইয়র্কে সামগ্রিক অপরাধ কমলেও ব্রঙ্কসে বাড়ছে

নিউ ইয়র্ক সিটিতে সামগ্রিকভাবে অপরাধের হার কমলেও শহরের ব্রঙ্কস বরোতে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের এখন পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক সিটিতে সংঘটিত মোট হত্যাকাণ্ডের প্রায় অর্ধেকই ঘটেছে ব্রঙ্কসে। ব্রঙ্কসে এ বছরের শুরু থেকে রবিবার পর্যন্ত শহরের মোট ৩২টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১৬টিই ঘটেছে। একই সময়ে শহরের মোট গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের ৪৫ শতাংশ এবং গুলির ঘটনার ৪৪ শতাংশও এ বরোতেই ঘটেছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, সামগ্রিকভাবে নিউ ইয়র্ক সিটিতে অপরাধের হার কমেছে।

নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি) কমিশনার জেসিকা টিস জানিয়েছেন, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে শহরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন হত্যাকাণ্ড ও গুলিবিদ্ধের রেকর্ড হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে গত রোববার পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক সিটিতে ৩২টি হত্যাকাণ্ড এবং ৯৯ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৫৫টি হত্যাকাণ্ড এবং ১১২ জন গুলিবিদ্ধ। তবে ব্রঙ্কসে পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। একই সময়ের তুলনায় সেখানে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ এবং গুলিবিদ্ধের সংখ্যা বেড়েছে ১৫ শতাংশ। এনওয়াইপিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছর শহরের মোট হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশই ঘটছে ব্রঙ্কসে।

ব্রঙ্কসের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ডার্সেল ক্লার্ক এক বিবৃতিতে বলেন, এ পরিস্থিতি দুঃখজনক এবং অসহনীয়। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্রঙ্কস পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত। তিনি বলেন, দারিদ্র‍্য, কর্মসংস্থান, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট-এসবই অপরাধের মূল কারণ। ১৯৮০-এর দশকে যেসব এলাকায় সহিংসতা ছিল, আজও সেই এলাকাগুলোতেই একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে ব্রঙ্কসে। ১ জানুয়ারি অভিবাসী উবার চালক ইসা এমবলো আইজ্যাক (৫৫) সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বিরোধের জেরে গুলিতে নিহত হন। তিনি গাড়ির ভিতরে বসা অবস্থায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। নিহত চালক পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোতে বসবাসকারী স্ত্রী ও চার সন্তানের জন্য উপার্জন করতেন।

এছাড়া ১০ ফেব্রুয়ারি ব্রঙ্কসের ১৭০তম স্ট্রিট সাবওয়ে স্টেশন-এ সাবওয়ে প্ল্যাটফর্মে গুলিতে নিহত হন এড্রিয়ান দাওদু (৪১)। পরদিনই ব্রঙ্কসের কিংসব্রিজ এলাকায় গুলিতে নিহত হয় ১৬ বছর বয়সী ছাত্রক্রিস্টোফার রেডিং। একই ঘটনায় আরো দুই কিশোর-কিশোরী আহত হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি গ্যাং-সম্পর্কিত বিরোধের সঙ্গে জড়িত। আরেকটি ঘটনায় স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে গুলিতে নিহত হয় ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী লামার সিমন্স। দিনের আলোতেই তার বুকে গুলি করা হয়। সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনায়, ৬ মার্চ ব্রঙ্কসের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের লবিতে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় ২৭ বছর বয়সী জেভন্টে সিমন্সকে। এসব ঘটনার বেশ কয়েকটিতে এখনো কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।

সহিংসতার এ প্রবণতার পেছনে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। অ্যান্টি-ভায়োলেন্স সংগঠন ব্রঙ্কস রাইজেস অ্যাগেইনস্ট গান ভায়োলেন্সের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেভিড কাবা বলেন, ব্রঙ্কস নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ৬২টি কাউন্টির মধ্যে বহু সামাজিক সূচকে সবচেয়ে নিচের দিকে অবস্থান করছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ব্রঙ্কসের গড় পারিবারিক আয় ছিল ৪৮ হাজার ৬১০ ডলার, যা নিউ ইয়র্ক সিটির গড় আয়ের তুলনায় প্রায় ৩৯ শতাংশ কম। একই সময়ে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে শহরজুড়ে গড় হার ১৮ দশমিক ২ শতাংশ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সূচকেও পিছিয়ে রয়েছে এই বরো। হাইস্কুল গ্র‍্যাজুয়েশন হার ৭৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যেখানে শহরের গড় ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ। জীবন প্রত্যাশাও তুলনামূলক কম।

ডেভিড কাবা বলেন, যে কোনো সমৃদ্ধ কমিউনিটিতে ভালো স্কুল, ভালো স্বাস্থ্যসেবা, ভালো আবাসন এবং কর্মসংস্থান থাকে। ব্রঙ্কসে এসব ক্ষেত্রে উন্নতি না হলে সহিংসতার চক্র ভাঙা কঠিন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট। কমিশনার জেসিকা টিশ জানিয়েছেন, ব্রঙ্কসে অতিরিক্ত ২০০ পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করা হবে। এছাড়া ব্রঙ্কসকে উত্তর ও দক্ষিণ, দুইটি আলাদা পুলিশ কমান্ডে ভাগ করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যা অন্যান্য বরোর মতো প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করবে। পুলিশের বিশেষ ইউনিট যেমন হত্যাকাণ্ড তদন্ত দল, প্রমাণ সংগ্রহকারী দল, মাদকবিরোধী ইউনিট এবং অটো ক্রাইম ইউনিটও সেখানে বাড়ানো হবে। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ডার্সেল ক্লার্ক বলেন, এই উদ্যোগ ব্রঙ্কসকে অন্যান্য বরোর সমান সুযোগ দেবে এবং অপরাধ প্রতিরোধ ও তদন্তে সহায়তা করবে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সহিংসতা কমাতে শুধু আইন প্রয়োগই নয়, বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নয়নের মতো মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানও জরুরি।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)