ঢাকা কলেজের ৮৫ ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আয়োজনে এবারের ইফতার মাহফিঠ শেষমেশ মিলনমেলাতেই পরিণত হলো। যানজট কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পেট্রোল-ডিজেলের সংকটেও এ ইফতার মাহফিল বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ওইদিন তারা তারা হৃদয়ের টানে দূরদূরান্ত থেকে মিরপুরের পল্লবীতে ৮৫ ব্যাচের ইমতিয়াজ টুটুলের বাসার নিচে রেস্টুরেন্টে ঠিক সময়েই উপস্থিত হয়ে যায় ।
গত ১০ মার্চ ছিল এ ইফতার মাহফিল। তবে এবারের আয়োজনে ছিল ভাবগম্ভীর পরিবেশে। কেননা ইতোমধ্যে অনেক বন্ধুদের হারিয়েছে ডিসি কেইভ-৮৫ এর ব্যাচের এ প্রাক্তণ শিক্ষার্থীরা। ঢাকা কলেজের ৮৫ ব্যাচের প্রাক্তন এসব শিক্ষার্থী, যারা নিজেদের ডিসি কেইভ-৮৫ হিসেবেই পরিচিত করে ফেলেছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
শোকার্ত বন্ধুর পাশে
তবে এ গ্রুপের একজন গত বছর নির্মমভাবে একা হয়ে গেছেন। ডিসি কেইভের এ বন্ধু হলেন আ জ ম আজিজুল ইসলাম পলাশ। পেশায় সে একজন শিক্ষক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে শাহজাহান রোডের একটি ফ্ল্যাটে তারই স্ত্রী লায়লা আফরোজ (৪৮) ও মেয়ে নাফিসা লাওয়ালকে (১৫) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এঘটনার পর থেকে বন্ধু আ জ ম আজিজুল ইসলাম পলাশ বলা চলে একেবারে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। কিন্তু ইফতার মাহফিলে তাকে নিয়ে আনা হয়। জানান দেওয়া হয় যে ডিসি কেইভের বন্ধুরা তার পাশে আছে। তাকে সশরীরে ইফতার মাহফিলে নিয়ে আনতে অনেক দূর থেকে নিজ গাড়িতে করে নিয়ে আসেন ডিসি কেইভেরই আরেক বন্ধু স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল সহযোগী অধ্যাপক গাইনি ডা. মোহাম্মদ এনামুল হক। বিষয়টি অন্য বন্ধুদের মধ্যে একটা অন্যরকম আবহ তৈরি করে।
না ফেরার দেশের বন্ধুদের জন্য দোওয়া
এদিকে এপর্যন্ত ঢাকা কলেজের ৮৫ ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের, যারা না ফেরার দেশে চলে গেছেন তাদের জন্যও দোওয়ার আয়োজন করা হয়। এ সময় প্রিয় বন্ধুদের জন্য দোওয়া চেয়ে আহাজারিতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি কেউ। প্রাণভরে তারা না ফেরার দেশে চলে যাওয়া বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আশরাফুল ইসলাম, বিশিষ্ট দন্তচিকিৎসক যে দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলে গেছেন সেই ডা. কাজী সাজ্জাদ হোসাইন রিপনের পাশাপাশি দিদার, টিটু, কাঞ্চনসহ অনেকের জন্য আল্লাহর দরবারে তাদের মাগফিরাতের জন্য দোয়া চাওয়া হয়। ইফতারের আগে বন্ধুদের জন্য মকসুদুর রহমান অংশুর কোরআন তেলাওয়াত পুরো পরিবেশকে এক অনন্য রুহানিয়াতে ভরে তোলে। এরপর বন্ধু সিরাজুল মুনির টিপুর সুন্দর, হৃদয়স্পর্শী ও আবেগঘন মোনাজাত সবার চোখকে অশ্রুসজল করে তোলে।
অসহায় শিশুদের পাশে ৮৫
এদিকে ইফতার মাহফিলের আরেক আয়োজন ছিল যা প্রশংসনীয় বলা চলে। ডিসি কেইভের ইমতিয়াজ টুটুলের পরিচালনায় এতিম মাদরাসার জন্য অর্থ সাহায্য করা হয়। এ মহৎ কাজে প্রতিবছরই বন্ধুরা কোনো না কোনো সময় সাহায্য সহযোগিতা করে থাকে। টুটুলের এতিম খানাটি হলো কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবের চন্ডিবেরে হাজি আসমত আলী এতিম বালিকা পরিবার। তবে এখানে প্রতি ঈদেই নয়, এ অসহায় শিশুদের পাশে প্রতি বছরই ঢাকা কলেজের ৮৫ ব্যাচের প্রাক্তণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করে থাকে। খোলা হয় বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প। জানিয়ে দেয় যে, এসব অসহায় শিশু একা নয়। তাদের সুখ-দুঃখের সময় পাশে আছে ডিসি কেইভ-৮৫।
বাদ পড়েনি সেলফি তোলা
ইফতার শেষে গুরুগম্ভীর শোকাবহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে শুরু হয় হইহুল্লোড় আর দলবেঁধে ছবি তুলে যে যার মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট করে দেওয়ার প্রতিযোগিতা। অবশ্য এ কাজে সবেচেয়ে বেশি পারদর্শী বন্ধু জাহাঙ্গীর আলমের কদর বেড়ে যায়। এছাড়া ওইদিন এমন ব্যস্ততার পাশাপাশি বন্ধুদের আপ্যায়নে তার আন্তরিকতা সবার দৃষ্টি কেড়েছে। দেখা গেল রাত গড়িয়ে যাওয়ার মতো অবস্থাতেও বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি তোলার যেন শেষ হচ্ছিল না। চলে রেস্টুরেন্টেরে পাশে সড়কের ফুটপাতে চা খাওয়া। এরপর তারাবির নামাজ পড়া শেষে ছিল বিশেষ খাবারের আয়োজন। প্রায় রাত ১১টা পর্যন্ত চলে এ আয়োজন। শেষে ‘আবার দেখা হবে বন্ধু’ বলে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে।