জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেছে বাংলাদেশে এখন জঙ্গি তৎপরতা নেই। আবার সরকারের একজন উপদেষ্টা বলেছেন জঙ্গি তৎপরতা আছে এবং নির্মূল করে শূন্যের পর্যায়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে। স্পর্শকাতর বিষয়ে দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দুই ধরনের বক্তব্য থেকে জাতি এবং বিশ্বসমাজ কি সংকেত পাচ্ছে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সব গোয়েন্দা সংস্থা। তার কাছে জঙ্গি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব, তৎপরতার সংবাদ থাকার কথা। আবার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে তথ্য পেয়ে থাকেন। তাহলে কি কোথাও সমন্বয়ের অভাব আছে? যদি সন্ত্রাস না-ই থাকবে, তাহলে সব বিমানবন্দরসহ কি পয়েন্ট ইনস্টলেশনসমূহে রেড অ্যালার্ট জারি হয়েছে কেন?
একটি রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে একটি নির্বাচিত সরকারকে মেটিকুলাস পরিকল্পনায় অপসারণ করে একটি অনির্বাচিত সরকার ১৮ মাস ক্ষমতায় ছিল। এমনকি সে আন্দোলনের সময়েও জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রচার করেছে আর অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস সময়ে মব সন্ত্রাস, ধ্বংসযজ্ঞে জঙ্গি সম্পৃক্ততা ছিল। রাষ্ট্রীয় মদদের অভিযোগ আছে। প্রকৃত পক্ষে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে জঙ্গি গোষ্ঠী নানা নাম, নানা পচয়ে গুপ্ত বা সুপ্ত সংগঠনের মাধ্যমে সন্ত্রাস চালিয়েছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকার কেউ আন্তরিকভাবে জঙ্গি তৎপরতা নির্মূলের চেষ্টা করেনি। অনেক ক্ষেত্রে বিরুদ্ধ মতো নির্মমভাবে দমনের চেষ্টা করেছে। বিএনপি আমলে সব জেলায় একসঙ্গে গ্রেনেড সন্ত্রাস, একুশে আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভেন্যুতে গ্রেনেড মেরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে নির্মূল করার চেষ্টা, আওয়ামী লীগ আমলে বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুলশান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি আক্রমণ, অন্তর্বর্তী সরকার আমলের গণভবন, ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু জাদুঘর, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ধ্বংসযজ্ঞ, ব্যাপক মব সন্ত্রাস কোনো কিছুর কিন্তু কূলকিনারা নির্মোহভাবে উদঘাটন করার কোনো আন্তরিক প্রয়াস কেউ নেয়নি। এমনকি বর্তমান সময়েও সংসদে রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে চলছে বাহাস। ২৪ ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে একপক্ষ ৭১-এর সমপর্যায়ে মর্যাদা দেওয়ার জন্য বাহাস করছে। ৫৫ বছর বয়সী বাংলাদেশে জন্য এগুলো কলঙ্কজনক।
জাতির কাছে বড় প্রশ্ন বাংলাদেশ কি আদৌ জঙ্গি সন্ত্রাস থেকে মুক্ত হতে পারবে? রক্ত, সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কি আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির নির্মম শিকারে পরিণত হয়ে চিরদিন জঙ্গি সন্ত্রাসের হুমকিতে থাকবে?
আজ পর্যন্ত জঙ্গির সঠিক সংজ্ঞা নিশ্চিত করা হয় নি। ৭১-এর পরাজিত জামায়াতে ইসলামী এখন উল্লেখযোগ্য নির্বাচিত সাংসদ নিয়ে সংসদে। একাত্তরে গণহত্যায় রাজাকার, আলশামস, আলবদর বাহিনী গঠন করে জামায়াত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিকাণ্ড লুটপাটে সক্রিয় সহযোগিতা করেছে। গণহত্যাকারী কয়েকজনকে বিচারে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। সে দণ্ডপ্রাপ্ত ঘৃণিতদের নিয়ে সংসদে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনেক দণ্ডিত আসামির দণ্ড মওকুফ করে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। অনেক সন্ত্রাসী জঙ্গিদের জেল ভেঙে পালানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত সংসদ এখন পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে সম্পৃক্ত কারো বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রতিদিন কোনো না কোনো গোষ্ঠী নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে মব সৃষ্টি করে জনজীবন বিপর্যস্ত করতো। সে প্রবণতা বর্তমান সরকারের দুমাসে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও নির্মূল হয়নি। তাহলে কি কোন পরাশক্তির ভয়ে নির্বাচিত সরকার মব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বিরত আছে। অথচ সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিন্তু ফৌজদারি অপরাধ। ফৌজদারি অপরাধ কিন্তু তামাদি হয় না।
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে এসেছে বিএনপি জোট। স্বাভাবিক নিয়মে সরকার পরিচালনার জন্য সরকারকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শিষ্টের পালন আর দুষ্টের দমন করতে হবে। আঞ্চলিক ভূরাজনীতি জঙ্গি সন্ত্রাস সৃষ্টি করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। অশুভ গোষ্ঠীর ন্যারেটিভে বিভ্রান্ত না হয়ে সরকারকে স্বচ্ছতার সাথে আইনগতভাবে সন্ত্রাসের মোকাবিলা করতে হবে। না হলে কিন্তু সরকারের সব সৃজনশীল কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত জঙ্গিগোষ্ঠীকে আইনগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হবে, ততদিন জঙ্গি তৎপরতার অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলবে না।