আবারও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেই বদান্যতা দেখাতে হলো। তাকেই সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি নিতে হলো, করতে হলো হস্তক্ষেপ। ঘটনা যখন একেবারে লেজেগোবরে করে ফেলা হয়েছে, ঠিক তখন তার-ই হস্তক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটে গেলো, যা রাজনৈতিক মহলে তার মহান বদান্যতাই প্রমাণ মিললেও অনেক প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে।
কী সেই ঘটনা
বগুড়ায় প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের দুই ছেলে ও পৈতৃক বাড়ির নামে তিন ইউনিয়ন গঠন করা নিয়ে বির্তকের সূত্র। এই শাহে আলম তারেক রহমানের খুবই কাছের মানুষ। তবে তার দুই ছেলে ও পৈতৃক বাড়ির নামে তিন ইউনিয়ন গঠন করা নিয়ে এই মানুষটিকে নিয়ে শুরু হয় বির্তক। বির্তক বহু জায়গায় গড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে গিয়ে সংসদেও পৌঁছায়। বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি কাড়ে। অন্যদিকে দিকে সারা দেশে এ বিষয়টির কারণে সরকারের বিরুদ্ধে দলীয় ও আত্মীয়করনের অভিযোগ চলে আসে।
ঘটনার বিবরণ হচ্ছে, ১১ জুন বগুড়ার জেলা প্রশাসকের সই করা প্রজ্ঞাপনে বগুড়ার শিবগঞ্জ ও নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের কথা জানানো হয়। এতে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়। শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন ইউনিয়নের নাম দেওয়া হয় ‘মীরবাড়ী’। অন্যদিকে নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় গঠন করা তিনটি ইউনিয়নের নাম রাখা হয় ‘সীমান্ত’,‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’। চারটি নতুন ইউনিয়নের মধ্যে মীরবাড়ী, সীমান্ত ও দিগন্ত-এই তিনটির নাম নিয়ে মূলত বিতর্ক তৈরি হয়। বলা হচ্ছে যে, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ির নামে একটি ইউনিয়ন এবং তাঁর দুই ছেলের নামে দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ির নাম ‘মীরবাড়ী’। তাঁর বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং ছোট ছেলে মীর সাকলাইন আলম দিগন্ত। আর এই ঘটনাই তোলপাড় এনে দেয় তারেক রহমানের মাত্র চার মাসের শাসনামলে।
আত্মপক্ষ সমর্থনে শাহে আলম
এদিকে এমন পরিস্থিতিতে সংসদে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দাবি করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসক যাচাই-বাছাই ও গণশুনানির মাধ্যমে নতুন ইউনিয়নগুলোর নাম নির্ধারণ করেছেন। নাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। নিজের দুই ছেলের নামের সঙ্গে ইউনিয়ন দুটির নাম মিলে যাওয়াকে কাকতালীয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর পাশাপাশি তিনি নামকরণের ঘটনাকে ‘মিরাকল’ (অলৌকিক) বলে দাবি করতেও কুন্ঠা হননি। কিন্ত তার এধরনের অপরিপক্ক বক্তব্য জনতার আদালতে গ্রহণযোগ্য হয়ই-নি, বরং নামকরণের প্রক্রিয়া ও গণশুনানি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পরিস্থিতি আরও লেজেগোবরে
এদিকে সারাদেশে এই নিয়ে যখন তোলপাড়, তখন একে আরও ঘোলাটে করে ফেলা হয় জাতীয় একটি দৈনিকের প্রকাশক-সম্পাদকসহ ছয় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক গ্রেফতারের ঘটনায়। দেশের ভেতরে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে সভাপতি নূরুল কবীর ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ এক বিবৃতিতে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অন্যদিকে এধরনের ঘটনায় সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে) মানহানির এ মামলা নিয়ে উদ্বেগ জানানোর মধ্য দিয়ে বিষয়টি আর্ন্তজাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়ে।
শেষ পরিণতি যা হলো
পরিস্থিতি এভাবে দ্রুত সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ইমেজের দিকে মোড় নিতে থাকলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-ই শেষ মেষ হস্তক্ষেপ করেন। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিল রেখে নামকরণ করা বগুড়ার দুটি ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেন তিনি। আর অন্যদিকে পুরো পরিস্থিতি লেজেগোবরে করে ফেলার পরে আসল ব্যক্তির টনক নড়ে..। জাতীয় একটি দৈনিকের প্রকাশক-সম্পাদকসহ ছয় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক গ্রেফতারের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। একই সঙ্গে তিনি বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের আহ্বান জানান। এর পাশাপাশি নিজের বা পরিবারের সদস্যদের নামে নতুন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ না করার অনুরোধ জানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) দেন প্রতিমন্ত্রী।
সবক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত কেনো?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই ধরনের একটি ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর পরিস্থিতি লেজেগোবরে করে ফেলার আগেই কেনো প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বিষয়টি সুরাহার দিকে নজর দিলেন না তার নিজের বিচার বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে? জানা যায় তার সঙ্গেতো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের বোঝাপাড়া আন্তরিক সম্পর্ক রযেছে। তিনি তো তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সময়ের পালস বুঝতে সক্ষম হবার কথা। কেনো বির্তক উঠার আগেই মীর শাহে আলম গর্জে উঠলেন না। এতটুক লোভ সামলাতে না পেরে কোনো সাফাই গেতে থাকেন নিজের দুই ছেলের নামের সঙ্গে ইউনিয়ন দুটির নাম মিলে যাওয়া কাকতালীয়? কোনো এঘটনাকে ‘মিরাকল’ (অলৌকিক) বলে দাবি করলেন? কেনো অসত্য দাবি করেন নাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে..। কোনো এমন বিষয়টি তার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পর্যন্ত গড়ালো? আর এর পাশাপাশি এখন সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে যে, এই মীর শাহে আলমদের মতো পরিবারতন্ত্র’ ও ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ কারীদের কারণেই সব কিছু এখনো কেনো প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গড়ায়? এর আগেও এবছরও দেখা গেলো যে রাজধানীতে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে ঈদের পরের দিন বিকেলে নিজেই গাড়ি চালিয়ে বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখে আসতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। তা-ই সব্রা আগে প্রশ্ন হচ্ছে একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে কেনো সব তদারকি করতে হবে? বাকিরা কি সরকারের কোনো পার্ট-ই না? না-কি প্রধানমন্ত্রী তারেক রমানের বাইরে এদের অবস্থা ‘আমার বলার কিছু ছিল না, চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে চলে।’