ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন অভিযান ঘিরে মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজসহ কয়েকজন ডেমোক্রেটিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জারি করা ফেডারেল সমন বাতিল করে দিয়েছেন এক ফেডারেল বিচারক। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, এ সমনগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল আইনগত তদন্ত নয়, বরং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি এবং কর্মকর্তাদের হয়রানি করা। গত ২২ জুন প্রকাশিত ৭৫ পৃষ্ঠার রায়ে ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অব মিনেসোটার বিচারক প্যাট্রিক শিল্টজ মন্তব্য করেন, ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (ডিওজে ) গ্র্যান্ড জুরি প্রক্রিয়াকে বৈধ ফৌজদারি তদন্তের পরিবর্তে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। তিনি বলেন, সমনের মাধ্যমে যে তথ্য চাওয়া হয়েছিল তার সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো অপরাধের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত দুর্বল, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অস্তিত্বহীন।
মামলার সূত্রপাত ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মিনিয়াপোলিস-সেন্ট পল এলাকায় পরিচালিত ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক অভিবাসন অভিযানকে কেন্দ্র করে। ওই অভিযানে হাজার হাজার ফেডারেল এজেন্ট অংশ নেন এবং শত শত অভিবাসীকে আটক করা হয়। অভিযানের সময় মিনেসোটার ডেমোক্রেটিক নেতৃত্ব প্রকাশ্যে এর সমালোচনা করে এবং স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে ফেডারেল অভিবাসন আইন বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানায়।
এরপর ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস গভর্নর টিম ওয়ালজ, মিনেসোটার অ্যাটর্নি জেনারেল কিথ এলিসন, মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে, সেন্ট পলের মেয়র কাওলি হার এবং হেনেপিন ও র্যামসি কাউন্টির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। সমনের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে এক বছরেরও বেশি সময়ের ই-মেইল, টেক্সট বার্তা, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ, নীতিগত নথি এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত আলোচনা ও সিদ্ধান্তের রেকর্ড চাওয়া হয়েছিল।
বিচারক শিল্টজ তার রায়ে বলেন, সমনে চাওয়া অধিকাংশ নথিই সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত রাজনৈতিক বক্তব্য, নীতিগত আলোচনা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরকারি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি আরো উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী কোনো অঙ্গরাজ্যকে ফেডারেল সিভিল অভিবাসন আইন বাস্তবায়নের জন্য নিজস্ব জনবল বা অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করা যায় না।
রায়ে বিচারক বলেন, বিচার বিভাগ কোনো প্রকৃত ফৌজদারি তদন্ত পরিচালনা করছে বলে প্রতীয়মান হয় না; বরং তারা অন্য উদ্দেশ্যে গ্র্যান্ড জুরি প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। তিনি আরো বলেন, সমন জারির পক্ষে একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্তমূলক কারণও বিচার বিভাগ দেখাতে পারেনি এবং প্রমাণগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে এসব পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল।
রায়ের পর গভর্নর টিম ওয়ালজ একে আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্তকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এবং এ মামলা তার একটি উদাহরণ। ওয়ালজের ভাষায়, মিনেসোটা থেকে শুরু করে পুরো দেশেই আমরা এই প্রশাসনের আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি।
অ্যাটর্নি জেনারেল কিথ এলিসন বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। এটি প্রত্যেক আমেরিকানের জন্য উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত। মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে বলেন, এ তদন্ত কখনোই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল না। তার মতে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণের পক্ষে কথা বলার অধিকার রয়েছে এবং সরকারের নীতির সমালোচনা করা কোনো অপরাধ হতে পারে না। সেন্ট পলের মেয়র কাওলি হারও অভিযোগ করেন, তাদের শহর অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় অবস্থান নেওয়ায় রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার হয়েছে।
মামলাটি এমন সময় সামনে এলো যখন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পৃথকভাবে মিনেসোটার সামাজিক সেবা কর্মসূচিতে কথিত জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তের জন্য বিচার বিভাগকে আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও বিচার বিভাগ এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে বলে জানায়নি। ওয়ালজ ও এলিসন উভয়েই এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ একাধিকবার সামনে এসেছে। সাবেক এফবিআই পরিচালক জেমস কোমি এবং নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসের বিরুদ্ধে আনা মামলাও আদালতে খারিজ হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি গ্র্যান্ড জুরি বিচার বিভাগের চাওয়া অভিযোগপত্র অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মিনেসোটা মামলার এ রায় শুধু গভর্নর ওয়ালজ বা রাজ্যের অন্যান্য কর্মকর্তাদের জন্য নয়, বরং পুরো যুক্তরাষ্টের অঙ্গরাজ্যগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নজির। এটি পুনরায় স্পষ্ট করেছে যে ফেডারেল সরকার অভিবাসন নীতি নির্ধারণ করতে পারলেও অঙ্গরাজ্যগুলোকে সে নীতি বাস্তবায়নে বাধ্য করতে পারে না এবং রাজনৈতিক মতভেদের কারণে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত চালানোর ক্ষেত্রেও আদালত কঠোর অবস্থান নেবে।