জর্ডানের কুসেইর আম্রা


হাবিব রহমান , আপডেট করা হয়েছে : 24-06-2026

জর্ডানের কুসেইর আম্রা

সকালটা ছিল আম্মানের পাথুরে শহরের চিরচেনা ব্যস্ততায় ঘেরা। আজ আমার গন্তব্য শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে জর্ডানের পূর্ব মরুভূমির গভীরে-অষ্টম শতাব্দীর এক বিস্ময়, কুসেইর আম্রা। ধুলোবালি আর ইতিহাসের এ ভ্রমণে আমার সফরসঙ্গী ট্যুর গাইড, প্রাণচঞ্চল ও সুন্দরী সারা।

আম্মান থেকে জর্ডানের মরুভূমির বুকচিরে হাইওয়ে ধরে যখন আমাদের গাড়ি ছুটছিল তখন দুপাশে কেবল ধূসর বালু আর পাথরের একঘেয়েমি। গাড়ি যখন আম্মানের ব্যস্ততা ছেড়ে পূর্বের শুষ্ক মরুভূমির দিকে এগোতে লাগলো দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছিল দ্রুত। পাথুরে জমিন, ধূসর আকাশ, আর দূরে কোথাও বেদুইন তাঁবুর আভাস-সব মিলিয়ে যেন এক অন্য জগত। কিন্তু গাড়ির ভেতরে আবহাওয়া ছিল একদম অন্যরকম। সারা ড্রাইভ করতে করতে গুনগুন করে একটা আরবীয় গানের সুর ভাঁজছিল। আমি ওর দিকে তাকাতেই ও চশমাটা কপালে তুলে রহস্যময় হাসি দিয়ে বললো-কি দেখছো, মরুভূমির রুক্ষতা নাকি আমার সুর?

আমি একটু দুষ্টুমি করে বললাম-মরুভূমি তো একঘেয়ে সারা, কিন্তু তোমার ওই সুরের ভাঁজে যেন জর্ডানের ইতিহাস নতুন করে প্রাণ পাচ্ছে। ও হো হো করে হেসে উঠে বললো, তুমি দেখছি কেবল কলম দিয়েই নও, মুখেও বেশ ভালো কথার জাল বুনতে পারো! তৈরি হও, সামনেই কিন্তু আরবের রাজাদের আমোদ-প্রমোদের জায়গা আসছে। আম্মান থেকে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যখন আমরা কুসেইর আম্রার সামনে দাঁড়ালাম, বাইরে থেকে ওটাকে খুব সাধারণ এক পাথুরে কাঠামো মনে হলো। কিন্তু ভেতরে পা রাখতেই বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হতে হলো। সারা আমার হাত ধরে দেওয়ালের দিকে ইশারা করলো।

ও বললো-দেখো, এগুলো সে উমাইয়া বংশের খলিফা দ্বিতীয় আল-ওয়ালিদের সময়ের ফ্রেস্কো। অষ্টম শতাব্দীতে যখন ইসলামের অন্যান্য স্থাপত্যে মানুষের ছবি আঁকা নিষিদ্ধ হচ্ছিল, এখানে তখন শিকার, উৎসব আর এমনকি গ্রিক দেবীদের আদলে ছবি আঁকা হয়েছে! দেওয়ালের সেই ম্লান হয়ে আসা কিন্তু উজ্জ্বল রঙের ছবিগুলো দেখে মনে হচ্ছিল সময় যেন থমকে আছে। সারা বলতে লাগলো-এটি ৮ম শতাব্দীতে উমাইয়া খলিফাদের সময় নির্মিত হয়। মূলত এটি ছিল একটি বিশ্রামাগার এবং স্নানাগার। কিন্তু এর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর দেওয়ালের চিত্রকর্মে।

আমি দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখি রঙিন ফ্রেস্কো, যেখানে রাজা, শিকার, এমনকি নক্ষত্রপুঞ্জ পর্যন্ত আঁকা। এ চিত্রগুলো ইসলামিক শিল্পের প্রাথমিক যুগের এক বিরল নিদর্শন, সারা বললো। আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম-তোমার মতোই অনেকটা, বাইরে থেকে সাধারণ কিন্তু ভেতরে অসাধারণ।

সারা হেসে বললো-তুমি কি সব গাইডকেই এভাবে বলো? আমি বললাম-না, শুধু যাদের গল্প আমার ভালো লাগে তাদেরই বলি। ও হাসলো। সারা আমাকে নিয়ে গেল পাশের হাম্মাম বা গোসলখানায়। ও ফিসফিস করে বললো-জানো, এ মরুভূমির মাঝখানেও রাজারা কেমন বিলাসিতায় দিন কাটাতেন? এ দেওয়ালগুলো যদি কথা বলতে পারতো, তবে কত গোপন প্রেম আর ষড়যন্ত্রের গল্প শোনা যেত!

আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম-দেওয়াল কথা না বললেও তোমার চোখের মণি তো বলছে সারা, সেখানেও কি কোনো গোপন গল্প লুকানো আছে? সারা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর আমার হাতটা একটু জোরে চেপে ধরে বললো-সব গল্প কি মুখে বলা যায়? কিছু তো নিজে থেকে বুঝে নিতে হয়। সারা বলে-স্থাপত্যশৈলী এবং বিরল এ ফ্রেস্কো বা দেওয়ালচিত্রের অনন্য সমাহারের কারণে ১৯৮৫ সালে ইউনেসকো কুসেইর আম্রাকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে।

ফেরার পথে মরুভূমির একদম গাঘেঁষা এক স্থানীয় রেস্তোরাঁয় বসলাম আমরা। ক্লান্ত দুপুরে আমাদের পাতে এল জর্ডানের জাতীয় খাবার ‘মানসাফ’ দইয়ের সসে রান্না করা নরম ভেড়ার মাংস আর সুগন্ধি জাফরানি ভাতের সে স্বাদ জিভে জল এনে দেয়। সারা মাংসের হাড় থেকে পরম মমতায় নরম অংশটা আলাদা করে আমার পাতে তুলে দিলো। ও বললো, ‘জর্ডান ভ্রমণ অসম্পূর্ণ যদি না তুমি মানসাফের প্রেমে পড়ো।’ আমি হাসলাম, তবে মনে মনে ভাবছিলাম, শুধু কি মানসাফের প্রেমেই পড়লাম, নাকি আরো কিছুর? ফিরতি পথে আম্মানের কাছাকাছি পৌঁছাতে পৌঁছাতে আকাশটা সিঁদুরে রঙ ধারণ করেছে। আমরা এক পাহাড়ি ক্যাফেতে থামলাম। সামনে তখন ঝকঝকে আম্মান শহর। আমাদের টেবিলে এল ওমানি বা জর্ডানি আঁচের কড়া ‘কাহওয়া’। এলাচের কড়া গন্ধ আর জাফরানের হালকা স্বাদ কফির প্রতি চুমুকে এক নতুন সতেজতা দিচ্ছিল।

সারা কফির কাপে আঙুল বোলাতে বোলাতে বললো-তোমার ভ্রমণ কাহিনীতে আমার কথা থাকবে তো? আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম-তুমিও তো সেই কুসেইর আম্রার ফ্রেস্কোর মতোই। তোমাকে ছাড়া আমার এ গল্পের কোনো রঙই তো পূর্ণ হবে না।

গরম আরবিক কফির কাপ হাতে বসে আছি দুজন। এ মুহূর্তটা মনে থাকবে-সারা জিজ্ঞেস করলো। আমি বললাম-তুমি পাশে থাকলে প্রতিটা মুহূর্তই আজীবন মনে থাকবে। সে চুপ করে কফির কাপের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর হালকা হেসে বললো-মরুভূমি মানুষকে বদলে দেয়, হয়তো তোমাকেও বদলে দেবে।

আমি তার কথার জবাব দিই না।

আম্মানে ফিরে আসার সময় চোখে পড়ছিল শহরের আলো। কিন্তু আমার ভেতরে তখনও জ্বলছিল অন্য এক আলো-ইতিহাস, শিল্প আর এক অদ্ভুত অনুভূতির মিশ্রণ। আম্মানের পাহাড়গুলো হাজারো আলোকবিন্দুর মালা। সারাকে বিদায় জানানোর সময় মনে হচ্ছিলো কিছু সফর শেষ হয়েও আসলে শেষ হয় না। অপূর্ণই থেকে যায়।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)