সব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে, সমালোচকদের মুখে চুন-কালি লাগিয়ে স্বপ্নীল যাত্রা শুরু করেছে বহির্বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম করবস্থান স্কচটাউন বাংলাদেশ সেমিট্রি। বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির এ প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয় গত ২০ জুন। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বৃহত্তর নোয়াখালীবাসীসহ বাংলাদেশি কম্যুনিটির সর্বস্তরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কবর নিয়ে সমস্যা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে করোনার সময় এ সংকট চরম আকার ধারণ করে। প্রবাসীদের এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রায় ১২৬ একর জমি ক্রয় করা হয়। বহির্বিশ্বের এ সর্ববৃহৎ মুসলিম গোরস্থান এখন স্বপ্ন নয় বাস্তব। এ সেমিট্রির কাজ শুরু করা হয় ২০২৫ সালে ৩১ জুলাই। প্রায় এক বছর পর ২০২৬ সালের ২০ জুন বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির উপদেষ্টা এসএম আমানতের লাশ দাফনের মধ্য দিয়ে প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয়। এসএম আমানত দীর্ঘ এক বছর ধরে মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি গত ১৮ জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ব্রুকলিনের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি... রাজিউন)। গত ১৯ জুন ব্রুকলিনের বেলাল মসজিদে নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পর দিন ২০ জুন স্কচটাউনে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বাংলাদেশ সেমিট্রিতে দাফন কর হয়। এটিই বাংলাদেশ সেমিট্রিতে প্রথম কবর। যেখানে আগামী দিনে প্রায় ১ লাখ কবর দেওয়া হবে।
বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির সাবেক সভাপতি নাজমুল হাসান মানিকের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মাঈন উদ্দীন পিন্টুর পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন-এ প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা ও বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির সভাপতি জাহিদ মিন্টু, বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হাজি মফিজুর রহমান, সাবেক সভাপতি আব্দুর রব মিয়া, সাবেক সভাপতি সালামত উল্যাহ, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য খোকন মোশাররফ, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মোমিনুল হক, রেজাউল করিম চৌধুরী, সোহেল হেলাল, মাইনুল উদ্দীন মাহবুব, সহ-সভাপতি তাজু মিয়া, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইউছুপ জসীম, সহ-সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ চৌধুরী রুহেল, বিএনএস বেলালের নাতি, কোম্পানীগঞ্জ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মুন্না প্রমুখ। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন যারা বা যে নবপ্রতিষ্ঠান, সেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন-ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য আবুল কালাম, রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শাহ নেওয়াজ স্বপন, শাহ আলম, মোস্তাক হোসেন মোশাররফ, মানিক লাল দাস, সুভাষ চন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সভাপতি ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এম আজিজ, বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, সিনিয়র সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন দেওয়ান, বাংলাদেশ সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য কাজী শাখাওয়াত হোসেন আজম, সন্দ্বীপ সোসাইটির সভাপতি ফিরোজ আহমেদ, বংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিদ্দিকী, সাবেক কোষাধ্যক্ষ নওশেদ হোসেন, সবেক কর্মকর্তা জামান তপন, বাংলাদেশ সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য নাঈম টুটুল, বাংলাদেশ সোসাইটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু নাসের, বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির সহ কোষাধ্যক্ষ জামাল উদ্দিন, সাংগঠনকি সম্পাদক নূরুল ইসলাম বাবু, ক্রীড়া সম্পাদক আব্দুর রহিম, ধর্ম সম্পাদক মাও. মঞ্জুরুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক মাহমুদুল হাসান, সদস্য ইকবাল হোসেন, হাসানুজ্জামান বাদল, মাহমুদুল হক প্রমুখ। আরো উপস্থিত ছিলেন লক্ষèীপুর জেলা সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী, মাহমুদুল হাসান, আসালের প্রেসিডেন্ট মাফ মিসবাহ, বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যকরি সদস্য আবুল কাশেম চৌধুরী, কোম্পানীগঞ্জ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন সবুজ, চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম, আহমেদ জুনায়েদ, মিজানুর রহমান, খোরশেদ আলম, মাকসুদুর রহমান, রুবেল আলী, জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের ইমাম মাওলানা মির্জা আবু জাফর বেগ, চার্চম্যাকডোনাল্ড বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট রফিকুল ইসলাম পাটোয়ারি, সাবেক সভাপতি আব্দুর রব, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আনোয়ারুল আজিম প্রমুখ।
জাহিদ মিন্টু তার বক্তব্যে সবাইকে ধন্যবাদ জানান এবং আল্লাহর প্রতি শোকরিয়া আদায় করে বলেন, এ জমি ১ হাজার ৪০০ দিন মার্কেটে ছিল কেউ ক্রয় করেনি, পরে আমরা ক্রয় করেছি। নোয়াখালী সোসইটির জন্ম হয়েছিল মানুষের কল্যাণের জন্য, আমরা বলি নোয়াখালী সোসাইটি শুধু মানব কল্যাণে কাজ করে না, নোয়াখালী সোসাইটি দ্বীন প্রচারেও কাজ করে। অনেকেই বলেন, এ প্রজেক্টের স্বপ্নদ্রষ্টা আমি। কিন্তু এ প্রজেক্টকে কাজ করে আজকের পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন যারা, তারা হলেন-জামাল উদ্দিন, মনসুর আহমেদ, পিয়াস ও মাইনুল উদ্দীন মাহবুব। এছাড়াও তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে বিএনএস বেলাল, মহিউদ্দিন ও এসএম আমানত হোসেনকে। তিনি যারা এ প্রকল্পে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি আরো বলেন, আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি, কাজ চলবে। তবে কবর দেওয়া শুরু হয়েছে, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তা শুরু হবে ১ জুলাই থেকে। যারা আমাদের কাছ থেকে কবর ক্রয় করেছেন, তারা আসবেন এবং আপনাদের কবর বুঝে নিবেন। তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে ২০ হাজার কবর বিক্রি করেছি। আগামী আগস্ট থেকে দ্বিতীয় কিস্তির কাজ শুরু হবে। কাজ শুরুর পর এগুলো বিক্রি শুরু হবে। প্রকল্প উদ্বোধনের ঘোষণায় তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। এখানে ৮ হাজার স্কোয়ার ফিটের বিল্ডি হবে, নামাজ পড়া যাবে, ১৫০ জন লোক এক সঙ্গে নামাজ আদায় কর যাবে, লাশ রাখার ব্যবস্থা এবং লাশ দোয়ার ব্যবস্থা রাখা হবে। তিনি বলেন, এ কাজগুলো আমরা করবো। তবে আমি বলতে চাই, এ প্রজেক্ট আপনাদের প্রজেক্ট, আমরা শুধু ব্যবস্থাপনায় থাকবো। তিনি হুঁশিয়ার উচ্চারণ করেন আপনারা যারা আপ্রচার করছেন, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যা লিখছেন, তাদের প্রতিহত করতে নোয়াখালীবাসী প্রস্তুত, আইনীভাবে হোক, আর যেকোনভাবেই হোক। আপনাদের মধ্যে কেউ কম্যুনিটি বোর্ড মেম্বার থাকতে পারেন, কেউ আইনজীবী নেতা থাকতে পারেন, কেউ ডাক্তার থাকতে পারেন, বি কেয়ারফুল। ভাল কাজ দেখলে আপনাদের যাদের গ্রাহদাহ হয়, তাদের দূরে থাকা উচিত। আশা করি আগামীতে কাজগুলো আর করবেন না, এনাফ ইজ এনাফ। প্রজেক্ট ইজ ডান। নোয়াখালীবাসীর ভদ্রতা দেখেছেন, নম্রতা দেখেছেন কিন্তু হুঙ্কার দেখেননি। বিশ্বাস করেন, এটা আমাদের অন্তরের প্রজেক্ট। এখানে আঘাত করার চেষ্টা করবেন না। এ প্রজেক্ট আগামী ২০০ বছরের প্রজেক্ট। মনে রাখবেন, আজ আমানত সাহেবকে তার আত্মীয়স্বজন রেখে যাবেন, আমি মারা গেলে আমাকেও রেখে যাবেন, সবাইকে মরতে হবে। নিজের পয়সা দিয়ে সমাজসেবা করেন, অন্য অর্থে সমাজসেবার ভালো করবেন না- আপনাদের ধিক্কার জানাই। তিনি প্রজেক্টের কাগজপত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের কাছে হস্তান্তর করেন।
নাজমুল হাসান মানিক বলেন, নোয়াখালীবাসীর সহযোগিতায় আমরা এ প্রজেক্ট করতে সফল হয়েছি। যারা আমাদের সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
হাজি মফিজুর রহমান বলেন, জাহিদ মিন্টু বয়সে আমাদের চেয়ে অনেক ছোট কিন্তু জ্ঞানে এবং কর্মে সে আমাদের চেয়ে অনেক বড় যেকারণে এ প্রজেক্টে আজকে আলোর মুখ দেখেছে।
অনুষ্ঠানে যারা এ প্রজেক্টে কবর ক্রয় করেছেন তারাও অংশগ্রহণ করেন এবং তাদের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। তারা এ প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করার জন্য জাহিদ মিন্টু এবং উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তারা বলেন, এতোদিন কবর নিয়ে উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলাম, এখন আমাদের নিজেদের করব হয়েছে। বিদেশি অনেক প্রজেক্টে তাদের কথামতো এবং সময় অনুযায়ী আমাদের কবর দিতে হয়েছে, সেদিক থেকে এবার আমরা একটু সুবিধাহনক অবস্থায় রয়েছি। এক সঙ্গে এক লাখ মুসলিম মানুষের কবর, তাও ভিন দেশে, এটা যেন চিন্তার অতীত ছিল, সেই অসাধ্য সাধন করেছে জাহিদ মিন্টু। আকাশছোঁয়া স্বপ্ন হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে জাহিদ মিন্টুসহ বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি। কেউ কেউ বলেছেন, আজকে স্কচটাউনে যে ইতিহাস তৈরি হলো অমরা ইতিহাসের সাক্ষী হলাম। হয়তো আমরা থাকবো না, কিন্তু মুসলমানদের এ প্রজেক্ট থেকে যাবে। জাহিদ মিন্টুসহ যারা এটা করেছেন এ প্রজেক্ট যতদিন থাকবে, তাদের নামও ততদিন থাকবে। উদ্বোধনীতে যারা গিয়েছেন তারা কালের সাক্ষী হিসেবে থাকবেন। কেউ কেউ বলেছেন, ক্ষণিকের পৃথিবী নয়, আসল ঠিকানা হচ্ছে এটা।
বাংলাদেশ সেমিট্রিতে জোহর এবং আসরের নামাজ আদায় করা হয়। নামাজে ইমামতি করেন জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের ইমাম মাওলানা মির্জা আবু জাফর বেগ।