প্রবাসের মাটি, ভিনদেশি আবহাওয়া ও পরিবেশ যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য পরিণত হয়েছিল একখণ্ড বাংলাদেশে। গত ১৯ জুন বিকাল থেকে রাত অবধি জ্যামাইকার ১৭৩ স্ট্রিট এবং ১৭৫ স্ট্রিটের পার্কটিতে যেন ফিরে এসেছিল বাংলাদেশের চিরচেনা রূপ। জায়গাটিও ছিল মেলার জন্য চমৎকার। ছায়ায় ঘেরা পার্কটিতে দেশীয় নানা পদের খাবার, বাংলা গানের সুর, মানুষের হাসি-আনন্দ আর মিলনমেলার উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠেছিল। মেলায় উপস্থিত বাঙালিরা ছিলেন বাঙালিয়ানা পোশাকে, সে এক অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য। মেলায় যারা স্টল দিয়েছেন, তারাও ভালো ব্যবসা করেছেন। মেলা শেষে সবার মুখেই ছিল তৃপ্তির হাসি। প্রবাসে অধিকাংশ মেলাই সন্ধ্যার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়, কিন্তু ভালোর মেলা ছিল প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত। যারা মেলায় এসেছেন তারা ঘুরে বেড়িয়েছেন, কেউবা চুটিয়ে আড্ডা মেরেছেন, কেউবা প্রাণভরে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপভোগ করেছেন।
নন-প্রফিট সংগঠন ‘ভালোর’ আয়োজনে এ বর্ণাঢ্য মেলায় অংশ নেন বাংলাদেশি, আমেরিকান, চায়নিজ, হিস্প্যানিশসহ নানা কমিউনিটির মানুষ। মেলার উদ্বোধন করেন নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিকেয়া জেমস ও সিটির পাবলিক অ্যাডভোকেট জুমানি উইনিয়ামসসহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, কমিউনিটি নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের স্বাগত জানান, ভালো সংগঠনের প্রধান নির্বাহী শাহরিয়ার রহমান।
লেটিকেয়া জেমস ভালোর প্রশংসা করে বলেন, এ সংগঠনটি মানবসেবায় বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কম্যুনিটি সেবা এবং উন্নয়নে তাদের ভূমিকা সব সময় প্রশংসনীয়। আমি ভালোর সঙ্গে আছি এবং আগামী দিনেও থাকবো।
জুমানি উইলিয়াম বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে কম্যুনিটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভালো এ ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের দেশ এবং সমাজকে সমৃদ্ধ করছে।
মেলার উদ্বোধন শেষে শাহরিয়ার রহমানকে সঙ্গে নিয়ে অতিথিরা ঘুরে ঘুরে মেলার বিভিন্ন স্টল দেখেন। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার ফুচকা ও আমের জুসের স্বাদ নেন তারা। কেউ কেনেন দেশীয় ব্র্যান্ডের পোশাক, কেউ অলংকার কিংবা প্রসাধনী। প্রায় শতাধিক স্টলে সাজানো ছিল দেশীয় খাবার, পোশাক, হস্তশিল্প, প্রসাধনী, গৃহসজ্জার সামগ্রী এবং নানা ধরনের ব্যবসায়িক পণ্য। প্রবাসে বসেই যেন দেশের বাজার ঘুরে দেখার সুযোগ পান দর্শনার্থীরা।
শিশুদের জন্য ছিল নানা রাইড, খেলাধুলা এবং বিনোদনের ব্যবস্থা। যা ছিল শিশুদের জন্য বাড়তি আনন্দ। তারা মেলায় এসে খেলাধুলায় মেতে ওঠেন। শিশুদের জন্য এ আয়োজন ছিল আয়োজকদের সুচিন্তারই ফসল।
বড়দের জন্য ছিল জমজমাট ফুচকা খাওয়া প্রতিযোগিতা ও আকর্ষণীয় র্যাফেল ড্র। র্যাফেল ড্রতে ৫০০ ডলারের পাশাপাশি এয়ার টিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের পুরস্কার দেওয়া হয়।
সংগঠনের এমন আয়োজনে সন্তোষ প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন-ঠিকানা সম্পাদক এমএম শাহীন, নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের ডেপুটি স্পিকার নাতাশা উইলিয়ামস, সিটির কাউন্সিলম্যান শেখর কৃষ্ণান, মেয়রের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা মীর বাশার, জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির সভাপতি ও মূলধারার রাজনীতিবিদ ফখরুল ইসলাম দেলোয়ারসহ কুইন্স বরো প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধি প্রমুখ।
ভালোর ডিরেক্টর অব পাবলিক রিলেশনস শাহরিয়ার নবী বলেন, ‘ভালো’ শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়; এটি মানুষে মানুষে সংযোগ, সম্প্রীতি এবং ভালোবাসার একটি উদ্যোগ। আর সে লক্ষ্য থেকেই আয়োজন করা হয়েছে এ মিলনমেলার।
বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনায় মেতেছিল পুরো মেলা প্রাঙ্গণ। বিশ্বকাপ উপলক্ষে বড় পর্দায় সরাসরি ম্যাচ দেখার আয়োজন দর্শকদের বাড়তি আকর্ষণ হয়ে ওঠে। দিনভর মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জনপ্রিয় শিল্পীদের পরিবেশনার পাশাপাশি বিউটি দাস ও রাজীব রহমানের ব্যান্ডের প্রাণবন্ত সংগীত পরিবেশনায় দর্শকরা মেতে ওঠেন উৎসবের আমেজে। বাংলা গান আর প্রবাসী জীবনের আবেগ যেন এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছিল উপস্থিত সবাইকে। মেলা শেষে বাড়ি ফেরার পথে সবাই মেলায় আয়োজক সংগঠন ভালোর প্রশংসা করেন ভালো ভালো কাজ করার জন্য এবং কম্যুনিটির উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য।