১৪ জুলাই ২০১২, রবিবার, ১০:০৪:১৬ পূর্বাহ্ন


এই উজ্জ্বল দিন বাজে স্বপ্ন রঙিন
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৪-০৬-২০২২
এই উজ্জ্বল দিন বাজে স্বপ্ন রঙিন


প্রমত্তা পদ্মা পেরুলেই কিছু দূরে আমার গ্রামের বাড়ি ভাঙা থানার গোয়ালদী গ্রাম। অবহেলিত জনপদের হওয়ায় কত দিন শুনেছি ‘ছাতা সারানো ইঞ্জিনিয়ার’ ট্রল। বরিশালের ঝালকাঠিতে নদীপাড়ে ৬৯ বছর আগে নদী পারে পহেলা বৈশাখে জন্ম আমার। শৈশব, কৈশোর কেটেছে ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ফরিদপুর শহরে। বাঙালির গৌরব আর অহংকারের মুক্তিযুদ্ধের আগে, সময়ে এবং পরে স্মরণীয় সময় কেটেছে। আমি এখন অনন্দিত ,পুলকিত উচ্ছসিত। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের লোগান সিটি থেকে যখন লিখছি, তখন ২৪ জুন ২০২২। 

আজ দিন পেরিয়ে রাত শেষে ২৫ জুন ২০২২।  বাংলাদেশের গর্বের প্রতীক পদ্মা বহুমুখী সেতু মিলন মোহনায় পরিণত হবে উত্তর, দক্ষিন বাংলার। আলোয় আলোয় ভরে উঠবে বাংলাদেশের আঁধার ঘরের আংগিনা। বাংলাদেশিদের লাইট স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেখে কানে বাজছে অমর বাণী " কেউ আমাদের দাবায় রাখতে পারবে না"।

বঙ্গবন্ধু কন্যাকে অন্তরের অন্তস্থল থেকে আশীর্বাদ। শত বাঁধা বিপত্তির মুখে স্বপ্ন সারথী হবার সাহস আর প্রতিজ্ঞার জন্য। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি আমাদের মেন্টর প্রয়াত ডক্টর জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারকে। নানা সময়ে প্রশ্নের জবাব দিয়ে সেতুর নানা বিষয়ে জানার সুযোগ দেয়ার জন্য। কত না খুশী হতেন আজ তিনি বেঁচে থাকলে। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে একজন প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রেরণকারী হিসাবে আমাদের বিন্দু বিন্দু বিনিয়োগ আছে এই মহান কীর্তির সফল অর্জনের। 

সেতুটির সফল বাস্তবায়নের অর্জন বাংলাদেশের সবার। কূপমণ্ডূকতার কারণে কিছু মানুষ বিরোধিতা করলেও সবাই উপকৃত হবেন সন্দেহ নেই। একের মধ্যে দুই সেতুটি অত্যাধুনিক প্রকৌশল এবং স্থাপত্যের বিমূর্ত প্রদর্শনী। বিশ্বকে দেখিয়েছে, বাংলাদেশ নিজেদের অর্থায়নে বিশাল নির্মাণযজ্ঞ সফল ভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব।

কথিত দুর্নীতির যে অভিযোগ তুলেছিল বিশ্বব্যাংক সেটি কিন্তু কানাডার আদালতে। প্রমাণিত হয়নি। সেতুর বাস্তবায়ন সময়ে বিদেশী পরামর্শক নিয়োগ পর্যায়ে কোনো একটি চাইনিজ  কোম্পানিকে  নিয়োগের অপতৎপরতার কারণেই বেঁধেছিলো জট। আমার শ্রদ্ধেয় তিন জন বুয়েট শিক্ষক প্রয়াত ডক্টর জামিলুর রেজা চৌধুরী, ডক্টর আইনুন নিশাত, ডক্টর শফিউল্লাহ ছিলেন মূল্যায়ন কমিটিতে।

দুর্নীতির প্রমান হবার আগেই তৎকালীন সেতু মন্ত্রী আবুল হোসেন, অর্থনৈতিক উপদেষ্টাকে সরিয়ে দেয়া হলো। সেতু বিভাগের সচিবকে চাকুরী চ্যুত,এমনকি গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হলো। দেশের একশ্রেণীর অশুভ মহল না জেনেই মিডিয়ায় গুজব ছড়ালো। কিছু মহল এই সুযোগে শেখ হাসিনা নেতৃত্বের সরকারকে অপসারণের ষড়যন্ত্র শুরু করলো। আমরা বুঝতে সক্ষম ছিলামনা সেতুর জন্য একটি পয়সা ছাড় না হলেও কেন বিশ্ব ব্যাংক বিগড়ে গেলো? কেন এডিবি এবং অন্যান্য প্রতিশ্রুতি দেয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরে গেলো?

এমন অবস্থায় নিজেদের অর্থায়নে সেতুর সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যার অসীম সাহস দেশ প্রেম আর বর্তমান কেবিনেট সচিব খন্দকার আনওয়ারুল ইসলামের উপমাধর্মী নেতৃত্বের কারণে। আশা করি, বিশ্বব্যাংক তাদের ভুল বুঝতে পেরে ত্রুটি স্বীকার করে নিবে। 

জামিলুর রেজা চোধুরী স্যারের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আলাপের সূত্রে (এমনকি তাঁর প্রয়ানের একদিন আগেও ডিজিটালি ) জেনেছি সেতু নির্মাণে বিশ্বে প্রথম বারের মতো কিছু টেকনোলজি, কিছু ব্যাতিক্রম ধর্মী উপকরণ এবং সরঞ্জাম ব্যবহার হয়েছে। সেতু সড়ক এবং রেল লাইনের সমন্বয়ে দ্বিতল সেতু। আছে গ্যাস সঞ্চালন পাইপ লাইন, ফাইবার অপটিক্স ক্যাবল, সমান্তরালে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন।

এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে সেতু যে ৯.৫ রিক্টার  স্কেল ভূমিকম্প সেতুর কোনো ক্ষতি করবে না। সেতুতে অলোকিত করছে অত্যাধুনিক লাইটিং ব্যবস্থা। ২২০ কিলোমিটার গতির ঘূর্ণিঝড়ের সময়েও দাঁড়িয়ে থাকবে সেতুর সঙ্গে সংযোজিত ল্যাম্প পোস্ট গুলো। রিভার ট্রেনিং ব্যবস্থা বিশ্বমানের।  এতো বিশাল ব্যবস্থা বিশ্বে বিরল। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রে ,হংকংয়ে বেশ কিছু বিশ্ব মানের সেতু দেখার সুযোগ হয়েছে। ইচ্ছা ছিল সেতু উদ্বোধনের সময় উপস্থিত থাকবো। নানা বাস্তবতায় যাওয়া হয়নি। 


সালেক সুফী 

ব্যাক্তিগত এবং পারিবারিক ভাবে অনেক উচ্ছাসিত।  ঢাকা থেকে আমাদের ফরিদপুর সহ বরিশাল , যশোর,খুলনা যেতে যাত্রা কল্পনাতীত সহজ আর সুলভ হবে। বাংলাদেশের  দক্ষিণ  পূর্ব  এবং উত্তরাঞ্চলে অনেকের ঘরে  উনোনে আমি নিজে গ্যাসের সংযোগ দিয়েছি। আমার মাকে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আমার কিছু বন্ধু সহচরদের স্নেহময়ী মাকে আমি পেট্রোবাংলায় চাকুরী কালীন সময়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। ওনাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। আমিও হয়তো নিবো একসময়। 

সেতুর কারণে পায়রা, মংলাবন্দর সরাসরি সংযোজিত হবে দেশের অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে। বেনাপোল, ভোমরা স্থল বন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্যের বাতায়ন আরো উন্মুক্ত হবে। জাতীয় অর্থনীতিতে বাংলাদেশের ব্রেড বাস্কেট সংযোজিত হওয়ায় সমৃদ্ধির সীমানা আকাশের পেইন বিস্তৃত হবে। 

বিধাতাকে কৃতজ্ঞতা আমাদের জীবদ্দশায় পদ্মা সেতু দেখে যাওয়ার সুযোগ হলো। আবারো স্মরণ করছি বন্ধু নাসিম, নওফেল, রুমি ভাই, জুয়েল ভাই সহ সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের। 

কানে বাজছে " বিশ্ব অবাক তাকিয়ে রায়, জলে পুড়ে ছারখার তাবু মাথা নোয়াবার নয়.............."  প্রার্থনা করি সেতুটি ১৭ কোটি বাংলাদেশিকে যেন একটার সুতোয় বেঁধে ফেলে। শত শত বছরের জন্য। 


শেয়ার করুন