১৪ জুলাই ২০১২, রবিবার, ১১:৩৮:১৫ পূর্বাহ্ন


আর দেখা যাবে না পুরান ঢাকার সোয়া শ’ বছরের ভবনটি
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৭-০৭-২০২২
আর দেখা যাবে না পুরান ঢাকার  সোয়া শ’ বছরের ভবনটি রাজধানী ঢাকায় সোয়া শ’ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ভবন/ছবি সংগৃহীত


আর দেখা যাবে না পুরান ঢাকার সোয়া শ’ বছরের নিলাম ঘর নামে ঐতিহ্যবাহী ভবনটিকে। শাবল আর হাতুড়ির একের পর এক আঘাতে গুড়িয়ে দেয়া হলো একে।  যেনো এটি রাজধানীর মহাশত্রু,বিষফোড়া। নানান যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দ্রুততার সাথে ভবনের সব চিহ্ন শেষ করে দেয়া হল মাত্র তিন চার ঘন্টায় কয়েকশত শ্রমিক দিয়ে। 

ঐতিহ্যবাহী নিলাম ঘর 

পুরান ঢাকার ১৫, ১৫/১  কোর্ট হাউস  স্ট্রিটে ছিল (দু-দিন আগে) এই নিলাম ঘর। প্রায় ১১৫ বছর আগেরও এভবন দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে। প্রত্নতত্ববিদরা এটিকে সাধারণ স্থাপনা বলে ভাবেনি। এটাকে তারা কালের সাক্ষী আর ঐতিহ্যের অংশ সম্মান দেখিয়ে আসছে। যত দূর জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে রায় সাহেব বাজার সংলগ্ন এলাকায় ভবনটি নির্মাণ করা হয়। বর্তমান ঠিকানা ১৫, ১৫/১ কোর্ট হাউস স্ট্রিট। ঢাকা ডিসি অফিসের ঠিক পেছনে ছিল এটি। প্রত্নতত্ববিদদের মতে, প্রায় ১১৫ বছর আগে খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে অনেকের সম্পত্তি নিলামে তোলা হতো। নিলামে সম্পদ বিক্রির সমুদয় কাজ হতো অকশন হাউস বা নিলাম ঘরে। পাকিস্তান আমল পর্যন্ত এ ঘরে নিলামে মালামাল বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। তাছাড়া নিলাম ঘর ইউরোপীয় নব্য ধ্রুপদ নির্মাণশৈলীর অনন্য নিদর্শন। সারিবদ্ধ খিলান ও কারিস্থিায়ান কলাম ভবনটিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছিল। পুরাণ ঢাকায় কেউ এদিক দিয়ে গেলেই  ঐতিহ্যপ্রেমীরা নিলাম ঘর নিয়ে ভীষণ কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। এমনকি বাইরের দেশ থেকে আসা পর্যটকরাও দীর্ঘ যানজট ঠেলে সেখানে ছুটে যেতেন। মুগ্ধ হয়ে দেখতেন চুন সুরকি পলেস্তারায় নির্মিত ভবন। 

দায়িত্বশীলরা নিরব, শ্রমিকের চোখে পানি

এই ভবনের নির্মাণশৈলী, কারুকাজ প্রাচীন ঢাকার স্থাপত্য রুচি সম্পর্কে ধারণা দিয়ে আসছিল,যা চিরতরে ধবংস করে দেয়া হলো। এমন  ঐতিহ্যে নির্মম কুঠারাঘাত করা হয়েছে। দ্বিতল ভবনের ওপরের তলা এখন নিশ্চিহ্ন, যার নান্দনিক সৌন্দয্য যেকেনো বয়সের মানুষকে বিমোহিত করেছে। এমন নির্মম ঘটনায় ঢাকার ঐতিহ্য সচেতন মানুষেরা যারপরনাই বেদনাহত,ক্ষুব্ধ। এমন কি কাজ হারানো ভয়ে নাম প্রকাশ করতে চায়নি এটি ভাঙ্গা কাজে আসা একজন শ্রমিক, এমন ঘটনায় এই প্রতিবেদকের কাছে দু:খ প্রকাশ করে চোখের পানি ফেলেছে। তার মধ্যেও প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। সে জানায়, ভবনটির সামনে এমন সুন্দর কারুকাজ ধবংসে তার হাতৃুড়ি ব্যবহারে ভালো লাগেনি বলে চোখ মুছে। তার মনে পুরান বাড়ির এমন গঠন নির্মাণ শৈলী সে খুব কমই দেখেছে বলে জানান। তার প্রশ্ন যারা এভবনটি ভাঙ্গার নির্দেশ দিলো তারাতো অনেক জ্ঞানী-গুণি। তারা কি-করে, কিসের লোভে এটি ধবংসে সায় দেয়- প্রতিবেদকের কাছেই এমন পাল্টা প্রশ্ন ছিল তার। সে জানায় তার গ্রামেও বাবার পুরোনো বাড়ির অনেকাংশ আজও সংরক্ষণ করে রাখতে অনেককেই দেখেছেন। কিন্তু এধরনের ঐতিহাসিক স্থাপনাকে কে সংরক্ষণ করাই ছিল জরুরি, যা রক্ষায় সরকারের দায়িত্বশীলকেউ এগিয়ে আসেনি। 

রাজধানীতে সোয়া শ’ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ভবনের ওপর এমন নির্মম ধবংসযজ্ঞ চালানো হলো গত ৩ জুলাই রোববার ভোর থেকে।  শত শত মানুষের প্রতিবাদ সভা সমাবেশ সর্বোপরি হাইকোর্টের রায় লঙ্ঘন করে এটিকে ধ্বংস করে ফেলা হল সেদিন। ভবনটি রক্ষায় আকুতি জানাতে



মানববন্ধন করতে গিয়েও তরুণদের একটি গ্রুপ মারাত্মক হেনস্থারস্বীকার হয়েছেন। আর্বান স্টাডি গ্রুপের সদস্য এবং সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। আর্বান স্টাডি গ্রুপের  প্রধান নির্বাহী আর্কিটেক্ট তাইমুর ইসলামের নেতৃত্বে একর্মসূচি পালিত হয়। তাদের সঙ্গে কথা বলেও ঐতিহ্যপ্রেমীদের ভেতরের কান্নাটা অনুধাবন করা যায়। তারা জানায় একর্মসূচিতে তাদের হতে হয়েছে নাজেহাল। এমনকি নিগৃহিত হয়েছেন গণমাধ্যমের কর্মীরা। অভিযোগ উঠেছে আইনজীবীদের একটি সংগঠন এ ঘটনা ঘটিয়েছে। অথচ এক রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ঢাকার মোট ২২০০ ভবন ভাঙ্গার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। নিলাম ভবন সেগুলোর অন্যতম। তাছাড়া বর্তমানে নিলাম ঘরটি অর্পিত সম্পত্তি।

প্রতিবাদও অব্যাহত 

এদিকে ৪ জুলাই সোমবার বিকেল চারটের ঐতিহ্যবাহী ভবনটির  ধ্বংসের প্রতিবাদে এবং একই সাথে ৩ জুলাই  কোর্ট হাউস স্ট্রীটে  “নিলাম ঘরের” সামনে আরবান স্টাডি গ্রুপের আয়োজন করা মানববন্ধন কর্মসূচি চলাকালে ঢাকা বার এসোসিয়েশনের সদস্যদের দ্বারা হামলার প্রতিবাদে আরবান স্টাডি গ্রুপের পক্ষ থেকে  জাতীয় জাদুঘরের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন আরবান স্টাডি গ্রুপের সদস্য এবং সেভ দা হেরিটেজ বাংলাদেশ এর প্রতিনিধিবৃন্দ। আরবান স্টাডি গ্রুপের পক্ষ থেকে মূল বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম । তিনি তার বক্তব্যে ঐতিহ্যবাহী নিলাম ঘর এর নান্দনিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। বলেন, ব্রিটিশ আমলে, উনবিংশ  শতাব্দীর গোড়ায় ইউরোপীয় ধ্রুপদ অলংকরণ রীতি সমৃদ্ধ এই স্থাপনাটি তার অসাধারণ নান্দনিক বৈশিষ্ঠ্যের জন্য পুরান ঢাকার সর্ব মহলে  বহুকাল ধরে নন্দিত হয়ে আসছে। ভবনটি সবার কাছে একটি ল্যান্ড-মার্ক স্থাপনা হিসেবে এক নামে পরিচিত ছিল।তিনি বলেন, এই ভবনটি ধ্বংসের সময় একদিকে যেমন দেশের প্রচলিত আইন যথা অর্পিত সম্পত্তি আইন লংঘন করা হয়েছে অন্যদিকে মহামান্য হাইকোর্টের রায়  উপেক্ষা  করা হয়েছে আর এই কাজটি করা হয়েছে দেশের আইনজীবীদের অন্যতম প্রতিষ্ঠান “ঢাকা বার এসোসিয়েশন” এর পক্ষ থেকে। এই জন্য আরবান স্টাডি গ্রুপের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়।

তাইমুর ইসলাম তার বক্তব্যে,  প্রচলিত আইন লংঘন করে বিশেষত “অর্পিত সম্পত্তি আইন” এবং হাইকোর্টের রায় (রিট নং ৩৯৫৯/১৮ এবং রিট নং ৪৬৫৬/১৮)  অমান্য করে এই নিলাম ঘর  ধ্বংস করার পেছনে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি যেমন ঢাকা জেলা প্রশাসক, ভূমি মন্ত্রণালয়, রাজউক ও  প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পাশাপাশি নগর পিতা হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র এর ব্যর্থতা কে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন দপ্তর এই অমার্জনীয় ব্যর্থতা প্রকারান্তরে এক এর পর এক ঐতিহ্যবাহী ভবন ধ্বংসের পেছনে কার্যত মদদ যোগাচ্ছে। অপরদিকে স্থপতি সামিরা ইসলাম তার বক্তব্যে  নিলাম ঘর ধ্বংসের মত ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং এই ঘটনাটিই যেন ঢাকা মহানগরীতে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধ্বংসের সর্বশেষ নিদর্শন হয় সে জন্য সরকারসহ সকলের সহযোগিতা  কামনা করেন।


শেয়ার করুন