ট্রাম্প-মামদানি অবিশ্বাস্য সৌহার্দপূর্ণ বৈঠক


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 26-11-2025

ট্রাম্প-মামদানি অবিশ্বাস্য সৌহার্দপূর্ণ বৈঠক

হোয়াইট হাউসে গত ২১ নভেম্বর এক ঘণ্টারও বেশি স্থায়ী বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিউইয়র্ক সিটির মেয়র ইলেক্ট জোহরান মামদানির মধ্যে অবিশ্বাস্যরকম আন্তরিক ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন ধরে মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দেওয়া, নিউইয়র্কের ফেডারেল ফান্ডিং কেটে দেওয়ার হুমকি, হাজার হাজার আইসিই এজেন্ট পাঠানোর প্রতিশ্রুতি-এসব থেকে ট্রাম্প নাটকীয়ভাবে সরে এসে বলেন, তিনি এখন মামদানির প্রশাসনকে বড় ধরনের সাহায্য করবেন এবং এমনকি ট্রাম্প নিউইয়র্ক সিটিকে চাঙ্গা করে তুলবেন করবেন। কয়েক মাস ধরে একে অপরকে তীব্র সমালোচনা করলেও এই বৈঠকে উভয় নেতা একে অপরের প্রশংসা করেন এবং সাধারণ লক্ষ্য ও সহযোগিতার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী যে তিনি ভালো কাজ করতে পারবেন, যা রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। করেছিলেন। বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আশা করি তিনি একটি দারুণ মেয়র হবেন। তিনি ভালো করবেন, আমি আরো খুশি হবো। এখানে কোনো পার্টির ভেদ নেই। আমরা তাকে সহায়তা করবো, যাতে নিউইয়র্ক আরো শক্তিশালী এবং নিরাপদ হয়।

উভয় নেতা বৈঠকে শহরের আবাসন সমস্যা, খাদ্য ও জ্বালানির খরচ কমানো এবং নাগরিক সেবার খরচ নিয়ন্ত্রণের বিষয় আলোচনা করেন। মামদানি বলেন, তারা নাগরিকত্ব ও ইমিগ্রেশন প্রয়োগ সম্পর্কেও কথা বলেছেন এবং বিশেষভাবে আইসিই (ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) কর্মকর্তাদের শহরে মোতায়েন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ অনানুষ্ঠানিক মেলবন্ধন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অবাক করেছে, কারণ এটি ট্রাম্প প্রশাসন এবং সিটির নতুন নেতৃত্বের মধ্যে সম্ভাব্য উত্তেজনা কমানোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।

নিউইয়র্কের নাগরিকরা এই বৈঠককে মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় দেখছেন। কেউ মামদানির কৌশলকে প্রশংসা করছেন, কেউ সতর্ক। স্টেটেন আইল্যান্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলম্যান জো বরেলি বলেন, নিউইয়র্কবাসীর জন্য এটি শিক্ষণীয়, কখনো কখনো আমরা মানুষের চরিত্র নিয়ে ভুল ধারণা করি। তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ট্রাম্পের অস্থির স্বভাবের কারণে উভয়ের সুসম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি হতে নাও পারে। এছাড়া বৈঠকের মাধ্যমে মামদানি সম্ভবত ফেডারেল ফান্ডিং ও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বাধা দূর করতে সক্ষম হতে পারেন। তিনি ট্রাম্পকে শহরের অবকাঠামো সমস্যা, সাবওয়ে উন্নয়ন, এবং নগর নিরাপত্তাসংক্রান্ত পরিকল্পনার বিষয়ে অবহিত করেছেন। প্রাক্তন এবং বর্তমান নিউইয়র্ক লিডাররা বলছেন, এ বৈঠক যদি ফলপ্রসূ হয়, তবে এটি সিটি হলের জন্য একটি কার্যকর সহযোগিতা এবং স্থিতিশীলতা প্রদান করতে পারে।

সর্বোপরি মামদানি এবং ট্রাম্পের বৈঠক রাজনৈতিক নাটকীয়তার দিক দিয়ে চমকপ্রদ হলেও নিউইয়র্কের নাগরিক, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং আবাসন নীতি নির্ধারণে এর প্রভাব অনেক বড় হতে পারে। মামদানির তরুণ এবং বহুল সমালোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্পের সঙ্গে সফল সমঝোতা করতে পারলে এটি নিউইয়র্কের জন্য একটি সম্ভাবনাময় সূচনা হতে পারে, যা শহরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নীতিগত অগ্রগতিতে নতুন দিক নির্দেশ করতে পারে।

ট্রাম্প আবারও স্পষ্ট করেন, তিনি মামদানিকে ‘যুক্তিসংগত’ হিসেবে দেখেন এবং নিউইয়র্ককে পুনরায় মহান করার জন্য আগ্রহী একজন নেতা হিসেবে অভিহিত করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই বৈঠককে চমকপ্রদ উল্লেখ করছেন। কারণ কয়েক মাস আগে ট্রাম্প উভয়কে রাজনৈতিকভাবে কঠোরভাবে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন। তবে এখন উভয় নেতা একে অপরকে সম্মান জানিয়ে শহরের জন্য কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেখিয়েছেন।

সর্বশেষ বৈঠকটি প্রমাণ করলো যে রাজনৈতিক পার্থক্য থাকলেও কার্যকর যোগাযোগ ও সমঝোতার মাধ্যমে শহরের জন্য ইতিবাচক ফলাফল আনা সম্ভব। মামদানি তার নতুন পদে যোগদানের আগে এই বৈঠককে ‘উপযোগী’ এবং ‘গঠনমূলক’ আখ্যা দিয়েছেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

নিউইয়র্ক সিটি প্রতিবছর প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার ফেডারেল সহায়তা পায়। ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তন মামদানি প্রশাসনের জন্য বড় স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি নিউইয়র্ক সিটিকে নতুন উদ্যমে উদ্দীপ্ত করে তুলবেনবলে জানিয়েছেন।

ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প জানান, মামদানি তার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি যুক্তিসংগত এবং দুজনের নীতিগত অবস্থানের মধ্যেও আশ্চর্যজনক মিল রয়েছে। সাশ্রয়ীতা, অর্থাৎ নিউইয়র্কবাসীর বসবাস ও জীবিকা সাশ্রয়ী করা বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। মামদানি জানান, ফেডারেল সরকার ও সিটি সরকার যদি একসঙ্গে কাজ করে, তবে নিউ ডিল যুগের মতোই শহরে রূপান্তরমূলক পরিবর্তন আনা সম্ভব। ট্রাম্পও ইঙ্গিত দেন যে তিনি নিউইয়র্কে বসবাস করতে ‘খুবই স্বস্তিবোধ’ করবেন, যদি মামদানি তার প্রতিশ্রুত এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারেন।

অদ্ভুত রসিকতার মুহূর্তও তৈরি হয় বৈঠকে। সাংবাদিকদের প্রশ্নে মামদানিকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় তিনি কি ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ মনে করেন, তখন ট্রাম্প নিজেই হেসে বলেন, বলো হ্যাঁ, ব্যাখ্যার চেয়ে সহজ। মামদানি হাসতে হাসতেই উত্তর দেন, ঠিক আছে... হ্যাঁ। প্রেসিডেন্টকে ডেসপট বলার বিষয়ে ট্রাম্পও বলেন, আমাকে এর থেকেও অনেক খারাপ বলা হয়েছে। তবে কমিউনিস্ট মন্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন, মামদানির মতাদর্শ কিছুটা ভিন্নধর্মী,তবে তিনিও সময়ের সঙ্গে বদলেছেন।

ইমিগ্রেশন নীতি নিয়েও দুজন অপ্রত্যাশিত মিল খুঁজে পান। যদিও মামদানি ট্রাম্পের ম্যাস ডিপোর্টেশন নীতি বহুবার সমালোচনা করেছেন, শুক্রবার উভয়েই একমত হন যে গুরুতর অপরাধী অভিবাসীদের বহিষ্কারে শহর–রাজ্য সহযোগিতা জরুরি। মামদানি জানান, স্যাংচুয়ারি সিটির আইন অনুযায়ী শহর ১৭০টি গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আইসিকে সহায়তা করতে পারে। এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, সে তো আমাকে থেকেও বেশি তাদের বের করে দিতে চায়।

গাজা যুদ্ধ নিয়েও ট্রাম্প আপত্তি তোলেননি, যখন মামদানি প্রকাশ্যে বলেন যে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে এবং তা আমাদের ট্যাক্সের অর্থে হচ্ছে। অতীতে ট্রাম্প মামদানির এসব অবস্থানকে ইহুদিবিদ্বেষ উসকে দেয় বলে সমালোচনা করেছিলেন।

তবে হঠাৎ উষ্ণতা উভয় নেতার রাজনৈতিক ভিত্তিতে কী প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ট্রাম্পের কট্টর ডানপন্থী সমর্থকরা মামদানিকে শাস্তি দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন; এখন তাদের প্রতিক্রিয়া অনিশ্চিত। অন্যদিকে মামদানির সমর্থকরাও ভাবতে পারেন, ট্রাম্পকে নিয়ে এতটা নমনীয়তা দেখানো তার রাজনৈতিক অবস্থানকে নরম করে ফেলতে পারে।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মামদানির আসন্ন চিফ অব স্টাফ এল বিসগার্ড-চার্চ, যিনি মেয়র-ইলেক্টের মতোই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সদস্য। ক্রয়সক্ষমতা বিষয়ক আলোচনায় তারা বিশেষ গুরুত্ব দেন মুদিখানার পণ্যের মূল্য কমানো, নতুন আবাসন নির্মাণ, বিদ্যুৎ বিল কমানোর উপায় এবং কনএডিসনের রেট নির্ধারণে চাপ সৃষ্টি প্রসঙ্গে। ট্রাম্প বলেন, জ্বালানির দাম কমে যাওয়া সত্ত্বেও কনএডিসন তা গ্রাহকদের সুবিধা হিসেবে দিচ্ছে না। এই বিষয়ে ফেডারেল সরকার উদ্যোগ নেবে।

নিউইয়র্কে অপরাধ দমন, আরো বেশি আবাসন নির্মাণ, ভাড়ার বোঝা কমানো, সব বিষয়ে দুজনই একমত হন। মেয়র-ইলেক্ট মামদানি তার প্রচারের কেন্দ্রে রাখেন সবার জন্য সুলভ শিশুসেবা, বাস ভাড়া ফ্রি করা, ভাড়া নিয়ন্ত্রিত বাসিন্দাদের ভাড়া স্থগিত রাখা এবং সিটি রান গ্রোসারি স্টোর চালুর মতো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা, যেখানে ফেডারেল সহায়তা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মোট মিলিয়ে, একসময়ের তিক্ত সম্পর্কের জায়গায় ট্রাম্প-মামদানি বৈঠক যেন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। এর ফলে নিউইয়র্ক সিটির ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)