রাজনীতিতে উত্তরাধিকার


সালেক সুফী , আপডেট করা হয়েছে : 07-01-2026

রাজনীতিতে উত্তরাধিকার

নানা ঘটনার পরম্পরায় বাংলাদেশ এখন জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে চলেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি হবে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংস্কারের বিষয়ে গণভোট। ডিসেম্বর ২০২৫ জাতীয় জীবনে কিছু দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গাছে। জুলাই ২০২৪ আন্দোলন থেকে আলোচনায় আসা জনৈক তরুণ বিপ্লবী ওসমান হাদি স্বল্প সময়ে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জনের পর ঢাকায় প্রকাশ্য রাজপথে লিবালোকে নৃশংসভাবে নিহত হলে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই সময়ে বাংলাদেশের তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় এভার কেয়ার হসপিটালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন। স্মরণীয় যে জুলাই আগস্ট ২০২৪ ছাত্র-জনতার আন্দোলন সময়ে মেটিকুলাস ডিজাইনে ক্ষমতা হারিয়ে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় খালেদা জিয়া নেতৃত্বের বিএনপি মূলধারার প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। অনেক রাজনৈতিক সমীকরণের আপাত সমাধানের পর দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক জিয়া। 

কিন্তু দুঃখজনক যে তার সাড়ম্বরে দেশে প্রত্যাবর্তনের কয়েকদিন পরে এভার কেয়ার হসপিটালে থাকা খালেদা জিয়ার মৃত্যুসংবাদ ঘোষিত হয়। শোকে শোকাতুর জাতি গভীর শ্রদ্ধায় জনপ্রিয় নেত্রীকে চিরবিদায় জানায়। উত্তরাধিকারী হিসাবে তারেক জিয়া এখন দেশের বর্তমান বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রধান। দলটি আবার রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে ২০০৯-২০২৪ দলটির সঙ্গে রাজপথে তাদের মতে গণতন্ত্র পুনঃউদ্ধার সংগ্রামে থাকা দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী জোট বেঁধেছে। প্রধান প্রতিপক্ষ অপর সংঘটিত রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতে ইসলামী এবং সমমনা কিছু দক্ষিণপন্থী দল। স্মরণে রাখতে হবে অন্তর্বর্তী সরকারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না আওয়ামী লীগ এবং সমমনা কিছু দল।

বাংলাদেশ তথা বিশ্বরাজনীতিতে উত্তরাধিকার নতুন কিছু দিন। শুধু বিকাশমান গণত্রন্ত্রের দেশে নয় অনেক প্রতিষ্ঠিত দেশেও দেখা গেছে সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানের ছেলে মেয়েরা উত্তরাধিকারী হিসেবে রাজনীতিতে এসেছেন। পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে। বাংলাদেশের কথাই বলি। ১৯৭১ দীর্ঘ সাড়ে নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ক্ষমতায় আসীন বঙ্গবন্ধু সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল মাত্র সাড়ে তিন বছর। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ কিছু সেনাসদস্য বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ড ঘটায়। পরবর্তী ঘটনা পরম্পরায় মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্স অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান জেনারেল জিয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে ১৯৮১ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকেন। ১৯৮১ তিনিও সামরিক অভ্যুথানে নিহত হন। বাংলাদেশে এই দুঃখজনক হত্যাকাণ্ড না হলে হয়তো পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আবির্ভূত হতেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে নেতৃত্ব দিয়ে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা। দুই মেরুর দুদলের দেশ শাসনে অনেক সাফল্য ব্যর্থতা আছে। আবার দুদলের রাজনৈতিক কৌশলের চোরা গলিপথে বিকশিত স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী এখন শক্তিশালী দল। সঙ্গে জোট বেঁধেছে জুলাই আগস্ট ২০২৪ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট কিংস পার্টি এনসিপি।

যদি সব কিছু সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে যায় তাহলে নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি জোট এবং জামায়াত জোটের মধ্যে। এখন নির্বাচনে সামনে রেখে খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারী তারেক জিয়ার সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ মাঠ পর্যায়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে নির্বাচনে জনজোয়ার সৃষ্টি করে জয়লাভ এবং জোটকে দেশ শাসনের জন্য প্রস্তুত করা। মনে রাখতে হবে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির সঙ্গে ২০০১-২০০৬ সরকারে ছিল। দুদলের নির্বাচনী সমঝোতা এখন ভেঙে পড়লেও আওয়ামী লীগ বিরোধিতায় দ্বিমত নেই। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মব সন্ত্রাস বিএনপিকে জামায়াত থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে। তারেক জিয়া দীর্ঘ সময়ে বিদেশে থেকে রাজনৈতিকভাবে কতটা পরিপক্ষ হয়েছেন এখন সেটির অগ্নিপরীক্ষা হবে। প্রথমেই ধরে রাখতে হবে দলের একতা। ভারত জুজুর ভয় থেকে মুক্ত করে দল এবং দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করে দেশপ্রেম সৃষ্টি করতে হবে, সর্বস্তরে উৎপাদনমুখী সৃজনশীল রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টি করতে হবে। জেনে ভালো লাগছে তারেক জিয়ার ‘আমার একটি প্ল্যান আছে’ স্টেটমেন্ট এবং সবার আগে বাংলাদেশ স্লোগান। তারেক জিয়াকে বিচার এবং সংস্কার বিষয়েও নির্মোহ নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে হবে। ২০০২-২০০৬ নিজের, তথা দলের বিরুদ্ধে কথিত কলুষিত ভাবমূর্তি দূর করে স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ভাবমূর্তি স্মৃতি করতে হবে। যদি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে তাহলে দেশের স্বার্থে ন্যূনতম ইস্যুর ভিত্তিতে জাতীয় সরকার গঠনের কথা ভাবতে হবে। দেশ চলবে মেধার ভিত্তিতে আধুনিক দর্শনের যুব সমাজের নেতৃত্বে। চ্যালেঞ্জগুলো কিন্তু সহজ নয়।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)