বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফোর মাইনাস তত্ত্ব নিয়ে তোলপাড় বইছে। এই তোলপাড়ের মধ্যে নতুন একটি খবর হচ্ছে ‘ফোর মাইনাস থিওরির মধ্যে ঘি ঢেলে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের নতুন ব্যাখ্যায় ফোর মাইনাসের গন্ধ পাচ্ছে অনেকে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন ব্যাখ্যায় কি আছে
চলতি বছরে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও উৎসবমূখর করতে অন্তর্বতী সরকার নানান ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে শঙ্কার পাশাপাশি কারো কারো মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হবে কি-না? তা না হলে দেশে বিদেশে নির্বাচন কি প্রশ্নবোধক কিংবা গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটি ঝুলে থাকবে কি-না?। এমন প্রশ্নের জবাব মিলেছে ঢাকার একটি হোটেলে সংবাদ সম্মলনে। এতে ইইউ ইওএম মিশন প্রধান সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
এতে বলা হয় যে, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের জন্য ‘সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণকে’ আর শর্ত হিসেবে দেখছে না ইউরোপ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত শব্দ দুটির নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের (ইইউ ইওএম) প্রধান ইভার্স ইয়াবস। তিনি বলেন, ইইউর প্রধান পর্যবেক্ষক ইয়াবস বলেছেন, নির্বাচনে সমাজের সব শ্রেণি ও গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এর মূল কথা।
তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দৃষ্টিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলতে প্রথমেই বোঝায়-বাংলাদেশের সব সামাজিক গোষ্ঠীর নাগরিকদের অংশগ্রহণ। যেমন নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ যেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।’
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত একজন সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন অতীতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের ওপর জোর দিতেন ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতেরা। ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ ও ‘অংশগ্রহণমূলক’ শব্দ দুটির সংজ্ঞায় হঠাৎ পরিবর্তন কেন?
এই প্রশ্নের জবাবে ইইউর প্রধান পর্যবেক্ষক ইয়াবস জানান, তাঁরা ‘অংশগ্রহণ’ বলতে ‘বিশ্বাসযোগ্য ভোটার উপস্থিতি’ বোঝেন। তাঁর মতে, এমন অংশগ্রহণই প্রমাণ করবে যে, বাংলাদেশের নাগরিকেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছেন। ‘অন্তর্ভুক্তির’ বিষয়ে ইয়াবস বলেন, এটি একটি বিস্তৃত ধারণা। এর মধ্যে যেমন নাগরিকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে তাঁদের ভোট সঠিক ও স্বচ্ছভাবে গণনার নিশ্চয়তাও।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে গত বছর। নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন স্থগিত করায় দলটি এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
এমন প্রসঙ্গে ইঙ্গিত করে ইইউর প্রধান পর্যবেক্ষক বলেন, ‘আমরা সবাই জানি, রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের বিষয়টি একটি ইস্যু। ঐতিহাসিকভাবে এটি এখানে জাতীয় ঐকমত্য ও অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত এবং বিষয়টি বেশ জটিল। আমরা এসব বিষয়ে মন্তব্য করব না। তবে নির্বাচন ও ভোটার উপস্থিতিতে যদি এর প্রভাব পড়ে, তাহলে অবশ্যই আমরা সেটির দিকে নজর দেব।’
সংখ্যালঘু প্রশ্ন
এসময় তার বক্তব্যে সংখ্যালঘুদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিষয় উঠে আসে। এব্যাপারে ইয়াবস বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা দেশের সব ৬৪টি জেলায় পর্যবেক্ষক পাঠাব এবং তাদের এ ধরনের সম্ভাব্য ঘটনার প্রতিত বিশেষ নজর দিতে বলা হবে।’
বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠিয়েছে। ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। আওয়ামী লীগ সরকারের তিনটি নির্বাচনে পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠায়নি ইউরোপ। লাটভিয়ার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য ইভার্স ইয়াবসের নেতৃত্বে মিশনটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে কাজ শুরু করে এবং ধাপে ধাপে বিস্তৃত হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছেন, যাঁদের দেশের ৬৪টি জেলায় মোতায়েন করা হবে বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়।
বিশ্লেষণ কি বলে..
বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের ব্যাপারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন ব্যাখ্যায় অনেকে সরাসরি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফোর মাইনাস তত্ত্বের প্রতি ইঙ্গিত দেখছেন। কেননা এতে দেশের সক্রিয় রাজনৈতিক দলণগুলিকে আসলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন খুব একটা আমলে নিচ্ছে না বলে ধরে নেওয়া যায়। তাদের কাছে এখন বড়ো রাজনৈতিক দল বা পরিবারতন্ত্রটি প্রাধান্য পাওয়া যাচ্ছে না ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের ইস্যুতে নতুন ব্যাখ্যা পড়ে দেখলে তা-ই মনে হয়।
এতে দেখা যাচ্ছে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচন প্রশ্নে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চায় বাংলাদেশের সব সামাজিক গোষ্ঠীর নাগরিকদের অংশগ্রহণ। যেমন নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এবং এর পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের (প্রান্তিক জনগণ বা তৃণমূলের প্রতিনিধিত্ব) নির্বাচনে অংশগ্রহণ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন পশ্চিমাদের এমন ইচ্ছা ঠিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগে উঠানোর বিষয়টি বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। এতে স্পষ্ট ফুটে উঠে যে বাংলাদেশে প্রতিটি ক্ষেত্রে বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক দলের চেয়ে তারা সামাজিক গোষ্ঠীর নাগরিকদের অংশগ্রহণ।
যেমন নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, পাশাপাশি প্রান্তিক জনগণ বা তৃণমূলের কন্ঠকে প্রাধান্য দিচ্ছে। কারো কারো মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই নতুন বক্তব্য এমন সময় আসে যখন মাত্র কয়েকদিন আগে ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক পাওলা পাম্পালোনির নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল জামায়াতের সাথে বৈঠক করেন। এসময় দলে ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মি. মাইকেল মিলার এবং ইউরোপীয় এক্সটারনাল অ্যাকশন সার্ভিস দক্ষিণ এশীয় উপপ্রধান মনিকা বাইলাইতে। এই বৈঠকের পর জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানো ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ইইউ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাদের বলেছি, ‘বাংলাদেশে যে সংকট তৈরি হয়েছে তা থেকে উত্তোরণে বাংলাদেশে স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন জরুরি। যদি তা না হয়, তাহলে সংকট সমাধান হবে না।
বরং নতুন সংকট তৈরি হবে এবং চলমান সংকট গভীরতর হবে।’ এ আশঙ্কার কথা ইইউ প্রতিনিধিদের স্পষ্টভাবে বলেছি। কারো কারো মতে, নির্বাচন শুরু হওয়ার আগে ভাগেই অতীতের মতো একে প্রশ্নবোধক করে তোলার মতো আবারও সে-ই পরিস্থিতি তাদের নজরে এসেছে। সেদিক থেকেও কারো কারো মতে, রাজনৈতিক দলগুলি এমন দলাদলি আর দেখতে চান না বলেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের নতুন ব্যাখ্যায় যেতে হচ্ছে। কারো কারো মতে, পশ্চিমারা বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন চাইলেও তারা বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের আদলে একটি সরকার চায়। কেননা অর্ন্তবর্তী সরকারকে তারা তাদরে চোখে দেখেছে বা তাদের মনে হচ্ছে এই ধরনের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের প্রতিনিধিত্ব। পশ্চিমারা চায় এমন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি দিয়েই আগামী বাংলাদেশ গড়ে উঠুক। যেখানে প্রাধান্য থাকবে না কোনো বড়ো রাজনৈতিক দলের একক কতৃত্ব বা বা পরিবারতন্ত্রের প্রাধান্য। থাকবে সুশীল সমাজ বা দেশের বিশিষ্ট জনদের নিয়ে গড়ে উঠা প্রতিবাদি নাগরিক সমাজের প্রাধান্য, হোক না সে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাধারণ কেউ।
কারো কারো মতে, বর্তমানে পশ্চিমাদের এমন প্রস্তাবকে কেউ কেই ফোর মাইস থিওরি হিসাবে আশঙ্কা করছেন। সম্প্রতি ফোর মাইনাস থিওরিটি প্রকাশ পায় বা আলোচনা এসেছিল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার বিষয় ঘিরে। বিষয়টি যে এখনই মিটমাট বা চাপা পড়ে গেছে তা মনে হয় না ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন তত্ত্বে। গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনীতি ও রাষ্ট্র সংস্কারের বড় দাবি রয়েছে আন্দোলনকারীদের। ২০০৭ সালে এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও রাজনীতিতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। সে সময় আলোচিত হয়েছিল ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’।