ঠুনকো অজুহাতে মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে অন্যায়ভাবে বাদ দেয়ার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের ভারতে আসন্ন আইসিসি টি ২০ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ আছে। বাংলাদেশ, ভারত মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রচুর লেখালিখি হচ্ছে, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিস্তর আলোচনা চলেছে, কনটেন্ট ক্রিটোররা চুটিয়ে বাণিজ্য করেছে। বিসিসিআইয়ের নির্দেশে মুস্তাফিজকে অন্যায়ভাবে বাদ দিয়ে অন্যায় করেছে আইপিএল তথা কেকেআর।
সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের শীতলটাকে টেনে আনা হয়েছে খেলার মাঠে। বিশাল দেশ ভারত, সেখানে আছে ক্রিকেট নিয়ে উন্মাদনা। তেমনি বাংলাদেশে রয়েছে ক্রিকেটের অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা। আর ক্রিকেটের সঙ্গে বলিউডকে সম্পৃক্ত করে আইপিএল পেশাদার ক্রিকেটারদের জন্য হয়ে উঠেছে তীর্থভূমি। আবার আইসিসির অর্থায়নে বিসিসিআইর মুখ্য ভূমিকা থাকায় এমনকি তিন মোড়লের ওপর দুই মোড়ল অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড বিসিসিআইর একচেটিয়া প্রাধান্য নয় উচ্চ কণ্ঠ নয়।
দীর্ঘদিন নিরাপত্তার অজুহাতে ভারত পাকিস্তানে খেলতে যায় না। ভারতকে পেতে পাকিস্তান বহু দেনদরবার করেছে। এর বড় কারণ অর্থ। ভারত পাকিস্তানে গেলে যে পরিমাণ অর্থ সংগৃহীত হয়, ততটা আর কোনো দলের ক্ষেত্রেই হয় না। দুই দেশের ক্রিকেট উম্মাদনা তো আছেই। কিন্তু ২০০৯ এর পর থেকে ভারত পাকিস্তানকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করতেই ক্রিকেটেও নিয়ে আসে পলিটিক্স। ও খেলতে পাঠায় না দল। এতে ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট ঘিরে গোটা বিশ্বে একটা উম্মাদনা, সেটা ম্লান হয়ে গেছে। অগত্যা ভারতের অমন সিদ্ধান্তে একইভাবে পাকিস্তান ভারতে শুধু ক্রিকেট নয় এখন কোন খেলা খেলে না। দুই দল ক্রিকেটে দীর্ঘদিন দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট খেলে না। বৈষয়িক টুর্নামেন্টগুলো হাইব্রিড পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে যদি বাংলাদেশ এবং ভারতের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা হয়, তাহলে ভারত অচিরে অন্যান্য দেশের জন্য নিষিদ্ধ ক্রীড়াঙ্গনে পরিণত হয়ে যেতে পারে। যতই বলা হোক এটা উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দাবি, কিন্তু এর পেছনে রাজনৈতিক ইন্দন রয়েছে, সেটা বুঝতে বাকি নেই, অন্তত পাকিস্তান ইস্যু বিবেচনা করলে।
সবাই জানে বাংলাদেশে আগস্ট ২০২৪ সরকার পরিবর্তনের পর নানা কারণে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের শীতলতা সৃষ্টি হয়েছে। সে সম্পর্কের অবনতি কতদূর চলে এসেছে, সেটা সম্ভবত ক্রিকেটের ঘটনায় প্রকাশ পেল। দুই দেশের জন্যই এটা দুঃখজনক। কারণ ক্রিকেটের এলিট ক্লাবে যেমন ভারত, বাংলাদেশও সেই ক্লাবের সদস্য। এক ডজন দেশের মত আইসিসি’র এলিট ক্লাবের সদস্য। এরই মধ্যে দুটির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নষ্ট মানে ভবিষ্যতে অনেক ক্ষেত্রেই ভারত ও অন্যদেশসমূহকে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দ্বিপাক্ষিক, টুর্নামেন্ট সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে। আজ বাংলাদেশ যেমন ভারতে নিরাপদ মনে করছে না, পাকিস্তান যেভাবে নিরাপদ মনে করছে না। তেমনি এ তালিকায় নিরাপত্তা নিয়ে খুত খুতে স্বভাবের অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড যে যুক্ত হবে না তার গ্যারান্টি কী। ভলে এটা ক্রিকেটের মত জেন্টেলমেন্ট গেমে শোভনীয় নয়।
ভারত ও বাংলাদেশে দুই দেশেই রাজনৈতিক দলের কতিপয় উগ্র মানুষ এবং সংগঠন গুলো প্রতিনিয়ত বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে। টি ২০ বিশ্বকাপ এবারে হাইব্রিড পদ্ধতিতে আয়োজন করছে ভারত এবং শ্রীলংকা। শুরু হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশ গ্রূপ পর্যায়ের চারটি খেলার তিনটি খেলবে কলকাতায় একটি মুম্বাইতে। মুস্তাফিজ ঘটনার পর বাংলাদেশ যৌক্তিকভাবেই ভারতে বাংলাদেশের দলের (খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, সাংবাদিক, সমর্থক) নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত হয়ে আইসিসির কাছে ভেন্যু পরিবর্তন করে শ্রীলংকায় স্থানান্তরের অনুরোধ করেছে। আইসিসি জবাবে নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের শংকাগুলো ব্যাখ্যা করে জানাতে বলায় বিসিবি থেকে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। আইসিসি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে এখনো কিছু জানানো হয় নি। শোনা গাছে শীঘ্রই বিষয়টি নিয়ে আইসিসি এবং বিসিবির একটি আলোচনা সভা হবে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে মিডিয়াসমূহ অনুমান ভিত্তিক নানা সংবাদ (অধিকাংশ গুজব) প্রচার করে বিষয়টিকে বিষাক্ত করেছে। এই বিষয়ে ভারত সরকার সরাসরি কিছু না বললেও অন্তর্বর্তী কালীন সরকারের ক্রীড়া বিষায়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বার বার বক্তব্য দিচ্ছেন। বিষয়টি ক্রিকেট বিষয়ক। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব বিসিবির। বাংলাদেশ কিন্তু আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশ। কোয়ালিফাই করে বিশ্বকাপে খেলেছে। আলোচনার মাধ্যমে সব পক্ষের জন্য সম্মানজনক সমাধানের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলুক সেটি কাঙ্ক্ষিত। সেখানে বিষয়টি নিয়ে কারো নায়ক হবার অপচেষ্টা কাঙ্খিত নয়।
আইসিসির নিরাপত্তা কমিটি ভারতে বাংলাদেশ দলের খেলা নিয়ে রিস্ক এনালাইসিস করেছে। তিনটি বিষয় ধরা পড়েছে। এক বাংলাদেশ দলে মুস্তাফিজ খেলা, দুই খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের বাংলাদেশের জার্সি পরে ঘোরাফেরা করা এবং তৃতীয়টি ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন। এগুলো নিতান্তই একাডেমিক বিশ্লেষণ। এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে জানানো হয় নি। তাই এই বিষয়গুলো নিয়ে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের উপদেষ্টার কথা কিছুটা আগ বাড়িয়ে বলা বলেই মনে হচ্ছে। আইসিসি এমন কোন সিদ্ধান্ত দিবে না যেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ না খেলতে বাধ্য হয়। আর যদি আদৌ সেই অবস্থার সৃষ্টি হয় তখন বিসিবি নিজেদের বিবেচনায় ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নিবে। এটি নিয়ে কাউকে ভারতীয় দালাল বলার নৈতিক অধিকার কারো নেই।
খেলাধুলোর সাথে রাজনীতি গুলিয়ে ফেলা দুঃখজনক।