নজিরবিহীন ত্যাগের বিনিময়ে কর্তৃত্ববাদী চোরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের যে অভীষ্ট লক্ষ্য সূচিত হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত বিভিন্ন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম ‘সংস্কার-বিমুখতা’ ও ‘আমলাতান্ত্রিক আধিপত্যের’ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ফলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলছে, সংস্কারের প্রশ্নে সরকার আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী মহলের অপশক্তির কাছে নতি স্বীকার করেছে।
গত সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ প্রণয়নে সংস্কার বিমুখতা’ শীর্ষক এক পর্যালোচনা প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব মন্তব্য করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পর্যালোচনাটি উপস্থাপন করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১১টি সংস্কার কমিশন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, একাধিক শ্বেতপত্র কমিটি, বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিটি, এবং গুমসংক্রান্ত ‘কমিশন অব এনকোয়ারি’ গঠনের পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানকালে কর্তৃত্ববাদী সরকার কর্তৃক পরিচালিত হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের জন্য জাতিসংঘকে আহ্বান জানানোর মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, সরকার সার্বিকভাবে সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা ও কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের সূচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার-প্রতিরোধক মহলকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছে। জুলাই সনদকে যুক্তিহীনভাবে লঙ্ঘন করে আমলাতন্ত্রের একাংশের অন্তর্ঘাতমূলক অপশক্তির কাছে নতি স্বীকার করায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাতিল করা হয়েছে। এটি পরবর্তী সরকারের জন্য একটি নেতিবাচক উদাহরণ হিসেবে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।’
তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কারে একটি স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি গঠনের সুপারিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ’ প্রণয়নের মাধ্যমে একটি জনকল্যাণমুখী বাহিনী গঠনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করা হয়েছে। এই অধ্যাদেশে ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ’ শব্দগুলো পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়নি। বাছাই কমিটিতে নাগরিক প্রতিনিধির বদলে সচিবদের অন্তর্ভুক্ত করা পুলিশ কমিশনকে আমলাদের ক্ষমতার অপব্যবহারের ‘রিসোর্ট’-এ পরিণত করার সুযোগ করে দিয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়ে টিআইবি জানায়, শেষ পর্যায়ে অংশীজনদের অন্ধকারে রেখে বাছাই কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা কমিশনের ওপর সরকারি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠারই নামান্তর। এছাড়া সাইবার সুরক্ষা ও উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশগুলোতে ইতিবাচক কিছু দিক থাকলেও, বিচারিক সুরক্ষা ছাড়াই নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যে রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে বাধাহীন প্রবেশের সুযোগ রাখা হয়েছে। টিআইবি মনে করে, এটি সুরক্ষার নামে ‘নজরদারিভিত্তিক শাসনব্যবস্থা’ চালু রাখার আইনি ব্যবস্থা।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উল্লেখ করা হয়, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, নারীবিষয়ক ও শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। পাশাপাশি শিক্ষা ও কৃষির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে সংস্কারের তালিকার বাইরে রাখাকে সরকারের প্রস্তুতির অভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।