দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী (মিডটার্ম) নির্বাচনকে সামনে রেখে যেভাবে নির্বাচন ব্যবস্থার নিয়ম ও কাঠামো বদলানোর চেষ্টা করছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন অনেক রাজনীতিবিদরা। পাঁচ বছর আগে ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর ভোট খুঁজে বের করতে স্থানীয় ও স্টেট পর্যায়ের রিপাবলিকান কর্মকর্তাদের ওপর চাপ দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছিল, এবার ট্রাম্প তার চেয়েও একধাপ এগিয়ে ভোট গ্রহণের আগেই নিয়ম বদলানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।
ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস তার বিরুদ্ধে তদন্ত, অভিশংসন বা নীতিগত বাধা সৃষ্টি করতে পারে, এ আশঙ্কা থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচনের কাঠামো প্রভাবিত করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন । এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে কংগ্রেসনাল আসনের সীমানা নতুন করে আঁকার জন্য স্টেটগুলোর ওপর চাপ, ডাকযোগে ভোটদান বন্ধের দাবি, ভোটিং মেশিনের ওপর আক্রমণ, কোটি কোটি ভোটারের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা এবং নির্বাচন নিয়ে সংশয়বাদী ও অস্বীকারকারীদের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো শুধু রাজনৈতিক প্রচারণা নয়; বরং নির্বাচনী ব্যবস্থার ভিত্তিতেই আঘাত হানছে। স্ট্যানফোর্ড ল স্কুলের অধ্যাপক নাথানিয়েল পার্সিলির ভাষায়, ২০২৬ সালের নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার আশঙ্কা করছি। একসঙ্গে এত পরিবর্তনের প্রস্তাব আসছে, যখন মানুষ আগেই নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেছে।
কংগ্রেসনাল আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণে চাপ
ট্রাম্প রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত স্টেটগুলোকে দশকভিত্তিক সাংবিধানিক সময়সূচির বাইরে গিয়ে কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট পুনর্নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। ওহাইও, মিসৌরি, নর্থ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসে রিপাবলিকানরা ইতিমধ্যে নিজেদের পক্ষে নয়টি আসন আরও অনুকূল করেছে। ফ্লোরিডাতেও এমন উদ্যোগ বিবেচনাধীন। এর ফলে হাউসে রিপাবলিকানদের অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা টিকিয়ে রাখা সহজ হতে পারে। যদিও কিছু স্টেট আদালতে চ্যালেঞ্জ চলছে এবং কয়েকটি স্টেটের রিপাবলিকান নেতারা এই চাপে সাড়া দেননি।
ডাকযোগে ভোট বন্ধের দাবি
ডাকযোগে ভোটকে দীর্ঘদিন ধরে আক্রমণ করে আসছেন ট্রাম্প। আগস্টে তিনি এ পদ্ধতি বন্ধে একটি আন্দোলন নেতৃত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেন এবং নির্বাহী আদেশের ইঙ্গিত দেন। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার ক্ষমতা অঙ্গরাজ্য ও কংগ্রেসের হাতে; প্রেসিডেন্টের নয়। ফলে এমন উদ্যোগ আদালতে গড়ানোর সম্ভাবনাই বেশি। তবু বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যই ভোটারদের মধ্যে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
ভোটিং মেশিনের ওপর আক্রমণ
ভোটিং মেশিনকে সম্পূর্ণ বিপর্যয় আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প এগুলোর ব্যবহার বন্ধের কথা বলেছেন, যদিও সব অঙ্গরাজ্যেই ভোট গণনায় মেশিন ব্যবহৃত হয়। মেশিন বন্ধ হলে ফল ঘোষণায় বিলম্ব, পুনর্গণনা ও আইনি জটিলতা বহুগুণে বাড়বে বলে সতর্ক করেছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা। ট্রাম্প এককভাবে এটি বন্ধ করতে না পারলেও ফলাফল নিয়ে সন্দেহ ছড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা
ন্যায়বিচার বিভাগ অন্তত ৪০টি অঙ্গরাজ্যের কাছ থেকে ভোটার তালিকা চাইছে, অনেক ক্ষেত্রে জন্মতারিখ ও আংশিক সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বরসহ। প্রশাসনের দাবি, ভোটার তালিকা হালনাগাদ নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ। কিন্তু সমালোচকদের আশঙ্কা, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার খর্ব হতে পারে এবং ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার হাতিয়ার তৈরি হতে পারে।
নির্বাচন অস্বীকারকারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ
অ্যাটর্নি জেনারেল, এফবিআই পরিচালক, বিচার বিভাগ ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটির শীর্ষ পদে এমন ব্যক্তিদের বসানো হয়েছে, যারা ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল মানতে অস্বীকার করেছেন বা জালিয়াতির দাবি তুলেছেন। এই কর্মকর্তারা এখন নির্বাচন নীতিমালা পরিবর্তন, তদন্ত ও মামলার মাধ্যমে স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।
নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের আশঙ্কা
ডেমোক্র্যাট-শাসিত শহরগুলোতে আইসিই অভিযান ও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন বাড়ানো হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এসব পদক্ষেপ ভোটারদের ভয় দেখাতে ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও আইনে ভোটকেন্দ্রে সামরিক উপস্থিতি নিষিদ্ধ, তবু অতীত অভিজ্ঞতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
নতুন আদমশুমারির প্রস্তাব
ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসীদের বাদ দিয়ে আগাম আদমশুমারির কথা বলেছেন, যা বাস্তবায়িত হলে কংগ্রেসনাল আসন বণ্টন ও ইলেকটোরাল ভোটে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে সংবিধান অনুযায়ী সব বাসিন্দাকে গণনায় অন্তর্ভুক্ত করার বিধান থাকায় এটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলেই ধারণা।
সব মিলিয়ে আদালত ও স্টেট গভর্নমেন্টগুলোর প্রতিরোধ সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসনের এসব উদ্যোগ ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা, আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, এ প্রবণতা চলতে থাকলে শুধু একটি নির্বাচন নয়, যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপরই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।