পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, পরিবেশ সুরক্ষা ও রাজধানীকে বসবাসযোগ্য করতে রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এজন্য খণ্ডকালীন ও সীমিত প্রকল্প থেকে সরে এসে কৃষি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় ব্যবস্থাপনাসহ সব খাতে সমন্বিত ও পদ্ধতিগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তবে তারা অভিযোগ করেন পরিবেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহু সমস্যা পুঞ্জীভূত হলেও পরিবেশ নিয়ে কোনো সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়নি। ফলে পরিবেশের বিভিন্ন সমস্যাবলি যথাযথ পর্যালোচনা ও সুপারিশ প্রণয়ন করা যায়নি।
গত ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ‘পরিবেশ সংক্রান্ত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় পরিবেশ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, যেসব পরিকল্পনা পরিবেশের ভালো করার জন্যও করা হয় সেগুলোও পরিবেশের ওপর ক্ষতি করে। যেকোনো প্রকল্প করতে গেলেই পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। সেক্ষেত্রে ক্ষতির মাত্রা সহনীয় থাকে এমন প্রকল্প গ্রহন করা উচিত। পরিবেশের ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে আরো বেশি কঠোর হওয়া দরকার। প্রকল্প গ্রহণ করার সময় নীতিনির্ধারকদের পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রকল্প গ্রহণ করার ক্ষেত্রে স্থানীয় পরিবেশবাদী ও স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্তকরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাপাকে এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। পাবলিক প্লেস ধূমপানমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি লেড পয়জনিং বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বাপার প্রতি আহ্বান জানান।
সম্মেলনের সকালের অধিবেশনে নগর উন্নয়ন গবেষণা কেন্দের চেয়ারম্যান নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম সভাপতির বক্তব্যে বলেন ড. নজরুল ইসলাম বলেন, পরিবেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহু সমস্যা পুঞ্জীভূত হলেও পরিবেশ নিয়ে কোনো সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়নি। ফলে পরিবেশের বিভিন্ন সমস্যাবলি যথাযথ পর্যালোচনা ও সুপারিশ প্রণয়ন করা যায়নি। পরিবেশের সমস্যা সমাধানে সাফল্যের জন্য কেবল নীতির সংস্কার যথেষ্ট নয়, সঙ্গে পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহেরও সংস্কার প্রয়োজন। এ সম্মেলনের সুপারিশের আলোকে নীতি সংস্কারের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে আগামী সরকার উদ্যোগী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন-সিভিল ডিফেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক একেএম সাকিল নেওয়াজ, বিশিষ্ট নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মো. শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী, কৃষিবিদ মো. শাহ কামাল খান, বাপার কোষাধ্যক্ষ জাকির হোসেন, বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির প্রমুখ।
অবসরপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা একেএম সাকিল নেওয়াজ বলেন, ঢাকা শহর ভয়াবহ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে আছে। ভূমিকম্প হবেই, আজ হোক বা কাল হোক, ছোট হোক বা বড় হোক। তাই আমাদের ভূমিকম্পের দুর্যোগ মোকাবিলায় এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি বলেন আমরা নীতি মানিনা, বিধিবিধান মানি না, জায়গা আছে ভবন নির্মাণ করি।
পরিকল্পিত নগরায়ন, শহরের বিকেন্দ্রীকরণ ও গ্রামীণ জীবনযাত্রা এবং জীবনমান উন্নয়নের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা শহর। রাজধানীকে বসবাসযোগ্য করতে নতুন উন্নয়নের চেয়ে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যমান কাঠামোর পুনর্গঠন করতে হবে। পরিবেশবান্ধব, সুপরিকল্পিত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
দ্বিতীয় দিনে ৭টি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ‘বায়ু, শব্দ ও পানিদূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ড. মাহবুব হোসেন। ‘দুর্যোগ, আবহাওয়া পরিবর্তন ও অন্যান্য বিষয়ক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষক মো. নিয়ামুল নাসের। ‘নগরায়ণ ও ভৌত পরিকল্পনা এবং যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থা’ বিষয়ক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান। জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্যান্য’ বিষয়ক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন তিস্তা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল ইসলাম সেলিম।
সম্মেলন শেষে সম্মেলনের বিষয় বস্তুর ওপর একটি প্রস্তবানা উপস্থাপন করেন বেনের প্রতিষ্ঠাতা ও বাপার সহ-সভাপতি ড. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংস্কার কমিশিন করা হলেও আজ পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষায় কোনো সংস্কার কমিশন করা হয়নি। যা পরিবেশবাদীদের মনে হতাশার সৃষ্টি করেছে।
উদ্বোধনী ও সমাপনী অধিবেশন ছাড়া সম্মেলনের অধিবেশনের সংখ্যা ছিল ১৯টি; তার মধ্যে সম্মিলিত অধিবেশন ছিল ৩টি এবং সমান্তরাল অধিবেশন ছিল ১৬টি। সম্মেলনে বিদেশ থেকে যোগদানকারী জন্য একটি অনলাইন/ভার্চুয়াল অধিবেশনও আয়োজিত হয়। সব মিলিয়ে অধিবেশনে মোট ১২০টি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়।