যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ বিস্তারে অর্থায়ন ও নেটওয়ার্কের ভূমিকা


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 14-01-2026

যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ বিস্তারে অর্থায়ন ও নেটওয়ার্কের ভূমিকা

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মুসলিমবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়া এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত, অর্থায়িত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী শিল্পে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করছেন গবেষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। অনলাইন ঘৃণাবক্তব্য থেকে শুরু করে সরকারি নীতি ও নির্বাচিত কর্মকর্তাদের বক্তব্য পর্যন্ত ইসলামোফোবিয়া আজ আমেরিকার সামাজিক, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গভীরভাবে প্রোথিত। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সরকার ও প্রভাবশালী মহলের একাংশ এমন নীতি ও বক্তব্য ব্যবহার করছে, যা এখন ইঙ্গিত দেয় যে ইসলাম ও মুসলিমদের যেন মার্কিন সমাজে কোনো স্থান নেই। এতে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান অধিকারের মতো সাংবিধানিক মূল্যবোধ হুমকির মুখে পড়ছে।

ইসলামোফোবিয়া বলতে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি ভয়, ঘৃণা বা বিদ্বেষকে বোঝায়, যার ফলে বৈষম্য ও নিপীড়নের একটি ধারাবাহিক চর্চা গড়ে ওঠে। এতে ইসলামকে একটি বৈশ্বিক ও ঐতিহাসিক ধর্ম হিসেবে না দেখে সহিংসতা, ষড়যন্ত্র কিংবা সভ্যতার জন্য হুমকি এমন স্টেরিওটাইপে সীমাবদ্ধ করে উপস্থাপন করা হয়। মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ও জাতিগত বৈচিত্র‍্যকে উপেক্ষা করে তাদের একক, ভীতিকর পরিচয়ে রূপ দেওয়া হয়। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সমসাময়িক ইসলামোফোবিয়া জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আরো শক্তিশালী হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি নীতির মাধ্যমেই তা বৈধতা পায়। সাবেক ও বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণ এবং নজরদারি নীতিকে এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে তথাকথিত ‘ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্ক’-এর অস্তিত্ব বর্তমানে যা কোনো একক সংগঠন নয়, বরং ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের একটি বিকেন্দ্রীকৃত জোট। এ গোষ্ঠীগুলো চরম মুসলিমবিদ্বেষী আদর্শ ভাগাভাগি করে এবং জনমত ও সরকারি নীতিকে প্রভাবিত করতে একে অপরের সঙ্গে কাজ করে। এ নেটওয়ার্কে প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঢালা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে ভয় ও ঘৃণা ছড়াতে, আইনি লড়াই চালাতে এবং মুসলিমবিরোধী নীতির পক্ষে লবিং করতে।

২০২৪ সালে ইসরায়েল তাদের বৈশ্বিক জনসংযোগ (পিআর) বাজেট ১৫০ মিলিয়ন ডলার বাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। এর উদ্দেশ্যহলো কনশাসনেস ওয়ারফেয়ার বা জনমত প্রভাবিত করার অভিযান জোরদার করা। ২০২৫ সালে একটি পিআর প্রতিষ্ঠানের ফাঁস হওয়া নথিতে দাবি করা হয়, এ প্রচেষ্টার একটি অংশ মুসলমানদের নিয়ে জনমনে ভয় সৃষ্টি করা। এই অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে প্রতি মাসে হাজার হাজার বিজ্ঞাপন তৈরি করা হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে প্রো-ইসরায়েল ও মুসলিমবিরোধী কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ইসলামোফোবিয়া আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের এক সদস্যের পশ্চিমা দেশগুলো থেকে মুসলমানদের বহিষ্কার-এর আহ্বান, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তার মুসলিমবিরোধী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো, ট্রাম্প প্রশাসনের বৈষম্যমূলক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল এবং টেক্সাস ও ফ্লোরিডার গভর্নরের বিরুদ্ধে কেয়ার-এর মতো মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠনের ওপর আক্রমণের অভিযোগসহ সব মিলিয়ে ইসলামোফোবিয়া এখন রাজনীতির মূলধারায় ঢুকে পড়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। নির্বাচনের সময়গুলোতে মুসলিমবিদ্বেষ বাড়ে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানির নির্বাচনী প্রচারণাও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

২০২৫ সালের জুনে সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মামদানিকে নিয়ে পোস্ট বিশ্লেষণ করে। এতে দেখা যায়, পর্যালোচিত কনটেন্টের প্রায় ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশে প্রকাশ্য মুসলিমবিদ্বেষী ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মেই জুন থেকে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত ৩৫ হাজার ৫০০টির বেশি ইসলামোফোবিক ও বিদেশিবিরোধী পোস্ট শনাক্ত করা হয়। নির্বাচনের পর মামদানিকে সন্ত্রাসী সমর্থক, জিহাদিস্টবলে আখ্যা দেওয়া হয় এবং তার জয়কে মিথ্যাভাবে ৯/১১ হামলার সঙ্গে তুলনা করা হয়। এর ফলে এটি মুসলমানদের জন্মগতভাবে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করার বিপজ্জনক ধারণাকে আরো উসকে দেয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের ছড়ানো ঘৃণা যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই একটি শত্রুতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে, যার ফল হিসেবে ঘটেছে একাধিক প্রাণঘাতী হামলা। ২০১৫ সালে নর্থ ক্যারোলিনার চ্যাপেল হিলে তিন মুসলিম কলেজ শিক্ষার্থী, দিয়া বারাকাত, ইউসর আবু সালহা ও রাজান আবু সালহা তাদের নিজ বাড়িতে ইসলামোফোবিক ঘৃণাজনিত হামলায় নিহত হন। ২০২৩ সালে ইলিনয়ের প্লেইনফিল্ডে ছয় বছর বয়সী ফিলিস্তিনি-আমেরিকান শিশু ওয়াদিয়া আল-ফাইয়ুমেকে হত্যা করা হয় এবং তার মা গুরুতর আহত হন। ২০২৫ সালে মিনিয়াপোলিসে দুটি মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এক ব্যক্তি গ্রেফতার হয়ে দোষ স্বীকার করে। এই ঘটনাগুলো কেবল রিপোর্ট হওয়া কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। প্রতি বছর আরো অসংখ্য মুসলিমবিরোধী হামলা, বৈষম্য ও হয়রানির ঘটনা রিপোর্টই হয় না বলে মনে করেন অধিকারকর্মীরা। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইসলামোফোবিক ঘটনা রিপোর্ট করার আহ্বান জানিয়ে বলছে, ঘৃণার বিরুদ্ধে নীরবতা নয়, বরং আইনি ও সামাজিক প্রতিরোধই পারে এই প্রবণতা ঠেকাতে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)