কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করেই দেশের পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন উত্তপ্ত পরিস্থিতি হচ্ছে খোদ নির্বাচন কমিশন (ইসি), প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রধান দল, জোটসহ অনেকেই এখন ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। গত ১৯ জানুয়ারি সোমবার পর্যন্ত ইসির প্রধান ফটকের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যারিকেড দিয়ে রাখলেও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নিয়ে শ্লোগান দিতে দেখা গিয়েছে। ছাত্রদলের দাবি তিনটি মূল ইস্যুকে কেন্দ্র করে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধান করতে হবে। এছাড়া, ইসির হঠকারী সিদ্ধান্ত ও বিশেষ রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এদিকে গত ১৮ জানুয়ারি রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল সাংবাদিকের জানান, দেশে এখন পর্যন্ত কত ভোটার স্থানান্তর হয়েছে সেই তথ্য নির্বাচন কমিশনের কাছে চেয়েছে বিএনপি। তিনি বলেছেন, একটি বিশেষ দলের ভোটাররা এলাকা পরিবর্তন করে ঢাকায় এসেছেন। মির্জা ফখরুল বলেন, ইসি অনেক ক্ষেত্রেই পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে বলে বিএনপি মনে করে। এসব বিষয়েও সিইসিকে জানানো হয়েছে। বিএনপি চায়, ইসি যেন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকায় রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কর্মকর্তা একটি দলের পক্ষে কিছু ন্যাক্কারজনক কাজ করছেন বলে অভিযোগ পেয়েছি। সে বিষয়গুলো সিইসিকে জানিয়েছি। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে তদন্তপূর্বক তাদের প্রত্যাহার করতে অনুরোধ জানিয়েছি।’
প্রধান উপদেষ্টার কাছে জামায়াত অভিযোগ
এদিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে গিয়ে রোববার-ই সন্ধ্যায় বিএনপি নেতারা যখন এমন অভিযোগ করেছেন, তখন জামায়াতের নেতারা নিয়েছেন ভিন্ন পন্থা। তারা খোদ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে জামায়াত অভিযোগ দিয়ে এসেছে একটি দলের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন কমিশন ও সরকারের বিরুদ্ধে আবারও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ দেয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বিস্তর অভিযোগ আনেন। দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং ঋণখেলাপির অভিযোগে প্রার্থিতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরপিও অনুসারে নিরপেক্ষভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি। একটি দলের প্রধানকে সরকার অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও অভিযোগ দলটির। এদিকে নায়েবে আমির ডা. তাহের বলেছেন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, আনসারসহ কাউকেই ভোটকক্ষের ভেতরে প্রবেশ অনুমতি না দিতে জামায়াত সুপারিশ করেছে। এতে প্রধান উপদেষ্টা সম্মতি দিয়েছেন বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান। এছাড়া তারেক রহমানের নিরাপত্তার প্রসঙ্গেও ডা. তাহের বলেন, একটি দলের প্রধানের নিরাপত্তা প্রটোকল নিয়ে সরকার বাড়াবাড়ি করছে। কারও নিরাপত্তা বা প্রটোকল নিয়ে জামায়াতের আপত্তি নেই। তবে একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় একে পক্ষপাতমূলক আচরণ হিসেবে ধরা হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়বে। এদিকে পোস্টাল ব্যালট পরিবর্তন ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার দাবিতে গত ১৮ জানুয়ারি রোববার যে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে ছাত্রদল। এই বিষয়টি নিয়ে-ও কথা বলেন জামায়াত নেতারা। যমুনায় বৈঠকের পর ছাত্রদলের ঘেরাও কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আবদুল্লাহ তাহের। তিনি বলেন, প্রার্থিতার আপিলের সময়ে একটি দলের পক্ষ থেকে ঘেরাওয়ের নামে চাপ তৈরি করা হয় ইসির ওপর। তাদের দলীয় প্রার্থীদের যারা ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিক, তাদের যাতে বৈধতা দেওয়া হয়।
সিইসি যা বললেন
তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন এ ধরনের পরিস্থিতির ব্যাখা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল শুনানিতে কোনো পক্ষপাত করিনি। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আমরা ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের বিষয়টিও ছেড়ে দিয়েছি। আমরা চাই, সবাই অংশগ্রহণে একটা সুন্দর নির্বাচন হোক।’ রোববার রাতে নির্বাচন ভবনে টানা নয়দিনের শুনানি শেষে তিনি এ কথা বলেন। সিইসি বলেন, ‘আপনারা হয়তো আমাদের সমালোচনা করতে পারে অনেকেই। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বিষয়টা আমরা কীভাবে ছেড়ে দিয়েছি, আপনারা দেখেছেন। বিকজ উই ওয়ান্ট দ্য ইলেকশন টু বি পার্টিসিপেটেড। আমরা চাই যে, সবাই অংশগ্রহণে একটা সুন্দর নির্বাচন হোক। আপনারা সহযোগিতা না করলে কিন্তু হবে না।’
আসিফ মাহমুদ বক্তব্যও ইঙ্গিতপূর্ণ
এদিকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ এনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা অংশ নেব কিনা, এখন সেটি বিবেচনা করার সময় এসেছে।’ আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘এই নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমরা বিশ্বাস রাখতে পারছি না। এই নির্বাচনে আমরা অংশ নেব কিনা তা আমরা এখনো বিবেচনা করতে পারছি না।’ এর পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলনে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের (বিএনপি) প্রতি নির্বাচন কমিশনের ‘বিশেষ আচরণের’ অভিযোগ করেন আসিফ মাহমুদ। অন্যদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে দায় প্রধান উপদেষ্টার ওপরও আসবে বলে বলা জায় হুঁশিয়ারই করে দিয়েছেন জুলাই বিপ্লবীদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষ করে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা জানান, আরও ইঙ্গিতপূর্ণ। নাহিদ ইসলাম জানান তারা বলে এসছেন, নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করা যাবে না। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করতে চাইলে তা ভেস্তে যাবে। এবারের ভোট ২০০৮ সালের মতো না, ১৯৯১ সালের মতো।
যড়যন্ত্র টের পেয়ে বিএনপি মত পাল্টালো
এদিকে আশঙ্কা আর সন্দেহের পুরো বাতাস যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ভেসে বেড়াচ্ছে তখন খোদ সে-ই বিএনপি আবার কিছুটা মত পাল্টিয়েছে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে । জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করছে বলে মন্তব্য্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম। ১৯ জানুয়ারি সোমবার সকালে শেরে বাংলা নগরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে পুস্পমাল্য অর্পনের পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব এই মন্তব্য করেন। এদিকে নাটকীয়ভাবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে দাবি পূরণের আশ্বাস পাওয়ায় কথা বলে ঘেরাও কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। তিন দফা দাবিতে গত রোববার থেকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সামনে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে আসছিল সংগঠনটি। গতকাল সোমবার বিকেলে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজের সঙ্গে বৈঠক শেষে কর্মসূচি স্থগিতের সিদ্ধান্তের কথা জানান ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। বৈঠকে রাকিবের নেতৃত্বে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাসিরসহ একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেয়।
কারো কারো মতে, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের বিরুদ্ধে আবারও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হাজির হওয়াকে বিএনপি অন্যভাবে নিয়েছে। এর পাশাপাশি ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা অংশ নেব কিনা, এখন সে-টি বিবেচনা করার সময় এসেছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে এনসিপির মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বক্তব্য বিএনপি বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছে বলা চলে। একারণে সোমবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীতমূখী হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কারো কারো ধারণা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদৌও হবে কি-না আর হলেও তা সুষ্ঠু নিরপেক্ষ হবে কি-না সে সন্দেহ সর্বত্র বিরাজ করছে। আর ঠিক সেসময়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের বিরুদ্ধে আবারও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হাজির হওয়া বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ রহস্যজনকও বটে। পাশাপাশি একিই সময়ে এনসিপির মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার মন্তব্যও সামনের দিনগুলির ভবিষ্যত রহস্যময় করে তুলছে অনেককে। কারো কারো আশঙ্কা বর্তমানে ইসির ভূমিকা নিয়ে উভয়-ই না-হোক যে কোনো একটি পক্ষ ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করে পুরো নির্বাচনকে অন্য দিকে ধাবিত করতে পারে। ইতোমধ্যে নির্বাচনী মাঠে সংর্ঘষ বাড়ছে মুখোমুখি পর্যায়ে চলে যাচ্ছে বিএনপি,জামায়াত। তা-ই সুষ্ঠু নিরপেক্ষ লেভেল প্লেয়িং ইস্যুতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দল বা জোট দলবদ্ধ হয়ে আসলে কোন দিকে যায় তা দেখতে খেলা জমে উঠলে টের পাওয়া যাবে। ইসলামী আন্দোলনকে সরিয়ে দিয়ে এনসিপি-এবি পার্টির মতো সমমনাদের জোট কোন দিকে পরিচালিত হয় সামনের দিনগুলিতে তা দেখার অপেক্ষায় অনেকে।