এক বছরে পাঁচ লাখের বেশি অভিবাসী প্রত্যাবাসন


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 21-01-2026

এক বছরে পাঁচ লাখের বেশি অভিবাসী প্রত্যাবাসন

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসন কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন ও বৃদ্ধি দেখা গেছে। ফেডারেল তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তর থেকে গ্রেফতার হওয়া আনুমানিক ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে নির্বাসিত করা হয়েছে। এ সংখ্যা সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পুরো চার বছরের মেয়াদে অভ্যন্তরীণ গ্রেফতার থেকে হওয়া মোট নির্বাসনের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে আটক আরো প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে দেশছাড়া করা হয়েছে। এছাড়া প্রশাসনের নতুন স্বেচ্ছা নির্বাসন কর্মসূচি ও সিবিপি হোম অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ স্বেচ্ছায় নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান মেয়াদে মোট নির্বাসন ও প্রত্যাবাসনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৫ লাখ ৪০ হাজারে।

সীমান্তে অনুপ্রবেশ রেকর্ড পরিমাণ কমে আসায় আগের বছরের তুলনায় সীমান্ত থেকে নির্বাসনের সংখ্যা কমেছে। তুলনামূলকভাবে বাইডেন প্রশাসনের শেষ দুই বছরে, যখন সীমান্তে আগমন সর্বোচ্চ ছিল, তখন ২০২৩ সালে মোট ৫ লাখ ৯০ হাজার এবং ২০২৪ সালে ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে নির্বাসিত বা প্রত্যাবাসন করা হয়। বর্তমান সময়ে কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) সরাসরি ১ লাখ ২০ হাজার মানুষকে সীমান্তে আটক বা প্রবেশে বাধা দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে, আর ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) সীমান্তে গ্রেফতার হওয়ার পর আরো প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে নির্বাসন দিয়েছে। এই সীমান্ত-সংক্রান্ত নির্বাসনের প্রায় ১৪ শতাংশ মানুষ ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার আগেই আটক অবস্থায় ছিলেন।

নির্বাসনের সংজ্ঞা ও হিসাব নিয়েও প্রতিবেদনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আইস এবং সিবিপি, উভয় সংস্থাই নির্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করে। কখনো কাউকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দিয়ে সরাসরি ফিরিয়ে দেওয়া হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে রিপ্যাট্রিয়েশন হিসেবে গণ্য হয়, নির্বাসন নয়। প্রতিবেদনের হিসাবে আইসিই কর্তৃক অভ্যন্তরে গ্রেফতার হয়ে নির্বাসিত ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ ছাড়াও, আইসিই ও সিবিপি মিলে অন্যান্য নির্বাসন ও প্রত্যাবাসনের মধ্যে রয়েছে। সীমান্তে সিবিপির হাতে আটক হয়ে ফেরত যাওয়া প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার, সীমান্তে গ্রেফতার হওয়ার পর আইসিই কর্তৃক নির্বাসিত প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার, জাহাজের ক্রু সদস্যসহ অন্যান্য প্রত্যাবাসন প্রায় ৭০ হাজার এবং অভ্যন্তর থেকে আইসিই কর্তৃক নির্বাসিত আরো প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ ডিসেম্বর মাসে দাবি করেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে মোট ৬ লাখ ২২ হাজারের বেশি মানুষকে নির্বাসিত করা হয়েছে, যদিও এই সংখ্যার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

ট্রাম্প প্রশাসনের সময় অভিবাসন আইন প্রয়োগ আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান ও বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। আইসের দৈনিক গ্রেফতারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে অ্যাট লার্জ গ্রেফতার, অর্থাৎ জেল বা কারাগার ছাড়া সরাসরি কমিউনিটি, আদালত, বাড়ি ও কর্মস্থল থেকে আটক। এসব গ্রেফতার চার গুণ বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছে এবং ৩২টি স্টেট ও ওয়াশিংটন ডিসিতে এগুলো মোট গ্রেফতারের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে পরিণত হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্ক ও ইলিনয়ের মতো স্টেটে এই হার সবচেয়ে বেশি, যেখানে স্থানীয় আইন আইসের সঙ্গে জেলখানাভিত্তিক সহযোগিতা সীমিত করেছে।

কারা বেশি নির্বাসিত হচ্ছেন, সে ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। সহিংস অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের নির্বাসনের মাসিক হার ২০২৪ সালে বাইডেন প্রশাসনের সময় যেখানে ছিল প্রায় ৭৯০ জন, ট্রাম্প প্রশাসনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০ জনে। অন্যান্য অপরাধে দণ্ডিতদের ক্ষেত্রে এই হার ২ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৯০০ জনে পৌঁছেছে। যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন, তাদের নির্বাসনের হার ৭৫০ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৭০০ জনে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি দেখা গেছে অপরাধের কোনো রেকর্ড নেই-এমন অভিবাসীদের মধ্যে এ শ্রেণিতে মাসিক নির্বাসনের হার ২৮০ থেকে বেড়ে প্রায় ২ হাজার ১০০ জনে পৌঁছেছে। সম্ভাব্য ড্রিমারদের নির্বাসন ১৭০ থেকে বেড়ে ৪৭০ জনে উন্নীত হয়েছে এবং শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১০ থেকে বেড়ে প্রায় ৬০ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে-ভেনেজুয়েলা থেকে নির্বাসন বেড়ে ৭০ থেকে ৯২০ জনে, নিকারাগুয়া থেকে ৩৪০ থেকে ৫৬০ জনে, ভারত থেকে ৬০ থেকে ২৫০ জনে এবং তুরস্ক থেকে ৩০ থেকে ১৩০ জনে পৌঁছেছে। তবে কলম্বিয়া, হন্ডুরাস ও গুয়াতেমালার মতো মধ্য আমেরিকার কয়েকটি দেশে নির্বাসনের হার তুলনামূলকভাবে কমেছে।

এই অভিযানের পেছনে একটি বড় কারণ হলো বাইডেন প্রশাসনের সময় দেওয়া বিভিন্ন অস্থায়ী বৈধ মর্যাদা ট্রাম্প প্রশাসনের মাধ্যমে বাতিল করা, যার ফলে লাখ লাখ মানুষকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে বলা হয়েছে। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অনিবন্ধিত অভিবাসীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদিও পরিমাণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নীতির কারণে ২৫ লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়েছেন। তবে কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরে অনিবন্ধিত অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার কমলেও ২০২৫ সালে মোট বিদেশি বংশোদ্ভূত জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ বেড়েছে। অন্য একটি গবেষণায় ২০২৫ সালে মোট বিদেশি জনসংখ্যা ১০ হাজার থেকে ২ লাখ ৯৫ হাজারের মধ্যে কমতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাসন অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিতর্ক এখনো চলমান।

ফেব্রুয়ারি থেকে স্যাংকচুয়ারি সিটির ফেডারেল তহবিল বন্ধের হুঁশিয়ারি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ফেব্রুয়ারি ১ থেকে স্যাংকচুয়ারি সিটি থাকা সকল স্টেটকে ফেডারেল তহবিল প্রদান বন্ধ করা হবে। ট্রাম্প এই শহরগুলোকে অপরাধের আশ্রয়কেন্দ্র আখ্যা দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া ও ইলিনয়সের মতো ডেমোক্র‍্যাট নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক শক্তিধর স্টেটগুলো।

ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ফেডারেল সরকার আর কোনো অর্থ প্রদান করবে না তাদের যারা স্যাংকচুয়ারি সিটির মাধ্যমে অপরাধ ও সহিংসতা জন্ম দেয়। তিনি বলেছিলেন, এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হবে। ডেট্রয়টে একটি বক্তৃতায় তিনি আরো যোগ করেন, আমরা কোনো অর্থ প্রদান করব না যাদের রাজ্য বা শহর স্যাংকচুয়ারি নীতি সমর্থন করে।

নিউইয়র্কের গভর্নর কাথি হোচুল ট্রাম্পকে কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, আপনি যদি নিউইয়র্ক স্টেট-এর অর্থে হাত দেন, আমরা আপনাকে আদালতে দেখাবো। নিউইয়র্ক সিটি মেয়র এমাদানি বলেছেন, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কিন্তু এখনো কোনো উত্তর পাননি। মেয়র বলেন, আমরা অভিবাসীদের রক্ষা করার নীতি থেকে পিছপা হব না এবং নাগরিকদের জানাতে প্রতিটি সুযোগ নেবো। নিউইয়র্কের সিটি কাউন্সিল স্পিকার জুলি মেনিন টুইট করেছেন, আমরা আমাদের সম্পদ, স্যাংকচুয়ারি সিটি স্থিতি এবং অভিবাসী সম্প্রদায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দৃঢ় থাকবো।

ট্রাম্পের হুমকি মিনেসোটাকেও লক্ষ করতে পারে, যেখানে শত শত ফেডারেল কর্মকর্তা অভিবাসীদের ওপর ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছেন। এর মধ্যে সাম্প্রতিক এক ঘটনায় মিনিয়াপোলিসে অবিবেচিত মোটরিস্ট রেনি নিকোল গুডকে আইস এজেন্ট গুলি করে হত্যা করে। ট্রাম্পের পদক্ষেপের ফলে আদালতে চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনা রয়েছে। আগের দুইবার ট্রাম্পের স্যাংকচুয়ারি সিটি সংক্রান্ত তহবিল কাটার প্রচেষ্টা আদালতে বাতিল হয়েছে। ২০২৫ সালে জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এমন তিন ডজন স্টেট, শহর ও কাউন্টিকে স্যাংকচুয়ারি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

নিউইয়র্কের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ফিসক্যাল ইয়ার জুড়ে স্টেটটি ফেডারেল কর থেকে ৩২০ বিলিয়ন ডলার জমা দিয়েছে এবং ৩৩৭ বিলিয়ন ডলার ফেরত পেয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া এবং অন্যান্য ডেমোক্রে‍টিক নেতৃত্বাধীন স্টেট গুলিও ফেডারেলের বড় নেট অবদানকারীর মধ্যে রয়েছে। ট্রাম্পের নতুন হুমকি ফেডারেল তহবিল ও স্যাংকচুয়ারি সিটি নীতিকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)