“২০২৫ সালে বাংলাদেশের নগর এলাকার পরিকল্পনা, উন্নয়ন, পরিবেশ ও ন্যায্যতা : নাগরিকদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি” আইপিডির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিশ্লেষণী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পনা, ইমারত নির্মাণ, নগরায়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা তৈরি করেছে। কিন্তু নগর এলাকায় নাগরিকদের সমস্যা সমাধানে তেমন কোন কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। মাঠ-পার্কের দখলদারিত্ব আগের মতোর রয়ে গেছে।
গণঅভ্যুত্থান এর পর আমাদের নগর এলাকাগুলোকে বাসযোগ্য, ন্যায্য ও টেকসই করবার ব্যাপারে রাষ্ট্র ও সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, এটা নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিল। সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা ও পৌর এলাকার নগর উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও পরিবেশের ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যবসায়ীদের চাপে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপের পরিবর্তন করেছে। নদী-খাল, জলাশয়-জলাভূমি দখলকারী কিংবা নগর এলাকায় বিপদজনক শিল্প-কারখানার মাধ্যমে বায়ু দূষণকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। শহরের যানজট-জলজট-শব্দ দূষণ দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। স্থানীয় পর্যায়ে ওয়ার্ড কাউন্সিল ছিল না। এলাকার সমস্যা সমাধানে সরকার পাড়া-মহল্লার মানুষ কিংবা কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। বিশেষত নগরে নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক এলাকায় বসবাসরত মানুষের দু:খ-দূর্দশা আরও বেড়েছে। তথাপি বিগত বছর ২০২৫ এ অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নগর নীতি এবং স্থানিক পরিকল্পনা অধ্যাদেশ অনুমোদন দিয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে নগর এলাকার ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। আগামী নির্বাচিত সরকারকে বড় প্রকল্পে মনোযোগ না দিয়ে নগর এলাকার সমস্যা সমাধানে কার্যকর পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অদ্য ১৬ জানুয়ারি শুক্রবার, ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) কর্তৃক অনলাইনে আয়োজিত পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিশ্লেষণী অনুষ্ঠানে বক্তারা উপরোক্ত মতামত ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বিগত বছর অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পনা, ইমারত নির্মাণ, নগরায়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা তৈরি করেছে। কিন্তু নগর এলাকায় নাগরিকদের সমস্যা সমাধানে তেমন কোন কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। মাঠ-পার্কের দখলদারিত্ব আগের মতোর রয়ে গেছে। নগর এলাকায় অনেক মাঠেই জনগণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত। ময়মনসিংহ, বরিশাল, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে, যা আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা বাড়াবে। বিপরীতে নগর সরকার গঠন এর ব্যাপারে নীরব থেকেছে। পান্থকুঞ্জ পার্ক ধ্বংস করে ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক বাতিলে নাগরিক আন্দোলনে কর্ণপাত করেনি। অথচ গণপরিবহনভিত্তিক গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্প বাতিল করেছে। বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশ প্রণয়ন করলেও খাল দখল, বেআইনি ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত অপরাধে মাত্র দুই বছরের জেলদন্ডের বিধান রেখেছে, যাতে আগের আইনে শাস্তি আরও বেশি ছিল। দূর্বল শাস্তির বিধান অপারাধ দমন করতে ব্যর্থ হবে।
আইপিডির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, নাগরিক আন্দোলনের ব্যাপারে সরকার ছিল নির্লিপ্ত।নগর ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। নগর ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ এর ঘাটতি ছিল। নগর সংস্থাসমূহের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারেনি। নগর এলাকায় রাজনৈতিক দূর্বৃত্তপরায়ণতার ব্যাপারে সরকার ছিল উদাসীন।
অনুষ্ঠানে আইপিডির পরিচালক ও বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এর সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও আমরা সামগ্রিকভাবে দেশের জাতীয় পর্যায়ের স্থানিক্নপরিকল্পনা প্রস্তুত করতে পারিনি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাবে যা তৈরি হয়েছে, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে প্রয়োজনীয় অগ্রগতি নেই। ফলে সারা দেশে একটিও পরিকল্পিত শহর দেশে নেই। বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সহ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে যারা আছেন, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমলা বা প্রশাসক। পরিকল্পনাবিদসহ পেশাজীবিদের অন্তর্ভুক্ত করা অতীব জরুরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়র নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, অন্তর্বতীকালীন সরকার থেকে পরিকল্পনা বিষয়ক প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় একটি ফাঁক রয়ে গিয়েছে। ড্যাপের সংশোধনের জন্য ঢাকা শহরে জনঘনত্ব বেড়ে যাবে, তাতে শহর আরও স্থবির হয়ে পড়বে। রাজউক উন্নয়ন নিয়ন্ত্রন এর কাজ থেকে সরে গিয়ে আবাসন বাণিজ্যে লিপ্ত আছে।
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর শিক্ষক এবং আইপিডি রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল আকাশ বলেন, আমাদের নগর বিষয়ক সমস্যাগুলো ভুল নীতিকৌশলের কারণে সৃষ্ট। পরিবেশ আইনভঙ্গকারী ব্যক্তিরা সহজেই অল্প ক্ষতিপূরণে দায়মুক্তি পায়। ফলে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীরা পরিবেশ সংক্রান্ত আইনের কোন তোয়াক্কা করেন না।।
আইপিডি সদস্য প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ সজীব বলেন, রাজউকসহ রাষ্ট্রের নগর সংস্থাগুলো বিএনবিসি কোড এর এনফোর্সমেন্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। নাগরিক জীবনের ঝুঁকি কমাতে পরিকল্পনা ও ভবন নির্মাণ সংশ্লিষ্ট আইনের বাস্তবায়নে সরকার সফল হতে পারেনি।
পরিকল্পনাবিদ সাজিদ ইকবাল বলেন, ঢাকাভিত্তিক সরকার দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। আইনি কাঠামো, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন না থাকলে কোনো পরিকল্পনা কার্যকর হবে না। বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা করা সম্ভব হয়নি।
আইপিডির গবেষণা সহযোগী জিনিয়াস জান্নাত বলেন, বস্তিবাসী যারা আছেন, তাদের জীবন মান উন্নয়নে সেভাবে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এখনো দীর্ঘসূত্রতা রয়ে গিয়েছে। আইপিডির গবেষণা সহযোগী কাজী তাসনিয়া তাবাসসুম বলেন, পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট বিদ্যমান আইন প্রয়োগে সরকারের সফলতা কম। যে সকল নগর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সমন্বয় বাড়াতে হবে।