ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের এক মন্তব্য ও তার প্রতিবাদে চীনের প্রতিক্রিয়া ঘিরে ক্ষাণিকটা চাপ অনুভব করছে বাংলাদেশ। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে শক্তিধর ও প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রকাশ্যে কথাবার্তা মোটেও প্রত্যাশা করার কথা না বাংলাদেশের। কারণ দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর একটি গনতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় ফিরে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। এছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ খুব শীগ্রই আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে সামরিক ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের জন্য চীনের সঙ্গে জি-টু-জি (সরকার থেকে সরকার) চুক্তি সই করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ সেক্টরে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী দেশসমূহের চেয়ে ঢের পিছিয়ে থেকে প্রচন্ড চাপে। ফলে ওই অবস্থার উন্নতির জন্য বিগত সরকারও অনেক চেষ্টা সাধনা করলেও নানা কারনে সেটা কুলিয়ে উঠতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকার সেটাকে বেশ কিছুদূর এগিয়ে এনেছে।
একইভাবে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নেও বহু বছর ধরে দেন দরবারের পর চীনের সহযোগিতা নেয়ার বিষয়টিও চূড়ান্ত। এ ছাড়াও রয়েছে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ব্যাপার স্যাপার। বাংলাদেশ লাভ ও সামার্থের বিষয়টা চিন্তা করেই এসবে এগুচ্ছে। কিন্ত এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য নিয়োগ পেয়ে ঢাকায় আসা ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন সরাসরি কিছু না বললেও তার কিছু কথাবার্তা কিছুটা চাপ মনে অনুভব করতে শুরু করেছে ঢাকা।
কী বলেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত
গত অক্টোবরে মার্কিন সিনেটে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের শুনানিতে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন চীনের সঙ্গে যুক্ততায় ঝুঁকির বিষয়টি বাংলাদেশের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরবেন বলে জানিয়েছিলেন। ঢাকায় নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগ দেওয়ার পর প্রথমবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সে কথা আবার স্মরণ করিয়ে দিলেন তিনি। ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে যুক্ততায় ঝুঁকির যে বিষয়টি রয়েছে, তা তিনি স্পষ্টভাবে অন্তর্বর্তী সরকার বা নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে তুলে ধরবেন।
গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর ইএমকে সেন্টারে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্কের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন ক্রিস্টেনসেন। এরই এক পর্যায়ে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন। গত বছরের অক্টোবরে মার্কিন সিনেটের শুনানিতে ক্রিস্টেনসেন দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছিলেন। বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
আজকের মতবিনিময় সভায় ঢাকাকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে না ফেলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো আমার জন্য বিশেষ আগ্রহের ক্ষেত্র। এই দায়িত্ব পালনের আগে ওয়াশিংটনে আমি এ বিষয়ে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছি এবং বাংলাদেশেও আমার এ নিয়ে কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে শক্তিশালী সামরিক সহযোগিতা রয়েছে। ক্রমে তা আরও জোরদার হচ্ছে।’
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন জানান, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সব শাখার সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্ব রয়েছে। নৌবাহিনীর সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিষয়ে, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও মহড়ার মাধ্যমে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সঙ্গে অপারেশনাল প্রস্তুতি ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ গত এক বছরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মহড়া পরিচালনা করেছে বলে উল্লেখ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। নৌবাহিনীর সঙ্গে অপারেশনাল প্রস্তুতির জন্য ‘টাইগার শার্ক’, সেনাবাহিনীর সঙ্গে শান্তিরক্ষা, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম ও চিকিৎসা সংক্রান্ত সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘টাইগার লাইটনিং’সহ আরও নানা ধরনের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার পেশাদার সামরিক শিক্ষায় সহায়তা দিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র।
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন পরিকল্পনা ও সক্ষমতা উন্নয়নে আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করছি, বিশেষ করে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তারা কীভাবে আরও বিস্তৃত ভূমিকা রাখতে পারে, পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চাহিদা পূরণে কীভাবে আরও কার্যকর হতে পারে, সে বিষয়ে। আমরা সামরিক সরঞ্জাম কেনার বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়েও সহায়তা করছি এবং কোনটি বাংলাদেশি বাহিনীর জন্য সবচেয়ে উপযোগী হতে পারে, তা খতিয়ে দেখছি।’
বাংলাদেশের বাজেট বাস্তবতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নতুন সক্ষমতা আত্মস্থ করার সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে জানান মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘শুনানিতে আমি যেমন বলেছিলাম, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশে আমি সব বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখব, সেটা অন্তর্বর্তী সরকার বা নতুন নির্বাচিত সরকার হোক। এখানে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে যুক্ততায় ঝুঁকির যে বিষয়টি রয়েছে, সেটা আমি স্পষ্টভাবে তুলে ধরব।’
অংশীদার দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতার চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নানা বিকল্প রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যেমন আছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে আমরা আমাদের মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর উপযোগী কোনো ব্যবস্থা চিহ্নিত করতে সহায়তা করি, যা বাংলাদেশি বাহিনীর প্রয়োজনের সঙ্গে আরও মানানসই বা তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যদি উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা না থাকে, সে ক্ষেত্রেও আমরা আমাদের মিত্রদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করে সেই চাহিদা পূরণে সহায়তা করি।’
শুনানিতে যা বলেছিলেন বেন
গত অক্টোবরের শেষের দিকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে শুনানীতে চীন এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজে কী ধরনের ‘ঝুঁকি’ রযেছে, তা বোঝাতে বাংলাদেশের সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করার কথা বলেছেন ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়ন পাওয়া ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন।
যুক্তরাষ্ট্রে সেনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটিতে অক্টোবরের ওই শুনানিতে এক প্রশ্নে এ কথা বলেন তিনি।
চীন কর্তৃক বাংলাদেশের সাবমেরিন ঘাঁটি ‘সংস্কার’ এবং ‘২০টি চীনা যুদ্ধবিমান কেনার’ প্রসঙ্গে টেনে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা প্রভাব নিয়ে আপনার উদ্বেগের সঙ্গে আমি একমত। এবং (রাষ্ট্রদূত হিসেবে) নিশ্চিত হলে, চীনের কার্যক্রম, তাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মেরিটাইম খাত এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে জড়িত হওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আমি বাংলাদেশ সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হব। “একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, বিশেষ করে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর আরও নিবিড় অংশীদারত্বের ফলে যে সুযোগ ও সুফল মিলবে, তা তুলে ধরব।”
এর আগে লিখিত বক্তব্যে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, “বিশ্বের অষ্টম জনসংখ্যাবহুল দেশ হলেও বড় প্রতিবেশিদের ছায়ায় পড়ে থাকায় বাংলাদেশ যথাযথ মনোযোগ পায় না। ফরেন সার্ভিসের চাকরিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতি নিয়ে ২০ বছরের বেশি সময়ের কাজের অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে, যার মধ্যে এর আগে ঢাকায় কাজ করাও রয়েছে।
“ফলে আমি দেশটির গুরুত্ব এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের তাৎপর্য ভালোমতো বুঝি। কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ অবাধ, নিরাপধ ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হয়ে উঠেছে।”
বাংলাদেশ এখন ‘গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “২০২৪ সালের অগাস্টে ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিক্ষোভ ১৫ বছর শাসনকারী সরকারের পতন ঘটিয়েছে। নতুন সরকার এবং নতুন পথনির্দেশ পেতে আগামী বছরের শুরুতে ভোট দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জনগণ, যা হবে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নির্বাচন।
“উজ্জল ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের যাত্রায় বাংলাদেশকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্র। রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিশ্চিত হলে, আমি ঢাকায় দূতাবাসকর্মীদের নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কাজ করব।”
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, রাষ্ট্রদূত হলে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক উন্নতি, বাণিজ্য বাধা ও বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালীকরণে কাজ করবেন তিনি।
প্রতিবাদ করলো চীনা দূতাবাস
চীনের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে যুক্ততার ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের মন্তব্যকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ হিসেবে অভিহিত করেছে ঢাকায় চীন দূতাবাস। চীন দূতাবাসের মুখপাত্র বলেছেন, এসব মন্তব্যে ‘ভুল-শুদ্ধ’ গুলিয়ে ফেলা হয়েছে আর এর পেছনে স্পষ্টভাবেই ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ রয়েছে।
২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় ঢাকায় চীন দূতাবাসের মুখপাত্র এ মন্তব্য করেন। চীন দূতাবাসের মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের এ ধরনের মন্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এসব মন্তব্যে শুদ্ধ আর ভুল গুলিয়ে ফেলা হয়েছে এবং এর পেছনে সুস্পষ্ট অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর গত ৫০ বছরে চীন ও বাংলাদেশ সব সময় একে অপরকে সমর্থন করেছে, সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতায় যুক্ত হয়েছে। চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা দুই দেশের জনগণের জন্য বাস্তব সুফল বয়ে এনেছে এবং ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে। এই সহযোগিতা আঞ্চলিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য সহায়ক।
চীনের মুখপাত্র আরও বলেন, ‘চীন ও বাংলাদেশের সহযোগিতা দুই দেশ ও তাদের জনগণের বিষয়। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কিংবা আঙুল তোলার কোনো সুযোগ নেই। আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাই এবং বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সহযোগিতার পক্ষে সহায়ক এমন কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দেওয়ার তাগিদ দিতে চাই।’
চাপের কৌশল?
এদিকে ঢাকায় সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের একটা চাপের কৌশল হিসেবে দেখছেন অনেকে। এ বিষয়ে বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, তা নিন্মে তুলে দেয়া গেল- যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত যা বলেছেন তা খুব একটা নতুন বিষয় নয়। সেখানে কোনো কঠিনভাবে বার্তা দেয়ার মতো ভাষাও ছিল না। তবে এর স্পষ্ট কৌশলগত বার্তা রয়েছে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে,
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের তুলনায় সে হিসেবে চীনের প্রতিক্রিয়া বেশ কঠিন ছিল বলা যায়। “আমরা তো জানিই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন পরস্পরকে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনে করে” এবং সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবস্থান থেকে তারা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছে, বলছেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির।
এক্ষেত্রে যে দেশের সাথে যেভাবে প্রয়োজন তেমনভাবে ভারসাম্য রেখেই বাংলাদেশের অবস্থান তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তবে বাংলাদেশ কোনো চাপে পড়তে পারে কিনা- সে প্রশ্নে হুমায়ুন কবির বলেন, “খানিকটা চাপ তো পড়তেই পারে। এবং সেজায়গায়ই তো আমার কূটনীতির প্রয়োজনটা, তাদের অবস্থানগুলো বুঝার কাজটা”। সেটা যথার্থ পেশাদারিত্বের সাথে করতে পারলে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে যার সাথে কাজ করা প্রয়োজন সেটা করা সম্ভব।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত যেভাবে বলেছেন, সেটিকে ভালোভাবে দেখছেন না চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ।
“অন্য আরেকটা দেশকে তো টেনে আনার এভাবে কোনো দরকার নেই। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক, সহযোগিতা বাড়ানো, এগুলোর কথা বলতে পারে। কিন্তু অন্য দেশের সাথে সম্পর্কতে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হতে পারে বা বাংলাদেশকে সতর্ক করা। এগুলো তাদের অত্যন্ত হঠকারি এবং অর্বাচিন এক ধরনের আচরণ” বলছেন তিনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা, ট্যারিফ, গ্রিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করে মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলছেন এসবে পুরো বিশ্ব ও আমেরিকার মানুষও এতে ক্ষতির মুখে পড়ছে। “ওরা বললো এই কথা আর বাংলাদেশ আর চীনের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেল, এটা মনে করার কোনো কারণ নাই”।
চীনের প্রতিক্রিয়াকেও মি. আহমদ যথার্থ হিসেবে দেখছেন যেহেতু তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বলেছেন।
আবার বাংলাদেশে যেখানে সামনে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সেদিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা নির্বাচিত সরকারের জন্যও হতে পারে বলে ধারণা করছেন এ এস এম আলী আশরাফ। “এটা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে সে দলগুলোর জন্য এবং যারা সম্ভাব্য ক্ষমতায় আসবে তাদের জন্য একটা বার্তা যে ক্ষমতায় আসার পরে তারা কি চীনের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চালিয়ে যাবে, নাকি মার্কিন চাপের কারণে কিছুটা পুনর্মুল্যায়ন করবে” বলছেন তিনি।
অবশ্য এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নতুন কিছু নয় বলে মনে করছেন সব বিশ্লেষকই। তারা বলছেন, এটি আগে থেকেই চলে আসা বৈরিতার একটি অবস্থান। আর চীনের সাথে যত ধরনের নির্ভরশীলতার জায়গা রয়েছে, তা থেকে সরে যাওয়ারও সুযোগ নেই।
বরং এখন যেভাবে ভারসাম্য রাখতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনাকাটা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেভাবেই ভারসাম্য বজায় রাখা চলবে বলে মনে করেন অনেকে। তবে যদি মি. ট্রাম্প চীনের সাথে সংযোগে নতুন কোনো ট্যারিফের হুমকি আরোপ করেন, সেটা গোটা বিশ্বের সাথে বাংলাদেশেও ধাক্কা তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বৈরিতা যেমনটা দেখা গেল সেভাবে অন্তত আগামী তিন বছর চলতে থাকবে বলে মনে করেন মুন্সী ফয়েজ আহমদ। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে যেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার মেয়াদের পরে একই পরিস্থিতি থাকবে বলে ধারণা করেন তিনি।
এছাড়া যেসব বক্তব্য এসেছে দুই দিক থেকে তার প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে বলেও তিনি মনে করেন না। তবে বাংলাদেশকে সব দিকে ভারসাম্য রক্ষা করতে কূটনৈতিক পর্যায়ে যথেষ্ট বিচক্ষণতা দেখাতে হবে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।