টোকিওর রোবোট রেস্টুরেন্টে ডিনার


হাবিব রহমান , আপডেট করা হয়েছে : 28-01-2026

টোকিওর রোবোট রেস্টুরেন্টে ডিনার

টোকিওতে যেদিন প্রথম আসি সেদিনই এভিয়েটর নামে একটি রোবট রেস্টুরেন্টে চা খেতে গিয়েছিলাম। একাই। তখনো আমার গাইড নিকিতার সঙ্গে পরিচয় হয়নি। অর্ডার নিয়েছিল একটি রোবট, চা নাস্তা পরিবেশনও করেছিল অন‍্য একটি রোবোট। আর টেবিলে থাকা ছোট্ট একটি রোরোট সারাক্ষণ আমার সঙ্গে গল্পে মেতেছিল। সময় গড়িয়েছে। নিকিতার সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়েছে। ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। আমি যা আবদার করি তা তার সাধ‍্যমত পালনে চেষ্টা করে। তাই আজ আমি তাকে বললাম-আজ তোমাকে সঙ্গে নিয়ে এমন একটা রোবট রেস্টুরেন্টে ডিনার করতে চাই যেখানে রোবট নিজেই রান্না করে।

নিকিতা হাসলো-বললো তাই হবে। এক সন্ধ্যায়, হানেদা ইনোভেশন সিটির আধুনিক স্থাপনার ভেতরে ঢুকে পড়লাম আমি আর নিকিতা। গন্তব্য-AI SCAPE, টোকিওর ব্যতিক্রমী রোবট-থিমড ডাইনিং স্পেস। ভেতরে ঢুকেই যেন অন্য এক জগত। নরম নীল আর সাদা আলোয় ভেসে আছে পুরো ঘর। দেওয়ালের একপাশে স্বচ্ছ কাচের আড়ালে রোবটিক বাহুগুলো নিখুঁত ছন্দে নড়ছে-কোথাও তাড়াহুড়ো নেই, কোথাও ভুল নেই। মেঝেতে মানুষের পায়ের শব্দ চাপা পড়ে যায় হালকা ইলেকট্রনিক মিউজিকে। টেবিলগুলো পরিপাটি করে গুছানো। আমাদের সামনে থাকা স্ক্রিনেই মেনু-একটা টাচে অর্ডার, আর পেছনে কাজে নেমে পড়ে রোবট শেফ।

নিকিতা তার জন‍্য অর্ডার দিলো রোবট-প্রস্তুত গ্রিলড ওয়াগিউ বিফ রোল, আমার জন‍্য ভেজিটেবল রোল। ফিউশন সুশি প্ল্যাটার (ইউজু সস সহ), সিজনাল জাপানিজ সালাদ। তার জন‍্য এককাপ উষ্ণ সাকে আর আমার জন‍্য কফি। অর্ডার দেওয়ার পর নিকিতা বললো-দেখো, এখানে অপেক্ষাটাও সুন্দর। কেউ তাড়া দিচ্ছে না। আমি বললাম-ভালো সঙ্গ থাকলে অপেক্ষা কখনো বিরক্তিকর হয় না। সে কিছু বলল না, হাসলো।

ছোট্ট সার্ভিস রোবট নিঃশব্দে আমাদের টেবিলের পাশে থামল। তার ধাতব শরীরে আলো পড়ে চিকচিক করছিল। একে একে খাবার নামিয়ে গেল নিখুঁত ভদ্রতায়। নিকিতা মুচকি হেসে বললো-ও কিন্তু আমাদের দিকে তাকাচ্ছে না, তবুও কত যত্ন। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, আমরা ছেলেরাও কিন্তু মেয়েদের কাছ থেকে এমন নিঃশব্দ যত্নই চাই। তবে চাইলেই সব সময় তা পাওয়া যায় না। নিকিতা আমার দিকে কটমট করে তাকায়। আমি অন‍্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকি। রোলে প্রথম কামড় দিয়েই বোঝা গেল-এটা শুধু প্রযুক্তির প্রদর্শনী নয়, সত্যিই ভালো রান্না।

নিকিতা হালকা হেসে বললো-দেখো রোবট রান্না করেছে, অথচ স্বাদটা একেবারে মানুষের হাতের রান্নার মতো। আমি বললাম-হয়তো মানুষের অভিজ্ঞতাই ওদের শেখানো হয়েছে। সে বলে এই AI SCAPE রেস্টুরেন্টে কোনো চটকদার শো প্রদর্শিত হয় না। এখানে নেই চিৎকার করা আলো বা অতিরঞ্জিত নাটকীয়তা। এখানে আছে, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ-শান্ত, পরিমিত পরিবেশ আর ভালো খাবার। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে রাতের বাতাসে দাঁড়িয়ে নিকিতা বললো-এই সন্ধ্যাটা আমি ভুলবো না।

আমি বললাম, কেন-ভালো খাবার বলে!

ও বললো-না, তুমি পাশে ছিলে বলে।

আমরা হাঁটতে থাকলাম হোটেলের দিকে। কিন্তু এই সন্ধ্যাটা রয়ে গেল-রোবট, আলো, খাবার আর নিকিতার নীরব হাসির মধ্যে বন্দি এক স্মৃতি হয়ে।

ইতিহাসে মোড়া ছোট্ট শহর উসুকি

বেপ্পুতে এসেছি আজ দুদিন। এখানে সকালটা শুরু হয় গরম পানির ধোঁয়ায়। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে থাকা বাষ্প, রাস্তার পাশে অনসেনের গন্ধ-সব মিলিয়ে শহরটা যেন সবসময় উষ্ণ এক নিঃশ্বাস ফেলে। এই শহরটা অন‍্য শহরের চেয়ে একটু আলাদা। এখানে সকাল আসে ঘড়ির অ্যালার্মে নয়, অনসেনের ধোঁয়ায়। পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা গরম পানির ভাপ, রাস্তার পাশে ছোট ছোট স্নানঘর-সব মিলিয়ে মনে হয় শহরটা সারাক্ষণই আরাম মোডে আছে। এখানে আসার পর প্রথম দিনে দূরে কোথাও যাইনি।এই শহরের আশপাশেই ঘুরে বেড়িয়েছি। আজ আমি আর নিকিতা-বেরোচ্ছি এক ভিন্ন যাত্রায়। গন্তব্য, ইতিহাসে মোড়া ছোট্ট শহর উসুকি।

প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে না জানার ভান করে গম্ভীর মুখ নিয়ে নিকিতাকে বললাম-আজ যেন আমরা কোথায় যাচ্ছি? ও জানে আমি দুষ্টুমি করছি। তারপরও একজন প্রফেশনাল গাইডের মত হেঁসে জবাব দেয়-এমন একটা শহরে, যেখানে পাথরও কথা বলে। বেপ্পু স্টেশন থেকে JR Nippo Main Line-এর ট্রেনে চেপে বসি। ট্রেন ধীরে ধীরে শহর ছাড়ে। জানালার পাশে বসে আমরা দু’জন। ট্রেন চলতে শুরু করতেই বেপ্পুর ধোঁয়ামাখা পাহাড় পেছনে সরে যায়। সামনে খুলে যায় সমুদ্রের ঝলক, নিঃশব্দ গ্রাম, সবুজ মাঠ।

আমার পাশে বসে নিকিতা ফিসফিস করে বলে-জানো, এই রকম ধীর যাত্রাগুলো আমার খুব ভালো লাগে। তাড়াহুড়ো নেই, গল্প করার সময় আছে। গ্রুপ ট্যুরে আমি এই মজাটুকু পাই না। ফর্মাল কথাবার্তা নিয়ে সময় কাটাতে হয়। শুধু ইতিহাসের কচকচানি আর ভালো লাগে না। একদিনের ভ্রমণে সবার সঙ্গে ভালো করে আলাপ পরিচয়ও হয় না। অথচ দ‍্যাখো একজন গাইড হয়েও তোমার সঙ্গে কেমন ব‍্যক্তিগত কথাবার্তাও চালিয়ে যাচ্ছি!

আমি হাসি। ট্রেনের জানালার বাইরে ভেসে ওঠে উপকূলরেখা, ছোট ছোট গ্রাম, ধানের ক্ষেত। প্রায় দেড় ঘণ্টার এই যাত্রা যেন আমাদের কথোপকথনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোয়। সময়টা কেটে যায় গল্প, হাসি আর চুপচাপ বসে থাকার আনন্দে। কখন যে উসুকি এসে যায়, টেরই পাই না। উসুকি পৌঁছেই প্রথম গন্তব্য Usuki Stone Buddhas। নিকিতা জানায়, পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা এই বুদ্ধমূর্তিগুলো তৈরি হয়েছিল ১২ থেকে ১৪ শতকে, হেইয়ান ও কামাকুরা যুগে।

জাপানে এই ধরনের শিলাখোদাই বুদ্ধমূর্তি খুবই বিরল। তাই এগুলোকে ঘোষণা করা হয়েছে National Treasure হিসেবে। মূর্তিগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে নিকিতা হঠাৎ চুপ করে যায়। কিছুক্ষণ পর বলে-এরা এত শতাব্দী ধরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে- অথচ আমরা মানুষ কত অল্প সময়েই সব ভুলে যাই। আমি উত্তর দিই না। শুধু বুঝতে পারি, ইতিহাসের ভার আর বর্তমানের অনুভূতি-দুটোই একই সঙ্গে আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে।

এরপর যাই Usuki Castle Ruins-এ। এডো যুগে নির্মিত এই দুর্গ একসময় স্থানীয় সামন্ত প্রভুদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। আজ সেখানে শুধু ধ্বংসাবশেষ, পাথরের দেওয়াল আর বাতাসে ভাসতে থাকা অতীতের গল্প। পাহাড়ের ওপর থেকে শহর আর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে নিকিতা বলে- এই জায়গাগুলো আমাকে শেখায়-সব শক্ত কিছুও একদিন স্মৃতিতে পরিণত হয়। আমি মৃদু হেসে বলি- কিছু স্মৃতি থাকে যেগুলো মানুষ আজীবন বয়ে বেড়ায়।

ও আমার দিকে তাকায়। তবে কিছু বলে না। Nioza Historical Street-এ হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল আমরা যেন অতীতের হাত ধরে হাঁটছি। অন্য এক শতকে ঢুকে পড়েছি। কাঠের পুরনো ঘর, সামুরাই যুগের স্থাপত্য, ছোট দোকান আর নিঃশব্দ রাস্তায় আমাদের পায়ের শব্দ। একটি ছোট ক্যাফেতে বসে গ্রিন টি খাই। নিকিতা কাপের ভাপের দিকে তাকিয়ে বলে-ভ্রমণে সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো হয় তখন, যখন কিছুই বলা লাগে না। আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। বলি সত্যিই, অনুভূতির চেয়ে বড় কোনো ভাষা হয় না। সন্ধ্যার ট্রেনে ফেরার সময় জানালার বাইরে আকাশ ধীরে ধীরে গাঢ় হয়। দিনের আলো নিভে আসে, ট্রেনের ভেতর আলো জ্বলে ওঠে।

বেপ্পুতে ফিরে আবার দেখা যায় অনসেনের ধোঁয়া, চেনা শহরের আলো। কিন্তু মনে থেকে যায় উসুকির পাথরে খোদাই করা বুদ্ধ, নীরব ইতিহাস আর দু’জন মানুষের না-বলা কথাগুলো।

ইউনোমিনে অনসেন

জাপানের ওয়াকায়ামা প্রিফেকচারের পাহাড়ঘেরা কিই উপদ্বীপে অবস্থিত ইউনোমিনে অনসেন (Yunomine Onsen)-একটি ছোট গ্রাম, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের কাছে পরিচিত শরীর ও আত্মা শুদ্ধ করার স্থান হিসেবে। আধুনিক পর্যটন অবকাঠামোর বাইরে অবস্থান করেও ইউনোমিনে আজ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি ঐতিহাসিক গন্তব্য। ইউনোমিনে অনসেন অবস্থিত কুমানো অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত পাহাড়ি এলাকায়। আমি আর নিকিতা কিয়োটো থেকে ওখানে যাচ্ছি ট্রেনে করে।জানালার বাইরে দৃশ্য ক্রমেই বদলাতে থাকে-নদী, বন, পাহাড়। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায়।

আমরা নামলাম শিংগু শহরে। স্থানীয় একটা ক‍্যাফেতে কফি খেয়ে বাস ধরলাম। বাসের পথটি কুমানো নদী ও বনভূমির মধ্য দিয়ে গেছে, যে পথ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তীর্থযাত্রীদের পদচিহ্ন বহন করে আসছে। নিকিতা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললো-এই পথ দিয়েই তো একসময় সম্রাটরাও হেঁটেছেন।

তার কথায় ইতিহাস যেন আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিংগু থেকে বাসে প্রায় এক ঘন্টার পাহাড়ি পথ ইউনোমিনে অনসেন। বাসের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিলো কুমানো নদীর ঢেউ, বাঁশবন আর কাঠের পুরোনো বাড়ি। নিকিতা জানায়, ইউনোমিনে অনসেনের ইতিহাস প্রায় ১৮০০ বছর পুরোনো। এটি ছিল কুমানো কোদো তীর্থপথের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাচীনকালে সম্রাট, অভিজাত শ্রেণি ও সাধারণ মানুষ-সকলেই কুমানো সানজান (কুমানো হংগু তাইশা, নাচি তাইশা ও হায়াতামা তাইশা) দর্শনের আগে এখানে স্নান করতেন। জাপানি ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কুমানো অঞ্চল ছিল পুনর্জন্ম ও আত্মিক শুদ্ধতার প্রতীক। ইউনোমিনে অনসেন সেই আচারগত শুদ্ধতার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই ঐতিহাসিক তীর্থপথ ও সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোকে একত্রে ‘Sacred Sites and Pilgrimage Routes in the Kii Mountain Range’ নামে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইউনোমিনে অনসেনের প্রধান আকর্ষণ Tsubo–U। একটি ছোট পাথরের স্নানঘর, যেখানে একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুইজন স্নান করতে পারেন। বৈশিষ্ট্য হলো-দিনের বিভিন্ন সময়ে পানির খনিজ উপাদানের পরিবর্তনের কারণে পানির রঙ হালকা নীল বা দুধ সাদা হয়ে ওঠে।

নিকিতা জানায়, Tsubo–U জাপানের একমাত্র অনসেন বাথ, যা সরাসরি World Heritage-স্বীকৃত। নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে পর্যটকদের এখানে স্নান করতে হয়, যাতে স্থাপনাটির ঐতিহাসিক চরিত্র সংরক্ষিত থাকে। ইউনোমিনে গ্রাম ছোট ও সুসংগঠিত। কাঠের তৈরি রিয়োকান, প্রাকৃতিক গরম পানির ধোঁয়া ওঠা নালা এবং নদীর ধার ঘেঁষা হাঁটার পথ-সব মিলিয়ে গ্রামটি একটি জীবন্ত ঐতিহ্যকেন্দ্র। আধুনিক বড় হোটেল বা বাণিজ্যিক স্থাপনা না থাকায় গ্রামের পরিবেশ ও নীরবতা বজায় রয়েছে। নিকিতা বলে, স্থানীয় বাসিন্দারা মূলত পর্যটন ও রিয়োকান পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। গ্রামটি রাত নামার পর আরো শান্ত হয়ে ওঠে, যা পর্যটকদের কাছে আলাদা অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইউনোমিনে গ্রামটি আকারে ছোট। কাঠের রিয়োকান, গরম পানির ধোঁয়া ওঠা পাইপ, নদীর পাশের হাঁটার পথ-সবকিছুতেই রয়েছে সংযত গ্রামীণ সৌন্দর্য্য। এখানে বড় কোনো আধুনিক স্থাপনা নেই, যা এই গ্রামের ঐতিহ্যগত চরিত্রকে অক্ষুণ্ন রেখেছে। রাত নামলে গ্রামটি আরো নিঃশব্দ হয়ে ওঠে। কৃত্রিম আলোর অভাবে আকাশের তারাগুলো স্পষ্ট দেখা যায়- যা শহুরে জীবনে বিরল। গ্রামের মানুষজন পর্যটকদের হাসিমুখে স্বাগত জানায়। এখানে রাত নামলে কোনো নীয়ন আলো নেই-শুধু তারা আর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে চারপাশটা ভারী হয়ে উঠে।

ইউনোমিনে অনসেন বর্তমানে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়- কুমানো কোদো তীর্থযাত্রীদের জন্য। জাপানের প্রাচীন অনসেন সংস্কৃতি জানতে আগ্রহীদের জন্য। প্রকৃতি ও ইতিহাসভিত্তিক টেকসই পর্যটনের অনুসারীদের জন্য। তবে অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ থেকে অঞ্চলটিকে রক্ষা করতে স্থানীয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত পর্যটন নীতির ওপর জোর দিচ্ছে। ইউনোমিনে অনসেন জাপানের এমন একটি পর্যটন গন্তব্য, যেখানে ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রাকৃতিক পরিবেশ একসঙ্গে সহাবস্থান করছে। আধুনিকতার চাপে যেখানে বহু ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ইউনোমিনে আজও নিজস্ব পরিচয় অটুট রেখেছে-একটি নীরব, কিন্তু গভীর অর্থবহ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা হিসেবে।

ইউনোমিনে অনসেন জাপানের সেইসব পর্যটন স্থানের একটি, যেখানে আধুনিকতা নয়-প্রাধান্য পেয়েছে ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান। যারা জাপানের পর্যটন মানচিত্রে ভিন্নধর্মী ও অর্থবহ কোনো গন্তব্য খুঁজছেন, ইউনোমিনে তাদের জন্য হতে পারে একটি উল্লেখযোগ্য নাম। ইউনোমিনে কোনো বিলাসবহুল পর্যটন শহর নয়। এখানে নেই শপিং মল, নেই ভিড়। আছে ইতিহাস, প্রকৃতি আর আত্মিক প্রশান্তি। যারা জাপানকে শুধু শহরের আলোতে নয়-তার শিকড়ে, বিশ্বাসে ও নীরবতায় দেখতে চান, তাদের জন্য ইউনোমিন হতে পারে এক অনন্য গন্তব্য।

ওসাকা থেকে কোয়া-সান

ওসাকার ব্যস্ত রাস্তাঘাট, চকচকে দোকান আর মানুষের ভিড়ের কোলাহল ধীরে ধীরে পেছনে ফেলে আমরা রেলস্টেশনে দাঁড়াই। গন্তব্য-কোয়াসান, জাপানের আধ্যাত্মিকতা ও প্রাচীন বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্র। সঙ্গী আমার ট্যুর গাইড নিকিতা। আমরা নানকাই লাইনের ট্রেনে উঠলাম, তখন শহরটা ধীরে ধীরে পিছনে পড়ে যাচ্ছিল। জানালার বাইরে উঁকি দিচ্ছিলো সবুজ পাহাড়, বাঁকানো নদী আর ছোট ছোট গ্রাম। প্রতিটি স্টেশন যেন নতুন এক চিত্রকর্মের ফ্রেম, যা চোখের সঙ্গে হৃদয়কেও স্পর্শ করে।

নানকাই রেলওয়ে ধরে ট্রেন ছুটে চলে দক্ষিণের পাহাড়ের দিকে। জানালার বাইরে কংক্রিটের শহর ধীরে ধীরে সবুজ বন, নদী আর ছোট গ্রামে রূপ নেয়। প্রতিটি স্টেশন যেন নতুন এক চিত্রকর্মের ফ্রেম, যা চোখের সঙ্গে হৃদয়কেও স্পর্শ করে। নানকাই নাম্বা স্টেশন থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার ট্রেনযাত্রা শেষে পৌঁছালাম গোকুরাকুবাশি। এখান থেকেই শুরু কোয়া-সানের আসল রোমাঞ্চ-খাড়া পাহাড় বেয়ে ওঠা ঐতিহাসিক কেবল কার। কেবল কার ওপরে উঠতেই নিচের পৃথিবীটা যেন ক্ষুদ্র হয়ে গেল। চারপাশে কুয়াশা, দেবদারু আর সাইপ্রেস গাছের সারি-মনে হলো কোনো প্রাচীন কাহিনীর ভেতর ঢুকে পড়েছি।

উপরে পৌঁছতে পৌঁছতে নিকিতা আঙুল দিয়ে জানালায় তাকায়, দেখো, পাহাড়ের ছায়া লেকের জলে কত সুন্দর প্রতিফলিত হচ্ছে। আমি তার পাশে এসে বলি, ‘তুমি সঙ্গে আছো বলে এই দৃশ্য আরো সুন্দর।

নিকিতা ফিসফিস করে বলল, এই পথ দিয়েই হাজার বছরের বেশি সময় ধরে সন্ন্যাসীরা হেঁটে উঠতেন। খ্রিস্টীয় ৮১৬ সালে জাপানের মহাসাধক কোবো দাইশি (কুকাই) এই পাহাড়কে বেছে নিয়েছিলেন ধ্যান ও সাধনার জন্য। এখান থেকেই শুরু হয় শিংগন বৌদ্ধধর্ম, যা আজও জীবন্ত। সে আরো জানায়, কোয়া-সান আসলে একক কোনো পাহাড় নয়-এটা একটি বিশাল ধর্মীয় এলাকা, যেখানে আছে ১১৭টিরও বেশি মন্দির। এই কারণেই ২০০৪ সালে জায়গাটি UNESCO World Heritage Site  হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

আমাদের প্রথম গন্তব্য কঙ্গোবু-জি, শিংগন বৌদ্ধধর্মের প্রধান মন্দির। ভিতরে ঢুকেই চোখে পড়ে জাপানের সবচেয়ে বড় পাথরের বাগান-বানরিউতেই (Banryutei)। সাদা নুড়ির ওপর কালো পাথরের ঢেউ-ড্রাগনের মতো বিস্তৃত। এরপর গেলাম দানজো গারান, যেখানে কোয়া-সানের প্রথম ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল। এখানকার লাল রঙের Konpon Daito Pagoda দূর থেকেই নজর কাড়ে। পাঁচতলা এই স্তূপটি বৌদ্ধ দর্শনের মহাবিশ্বের প্রতীক। নিকিতা বললো-এই জায়গাটাই কোয়া-সানের আত্মা। ভ্রমণের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়-ওকুনোইন কবরস্থান। প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ বনপথ, দু’পাশে দুই লক্ষের বেশি সমাধিফলক। বিশ্বাস করা হয়, কোবো দাইশি এখানে মারা যাননি-তিনি এখনো গভীর ধ্যানে আছেন। পাথরের লণ্ঠন জ্বলা পথে হাঁটতে হাঁটতে নিকিতা ধীরে বললো-এখানে মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় না, বরং তাকে সম্মান করে। সে আরো বলে, কোয়া-সানের বিশেষ আকর্ষণ শুকুবো-মন্দিরে রাত কাটানো। সাদামাটা ঘর, শান্ত পরিবেশ, ভিক্ষুদের প্রার্থনা, আর সকালবেলায় কেবিনের বাইরে পাহাড়ের কুয়াশা-এটি ভ্রমণকে শুধু দর্শনীয় নয়, আত্মিক করে তোলে।

ফেরার পথে আবার সেই কেবল কার, ট্রেন, শহর। কিন্তু মনে হলো-আমি আর আগের মানুষ নই। ওসাকার আলো-ঝলমলে স্টেশনেও কোয়া-সানের নীরবতা যেন সঙ্গে করে নিয়ে এলাম।

টোকিও থেকে Shizuoka

টোকিও শহর কখনো থামে না। এখানে সকাল শুরু হয় শব্দ দিয়ে, রাত শেষ হয় আলো দিয়ে। এই শহর থেকেই আমাদের যাত্রা-শিজুওকার দিকে। গন্তব্য এমন এক অঞ্চল, যেখানে জাপানের সবচেয়ে পরিচিত পাহাড়, সবচেয়ে সবুজ চা আর সবচেয়ে ধীর জীবন একসঙ্গে মিশে আছে। আমার সঙ্গে আছে গাইড নিকিতা। ট্রেন ছাড়ে। যাত্রা শুরু হয়। শিনকানসেন যত এগোয়, জানালার বাইরের দৃশ্য ততো বদলায়। প্রথমে বহুতল ভবন, তারপর ছোট শহর, তারপর খোলা মাঠ আর পাহাড়। এই রুট জাপানের সবচেয়ে সুন্দর ট্রেনপথগুলোর একটি।

Tokyo থেকে Shizuoka যেতে শিনকানসেন লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। এই পথটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ-প্রাচীন Tokaido রুট, যা Edo যুগে জাপানের প্রধান যাতায়াত ও বাণিজ্যপথ ছিল। জানালার বাইরে দৃশ্য বদলাতে থাকে। প্রথমে ঘন ভবন, তারপর ছোট শহর, তারপর খোলা মাঠ। পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে সামনে আসে, যেন শহরের কোলাহল থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য সময় নিচ্ছে। Shizuoka মূলত Tokyo ও Nago–a-এর মাঝখানে অবস্থিত, তাই এটি প্রাচীনকাল থেকেই যাতায়াত ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল। Tokugawa যুগে এই পথ দিয়েই প্রশাসনিক ও সামরিক যোগাযোগ চলত। দূরে আবছা হয়ে ভেসে ওঠে Mount Fuji-এর রূপরেখা। পাহাড়টি প্রথম দেখা যায় অনেক আগেই, কিন্তু পুরোটা ধরা দেয় ধীরে।

শিজুওকা পৌঁছে প্রথম যাত্রা চা বাগানের দিকে। জাপানের মোট গ্রিন টির প্রায় অর্ধেক আসে এই অঞ্চল থেকে। পাহাড়ি ঢালে সারি সারি চা গাছ-একই সঙ্গে কৃষি ও নান্দনিকতার উদাহরণ। এই চা বাগানগুলো শুধু অর্থনীতির অংশ নয়, শিজুওকার সাংস্কৃতিক পরিচয়। শত শত বছর ধরে এখানকার পরিবারগুলো চা চাষের সঙ্গে যুক্ত। বাতাসে ভেসে থাকে কাঁচা পাতার হালকা গন্ধ। হেঁটে চলার সময় বোঝা যায়-এখানে প্রকৃতি সাজানো নয়, বরং যত্নে রাখা। হাঁটতে হাঁটতে বোঝা যায়-এই সবুজ প্রকৃতি সাজানো নয়, বরং যত্নে বড় করা।নিকিতা বলে- এখানে সবুজটা চোখে লাগে না বরং ভিতরে ঢুকে যায়।

এরপর আমরা যাই Kunozan Toshogu Shrine-এ। এটি Tokugawa Ieyas-এর সমাধিস্থল-যিনি জাপানে দীর্ঘ ২৫০ বছরের শোগুন শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন। মন্দিরটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। নিচ থেকে ওপরে উঠতে হয় শতাধিক পাথরের সিঁড়ি। পথের দুই পাশে পুরোনো দেবদারু গাছ, আর ওপরে পৌঁছালে চোখে পড়ে সোনালি অলঙ্করণে ভরা মূল মন্দির। এটি শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, জাপানের রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। উপরে দাঁড়িয়ে সমুদ্র, শহর ও পাহাড় একসঙ্গে দেখা যায়-যেন শাসক জীবনের শেষেও পুরো দেশকে দেখছেন। দুপুরের পর যাত্রা Miho no Matsubara। এটি জাপানের অন্যতম বিখ্যাত প্রাকৃতিক দৃশ্য-সমুদ্রের ধারে দীর্ঘ পাইন গাছের সারি, আর তার পেছনে Mount Fuji। এই জায়গাটি জাপানি কবিতা ও চিত্রকলায় বহুবার এসেছে। এখানে প্রকৃতি নিজেই ফ্রেম তৈরি করে। সমুদ্রের ঢেউ শান্ত, বাতাস নরম। হাঁটতে হাঁটতে বোঝা যায় কেন জাপানিরা প্রকৃতিকে শুধু দেখে না, শ্রদ্ধা করে।

শিজুওকা শহরের ভেতরে অবস্থিত Sunpu Castle-Tokugawa Ieyasu-এর অবসর জীবনের আবাস। আজ দুর্গের মূল কাঠামো নেই, কিন্তু প্রাচীর, জলাধার ও বাগান সংরক্ষিত। এখানে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, ক্ষমতা শেষ হলে মানুষ কীভাবে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চায়। শহরের আধুনিক ভবনের মাঝেও এই জায়গাটি শান্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ। ভ্রমণের শেষে একটি ছোট চা ঘরে বসি। Shizuoka-এর গ্রিন টি হালকা, সুগন্ধি, তিক্ততা নেই। চায়ের স্বাদ যেমন পরিষ্কার, এখানকার জীবনও তেমন।

সন্ধ্যায় ফেরার শিনকানসেন। জানালার বাইরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় পাহাড়, চা বাগান আর ফুজির ছায়া। টোকিও আবার সামনে আসে-আলো, গতি, শব্দ। কিন্তু শিজুওকা থেকে আমরা নিয়ে ফিরি-সবুজের ধৈর্য, ইতিহাসের গভীরতা আর প্রকৃতির নীরব শিক্ষা।

আকিয়াবারার রেমেন সন্ধ্যা

টোকিওর আকিয়াবারা-শুধুই একটি জেলা নয়, এ যেন আলো, শব্দ আর মানুষের ঢেউয়ে তৈরি এক জীবন্ত নগরচিত্র। অ্যানিমে বিলবোর্ডের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যটক, ইলেকট্রনিক্স শপের সামনে লাইন, আর অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়া খাবারের গন্ধ-সব মিলিয়ে শহরটি যেন নিজস্ব গতিতে নিঃশ্বাস নেয়। ঠিক সেই বিকেলেই আমি গাইড নিকিতাকে বললাম, আজ জাপানের ঐতিহ্যবাহী খাবার রেমেন খেতে চাই।

নিকিতা হেসেছিল। সেই হাসিতে ছিল আত্মবিশ্বাস-নিজের শহর, নিজের সংস্কৃতি তুলে ধরার আনন্দ। সে কোনো প্রশ্ন করেনি। গন্তব্য বেছে নেওয়ার ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছিল-এটা শুধু খাবার খাওয়ার আয়োজন নয়, বরং নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার এক নীরব দায়িত্ব। সে আমাকে নিয়ে গেল আকিয়াবারার ভেতরের এক তুলনামূলক ছোট, কিন্তু জনপ্রিয় রেমেন রেস্টুরেন্টে। বাইরে তেমন ঝলমলে সাজ নেই, কিন্তু দরজার সামনে অপেক্ষমাণ মানুষের সারিই ছিল তার মানের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই উষ্ণ এক গন্ধ-সেদ্ধ নুডলস, সয়াসস, মিসো আর স্টকের মিশ্র সুগন্ধ। ছোট জায়গা, কাঠের কাউন্টার, ওপেন কিচেনে ব্যস্ত রাঁধুনিরা। মনে হচ্ছিল টোকিওর আধুনিকতার ভিড়ের মাঝেও এখানে যেন এক চিলতে ঐতিহ্য বেঁচে আছে।

নিকিতা মেনু হাতে নিয়ে আমার দিকে তাকাল। সে জানে, আমি মাংস খাই না। এক মুহূর্ত দেরি না করে দু’জনের জন্য দু’রকম রেমেন অর্ডার করলো, আমার জন্য সবজি আর মিসো বেসড ভেজিটেরিয়ান রেমেন, আর নিজের জন্য ক্লাসিক টোকিও-স্টাইল রেমেন। রেমেন এসে টেবিলে পড়তেই চোখ আটকে গেল। ধোঁয়া ওঠা বাটিতে সাজানো নুডলস, সবুজ পেঁয়াজ, সি-উইড, মাশরুম আর গভীর রঙের ঝোল। প্রথম চামচেই বোঝা গেল-এ শুধু খাবার নয়, এ এক অনুভব। 

আমি চুপচাপ খেতে খেতে ভাবছিলাম, টোকিও শহরটাও ঠিক এমনই। বাইরে প্রযুক্তির ঝলকানি, ভেতরে গভীর ঐতিহ্য আর অনুভূতি। আর এই শহরকে বোঝার পথে নিকিতা যেন এক নির্ভরযোগ্য অনুবাদক-ভাষার নয়, সংস্কৃতির। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আবার আকিয়াবারার আলোঝলমলে রাস্তায় দাঁড়ালাম। পেছনে পড়ে থাকলো একটি ছোট রেমেন শপ, কিন্তু সঙ্গে থেকে গেল স্বাদ, গন্ধ আর এক বিকেলের নরম স্মৃতি।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)