যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছে ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (ডিওজে)। ৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি নতুন ইন্টারিম ফাইনাল রুলের মাধ্যমে প্রশাসন ইমিগ্রেশন জজদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন এ উদ্যোগ ৯ মার্চ থেকে কার্যকর হবে। এ বিধি ডিওজের অধীন পরিচালিত বোর্ড অব ইমিগ্রেশন আপিলস (বিআইএ)-এ অধিকাংশ আপিল দ্রুত ডিসমিসাল বা সংক্ষিপ্ত খারিজের পথ খুলে দেবে। নতুন বিধি কার্যত বহু ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন জজদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক আপিলের সুযোগকে সংকুচিত বা প্রায় নিষ্ক্রিয় করে দেবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আদালত ব্যবস্থায় ন্যায় বিচারের শেষ বড় নিরাপত্তা-ব্যবস্থাগুলোর একটি দুর্বল করে দ্রুত গণনির্বাসনের পথ প্রশস্ত করতে পারে। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ বলছে, এতে মামলার জট কমবে এবং অপসারণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।
ডিওজের এই পদক্ষেপকে অনেকেই বৃহত্তর এক নীতিগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অভিবাসন আদালত কাঠামোয় একাধিক বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। শতাধিক ইমিগ্রেশন জজকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বোর্ড অব ইমিগ্রেশন আপিলসের সদস্যসংখ্যা ২৮ থেকে কমিয়ে ১৫ করা হয়েছে এবং পূর্ববর্তী প্রশাসনের নিয়োগ পাওয়া ৯ জন বিআইএ সদস্যকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে বিআইএ ৭০টির বেশি নজিরমূলক সিদ্ধান্ত জারি করেছে, যার অধিকাংশেই অপসারণের মুখে থাকা অনাগরিকদের জন্য ফলাফল ছিল নেতিবাচক। সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপ আপিল প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দ্রুত অপসারণকে সহজ করার কৌশলের অংশ।
নতুন ইন্টারিম ফাইনাল রুলের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হলো-ইমিগ্রেশন জজের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিআইএতে আপিল দাখিলের সময়সীমা ৩০ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ১০ দিন করা। অর্থাৎ অনাগরিকদের হাতে থাকবে মাত্র ১০ দিন, এর মধ্যে ১ হাজার ৩০ ডলারের ফাইলিং ফি জোগাড় করা, আইনজীবী নিয়োগ (যদি আগে না থাকে) এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করে আপিল জমা দেওয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, আটক অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য এই সময়সীমা কার্যত প্রায় অসম্ভব।
আইনে নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। অধিকাংশ আশ্রয় মামলায় আপিলের সময়সীমা এখনো ৩০ দিন থাকবে, তবে তিনটি সীমিত ব্যতিক্রমের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু সময়সীমা ৩০ দিন থাকলেও নতুন বিধির অধীনে বিআইএর ডিফল্ট নীতি হবে অধিকাংশ আপিল দ্রুত সংক্ষিপ্তভাবে খারিজ করা, যদি না ১৫ সদস্যের বোর্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিশেষভাবে কোনো মামলাকে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করতে চায়। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এ ক্ষমতা খুব কম ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হবে।
বর্তমান প্রক্রিয়ায়, বিআইএতে আপিল বিচারাধীন থাকলে ইমিগ্রেশন জজের দেওয়া অপসারণ আদেশ কার্যকর হয় না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তা স্থগিত থাকে, যা অনেক সময় বছরও লাগতে পারে। কিন্তু নতুন বিধি কার্যকর হলে চিত্র বদলে যাবে। ইমিগ্রেশন জজ কোনো আবেদন নাকচ করলে, বিআইএ ১৫ দিনের মধ্যে সংক্ষিপ্ত খারিজ দিতে পারবে। ফলে জজের সিদ্ধান্ত থেকে বিআইএর খারিজসহ সব মিলিয়ে ২৫ দিনের মধ্যেই অপসারণ আদেশ কার্যকর হয়ে যেতে পারে। এতে করে অর্থবহ আপিল পর্যালোচনা বাস্তবে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় অনাগরিকদের সামনে একমাত্র পথ থাকবে ফেডারেল সার্কিট কোর্ট অব আপিলসে আবেদন করা এবং জরুরি স্টে বা স্থগিতাদেশ চাওয়া, যাতে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় নির্বাসন কার্যকর না হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল ও জটিল। বিআইএ-তে আপিল করতে ১ হাজার ৩০ ডলার এবং ফেডারেল সার্কিট কোর্টে আবেদন করতে অতিরিক্ত ৬০০ ডলারসহ মোট অন্তত ১ হাজার ৬৩০ ডলার খরচ হবে, আইনজীবীর ফি বাদে। অনেক আটক ব্যক্তির জন্য এ অর্থ জোগাড় ও দ্রুত আইনি সহায়তা পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
সমালোচকেরা বলছেন, দ্রুত অপসারণ কার্যকর করার এই প্রক্রিয়া অনাগরিকদের চরম ঝুঁকিতে ফেলবে। সরকার যদি দ্রুত নির্বাসন কার্যকর করে ফেলে, তাহলে ফেডারেল কোর্টে স্টে চাওয়ার সুযোগও বাস্তবে অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে আটক কেন্দ্র থেকে আইনজীবী খুঁজে পাওয়া, প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করা এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধ করা অত্যন্ত কঠিন।
নতুন বিধি আপিল শুনানির লিখিত যুক্তি দাখিলের সুযোগও সংকুচিত করেছে। অআটক মামলায় একযোগে ব্রিফিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং রিপ্লাই ব্রিফ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে একপক্ষ অন্যপক্ষের যুক্তির জবাব দেওয়ার অর্থবহ সুযোগ পাবে না। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের ন্যূনতম মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। যদিও বর্তমানে বোর্ড অব ইমিগ্রেশন আপিলসে (বিআইএ) ঝুলে থাকা প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার আপিলে তা সরাসরি প্রভাব ফেলবে না, ভবিষ্যতে দাখিল হওয়া অধিকাংশ আপিল দ্রুত সামারি ডিসমিসাল বা সংক্ষিপ্ত খারিজের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ডিওজে ৯ মার্চ কার্যকর হওয়ার আগে জনমত গ্রহণ করছে। তবে যেহেতু এটি একটি ইন্টারিম ফাইনাল রুল, তাই মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়া চললেও বিধিটি নির্ধারিত তারিখে কার্যকর হয়ে যাবে। ফলে মতামতের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের বাধ্যবাধকতা নেই। সাধারণত সরকার প্রথমে প্রস্তাবিত বিধি প্রকাশ করে জনমত নেয়, তারপর চূড়ান্ত বিধি জারি করে। এখানে সেই প্রচলিত ধাপ এড়িয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের পথ নেওয়া হয়েছে। আইনি চ্যালেঞ্জ বা মামলা হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এ বিধি এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আটক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটছে। আটক ব্যক্তিরা ইমিগ্রেশন জজের কাছে হেরে গেলে বিআইএ-তে আপিল করে সামান্য সময় ও সুরক্ষা পেতেন। এখন সেই আপিল দ্রুত খারিজ হলে তারা ত্বরিত নির্বাসনের মুখে পড়বেন। আটক অবস্থায় ফেডারেল কোর্টে পিটিশন প্রস্তুত করা, আইনজীবী জোগাড় করা, কিংবা প্রয়োজনীয় ফি জোগাড় করা বাস্তবে দুরূহ।
অভিবাসন অধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের মতে, আপিল ব্যবস্থা শুধু বিলম্বের কৌশল নয়,বরং বিচারিক ভুল সংশোধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা-ব্যবস্থা। ইমিগ্রেশন জজদের ওপর বিপুল মামলার চাপ, নীতিগত পরিবর্তন ও প্রশাসনিক নির্দেশনার কারণে ভুলের সম্ভাবনা থাকে। আপিলের সুযোগ সংকুচিত হলে সেই ভুল সংশোধনের পথও সঙ্কুচিত হয়। অন্যদিকে প্রশাসনের সমর্থকেরা বলছেন, দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত কার্যকর করলে আদালতের জট কমবে এবং আইন প্রয়োগে কার্যকারিতা বাড়বে।
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, দ্রুততার বিনিময়ে ন্যায়বিচারের মান কতটা ক্ষুণ্ন হবে? বিশেষ করে আশ্রয়প্রার্থী, নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি বা যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন বসবাসকারী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ পরিবর্তন মানবিক ও আইনি দুই দিক থেকেই গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। অভিবাসন আদালত ঐতিহ্যগতভাবে ফৌজদারি আদালত নয়; এখানে সাংবিধানিক সুরক্ষা সীমিত। ফলে প্রশাসনিক আপিলই ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ। নতুন বিধি সে রক্ষাকবচকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে সমালোচকেরা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে, ডিওজের নতুন নতুন ইন্টারিম ফাইনাল রুলের যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আপিল কাঠামোয় একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ১০ দিনের আপিল সময়সীমা, বিআইএর ডিফল্ট সামারি ডিসমিসাল, ব্রিফিং সীমাবদ্ধতা এবং দ্রুত কার্যকর হওয়া অপসারণ আদেশ সহ এসব পদক্ষেপ একত্রে দ্রুত গণনির্বাসনের পথ প্রশস্ত করতে পারে। এখন নজর থাকবে ফেডারেল আদালতে এ বিধির বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ কত দ্রুত আসে এবং তা কতটা সফল হয় আর বাস্তবে হাজারো অনাগরিকের জীবনে এর প্রভাব কতটা গভীর হয়ে ওঠে।