সড়কে বিভিন্ন পরিবহন থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা নেওয়া হলে, সেটা চাঁদা নয়। বরং টাকা দিতে বাধ্য করা হলে, সেটা চাঁদা- সড়ক পরিবহণ ও যোগাযোগমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের এমন মন্তব্যে দেশ জুড়ে আলোচনার শেষ নেই। তবে এর চেয়ে বড়ো প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগমন্ত্রীর এমন মন্তব্য নিয়ে সরকারের হাই লেবেলেও নিরবতা।
কি বললেন যোগাযোগমন্ত্রী?
দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় দিনেই সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, রেলপথ মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, দুই প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ও মো. রাজিব আহসান। আর এরপর ঐ দিন বিকালে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন মন্ত্রী। এতে সড়কে চাঁদাবাজি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে যোগাযোগমন্ত্রী বলে ফেলেন যে, সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে তিনি একে চাঁদা হিসাবে দেখেন না। তিনি বললেন এভাবে..‘ সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক ও শ্রমিক সমিতি আছে। তারা তাদের কল্যাণে এই টাকা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। তবে চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেই টাকা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়। তিনি বলেন, মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। সেক্ষেত্রে উত্তোলন করা টাকার কতটুকু ব্যবহার করা হয়, সেটা নিয়ে হয়ত বিতর্ক আছে। কিন্তু তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটা করেন।
শুরু হয় চারিদিক থেকে প্রতিক্রিয়া
সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর বলা যায় গণমাধ্যম তাকে ছেকে ধরেছে। তার পক্ষ থেকে ওই ধরনের বক্তব্য রাখার পর থেকেই প্রায় প্রতিদিনই চলছে মন্তব্য, বিশেষ প্রতিবেদন। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে নানান ধরনের মন্তব্য।
টিআইবি’র প্রতিক্রিয়া
সড়কে চাঁদাবাজিকে সমঝোতার ভিত্তিতে লেনদেন উল্লেখ করে একটি গুরুতর অপরাধকে সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বৈধতা দেওয়ার যে অজুহাত খুঁজেছেন, তাতে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে এ-জাতীয় দুর্নীতি সহায়ক অপচেষ্টাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার লক্ষ্যে নিজ দল শুদ্ধিকরণে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। মন্ত্রীর বক্তব্য রাখার পরদিনই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। মন্ত্রীর এই বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘পরিবহনমন্ত্রী চাঁদাবাজির যে সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন, তা তিনিসহ মন্ত্রিপরিষদের প্রায় প্রতিটি সদস্য দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতিবিরোধী যে দৃঢ় অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন, তার সম্পূর্ণ বিপরীত।’
টিআইবির নির্বাহী আরোও শক্তভাবে স্বরণ করে দিয়ে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহার ও সরকারপ্রধানের জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণ, যেখানে কার্যকরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের অঙ্গীকার করা হয়েছে, তার মাত্র ৪৮ ঘন্টাও অতিবাহিত না হতেই মন্ত্রীর পরিবহন খাতের ক্যানসার চাঁদাবাজির সুরক্ষাপ্রয়াসী এ মন্তব্য খুবই হতাশাজনক। এর মাধ্যমে পরিবহনমন্ত্রী তাঁর নিজ দলের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত অঙ্গীকার ও সরকার প্রধানের দুর্নীতিবিরোধী দৃঢ় অবস্থানকে বিব্রতকরভাবে অবমূল্যায়ন করেছেন।’
জামায়াতের বক্তব্য
সড়কপরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের ‘সমঝোতার’ নামে চাঁদাবাজিকে কার্যত বৈধতা দেওয়ার সংক্রান্ত এমন বক্তব্যে দু’দিন পরে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সম্প্রতি সড়কপরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ‘সমঝোতার’ নামে চাঁদাবাজিকে কার্যত বৈধতা দিয়েছেন। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি একটি ফৌজদারি অপরাধ। এটি সমাজ, অর্থনীতি ও আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি। একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর বক্তব্যে যদি এমন কোনো বার্তা যায় যে অবৈধ অর্থ আদায় বা অনৈতিক সমঝোতা গ্রহণযোগ্য- তবে তা রাষ্ট্রের জন্য কলঙ্ক। রাষ্ট্রের এমন বৈধতা দান অপরাধীকে চাঁদাবাজির মত আরও অনেক অপরাধ করতে উৎসাহিত করবে। এতে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। জনগণ ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থেকে বঞ্চিত হবে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি কি বললো
পরিবহন মাফিয়াদের আনুকূল্য পেতে নতুন সড়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে পরিবহনে চাঁদাবাজির বৈধতা দেওয়া পতিত স্বৈরাচারের পদাঙ্ক অনুসরণের সামিল হিসেবে মনে করেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এক বিবৃতিতে সংগঠনের মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী এমন অভিযোগ করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচারের সময়ে পরিবহনে চাঁদাবাজি শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কতিপয় পরিবহন মালিক শ্রমিক নেতারা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, অনেকে শতশত বাসের মালিক হয়েছে। পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তারা এমন চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্য সাথে জড়িত হয়ে পরার কারণে সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদ করার সাহস পাইনি। ছাত্র-জনতার রক্তে ভেঁজা সদ্য ভূমিষ্ঠ জনগণের জনপ্রিয় দল বিএনপির সরকারের একজন নতুন মন্ত্রীর এমন বক্তব্য দেশবাসী হতাশ হয়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতি মনে করে, বিএনপি গণমানুষের দল, তাদের পরিবহন মাফিয়াদের আনুকল্য আছে বলে মনে করি না।
অন্য সেক্টরের চাঁদাবাজ নিয়ে উদ্বেগ
এতিকে সড়কপরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের ‘সমঝোতার’ নামে চাঁদাবাজিকে কার্যত বৈধতা দেওয়ার সংক্রান্ত এমন বক্তব্য নিয়ে সারাদেশে আলোচনার ঝড় শেষ না হতে হতেই বোমা ফাটালেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) নেতারা। সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবগঠিত সরকারের নিকট প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বলা যায় আক্ষেপের সুরে অনেক খোলামেলা কথা বলেন। তাসকীন আহমেদ বলেন, অসহনীয় চাঁদাবাজি ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে যে হারে চাঁদা দিতে হতো, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ব্যবসায়ীদের একই হারে চাঁদা দিতে হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দিতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারেনি, এমনকি সরকারি দপ্তরে একদিনের জন্যও দুর্নীতিও কমেনি। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে আমরা ব্যবসা বন্ধ করে চলে যাব।
হাই লেবেলের নিরবতা ও শেষ কথা
এদিকে চাঁদাবাজদের পক্ষ নিয়ে পরিবহণমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পাশাপাশি ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদের বক্তবের পর সরকারের একেবারে শীর্ষ পর্যায়ে কিংবা আইন শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিতদের কোনো বক্তব্য বা পদক্ষেপ কারো নজরে আসেনি। শুধু তা-ই নয় এমন বক্তব্যের পরপর স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ যে চাঁদাবাজি ও গণছিনতাই রোধের দাবিতে খোদ রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আদাবর থানা ঘেরাও করেছে সে ব্যাপারেও তেমন কোনো কেনো টু-শব্দ নে-ই শীর্ষ মহলে। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যখন চাঁদাবাজি-দখলবাজির তথ্য জানতে ওয়েবসাইট খুলে ফেলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কিংবা যখন ফেনীতে চাঁদাবাজি ও অপরাধ দমনে হটলাইন চালু করেন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু ; তখন উপর মহলের সুনশান নিরবতা বিপজ্জনক মনে করেন অনেকে। কারো কারো মতে, পরিবহন সেক্টরে কতিপয় চাঁদাবাজ মাফিয়াদের ব্যাপারে ব্যপারে নির্বাচিত সরকার এমন ধারণা কিংবা সঙ্গা নিয়ে বসে থাকলে মাঠের খেলোয়াড়ও চুপচাপ বসে থাকবে না। বিশেষ করে বর্তমানে প্রধান বিরোধীদল জামায়াতের ইসলামী ও জুলাই বিপ্লবের ইমেজেকে ধারণ করে গড়ে উঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি এমন মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করবে না। আগের মতো এসো সবাই মিলে লুটে পুঠে তাই- সে অবস্থাও নেই এখন। সেজন্য নানান দিক থেকে বিএনপি’র ওপর ক্ষুব্ধ এ-ই দল দু’টি দেশের একটি জনপ্রিয় ইস্যু নিয়ে মাঠ কাপিয়ে ফেললে বিএনপির জন্য বিষয়টি খুবই বিব্রতকর হবে বলে কারো কারো অভিমত। কারো অভিমত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকারের শীর্ষ থেকে এভাবে চাদাবাজদের পক্ষ নেওয়া হলে, তা সামাল দেওয়া ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে দেশের পুরো রাজনৈতিক পরিস্থিতি। কেননা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে চাদাবাজ ইস্যুতেই বিএনপি ঘায়েল করতে হেন প্রচার নেই যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্তকরা। সারা দেশের পথে পান্তরে জোর প্রচারণা চালানো হয় যে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে সড়কে ফুটপাতে কিংবা ব্যবসা বাণিজ্যে চাদাবাজতো কমবেই না বরং এর রেট আরও বেড়ে যাবে।