সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক নীতি বাতিল


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 25-02-2026

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক নীতি বাতিল

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের উদ্যোগকে অবৈধ ঘোষণা করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস। গত ২০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ৬-৩ ভোটে দেওয়া এই রায়ে আদালত বলেছে, প্রেসিডেন্ট এককভাবে এবং সীমাহীনভাবে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন না। এর জন্য কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন। এই সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ শুল্কনীতি ছিল তার অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি।

আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক আরোপের যে চেষ্টা ট্রাম্প প্রশাসন করেছিল, তা আইনসম্মত নয়। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস তার মতামতে উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট এককভাবে সীমাহীন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দাবি করছেন, কিন্তু এমন ক্ষমতার জন্য স্পষ্ট আইনি অনুমোদন দরকার। কর আরোপ বা শুল্ক আদায় একটি অর্থনৈতিক নীতি, এটি কেবল নিয়ন্ত্রণ নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেছে, কংগ্রেসই বাণিজ্য নীতি নির্ধারণের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব রাখে। আদালত আরও বলেছে, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের অনুমতি দেয় না। রায়ে আদালত ব্যাখ্যা করেছে, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট কিছু ব্যবস্থা নিতে পারেন, কিন্তু বাণিজ্য নীতির মতো ব্যাপক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া যায় না। আদালত বলেছে, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন মূলত আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণের জন্য, শুল্ক আরোপের জন্য নয়।

বিচারপতি, ক্লারেন্স থমাস, স্যামুয়েল আলিটো ও ব্রেট কাভানাফ রায়ে বিরোধী মত দিয়েছেন। তাদের মতে, প্রেসিডেন্টের জরুরি ক্ষমতা বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের অংশ হতে পারে। তাদের মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের কিছু অতিরিক্ত ক্ষমতা থাকা উচিত। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা সেই যুক্তি গ্রহণ করেননি। মার্কিন সংবিধানে ক্ষমতার বিভাজন একটি মৌলিক নীতি। কংগ্রেস আইন প্রণয়ন করে, প্রেসিডেন্ট তা বাস্তবায়ন করেন এবং আদালত আইনের ব্যাখ্যা দেয়। শুল্কনীতি মূলত বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নীতির অংশ। এটি আইন প্রণয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। আদালত বলেছে, যদি প্রেসিডেন্ট এককভাবে শুল্ক আরোপ করতে পারেন, তবে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হবে। বাণিজ্য নীতি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যাপক প্রভাব ফেলে,তাই এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত।

এই রায়ের তাৎক্ষণিক প্রভাব হলো,প্রায় ১৩৪ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক আদায়ের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই। আদালত এই অর্থ ফেরত দেওয়া হবে কি না রায়ে সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি, ফলে বিষয়টি নিম্ন আদালতে নতুন করে নিষ্পত্তি হতে পারে।

রায় ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত লজ্জাজনক। তিনি বিচারকদের সমালোচনা করেন, যাদের দুজন তিনি নিজেই নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং বলেন, তারা দেশের স্বার্থে সাহসী সিদ্ধান্ত নেননি।

অন্যদিকে, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের বিজয়। পেন্স আরও বলেন, শুল্ক সাধারণত ভোক্তাদের ওপরই চাপ সৃষ্টি করে, তাই মুক্তবাণিজ্য অর্থনীতির জন্য এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। রিপাবলিকান দলের কিছু নেতাও রায়কে সমর্থন করেছেন। সিনেটর রান্ড পল বলেন, প্রেসিডেন্টের এককভাবে শুল্ক আরোপের প্রবণতা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর এবং কংগ্রেসের ভূমিকা পুনরুদ্ধার করা জরুরি। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ডন বেকনও অনুরূপ মত প্রকাশ করেন। তার মতে, শুল্কনীতি অর্থনৈতিকভাবে বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

শুল্ক আরোপের ফলে মার্কিন আমদানিকারকদের ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, সরকার ইতিমধ্যে ১৩৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি শুল্ক সংগ্রহ করেছে। এই অর্থ ফেরত দেওয়া হবে কি না-তা নিয়ে এখন আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। শুল্ক সাধারণত ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি করে। আমদানি পণ্যের দাম বাড়লে বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়তে পারে। ফলে আরোপিত শুল্ক সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে।

রায়ে কেবল জরুরি ক্ষমতা আইনের অধীনে শুল্ক আরোপকে অবৈধ বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের কাছে অন্য আইনি পথ এখনো খোলা রয়েছে। বাণিজ্য আইন ১৯৭৪ এবং ১৯৩০ সালের শুল্ক আইনের অধীনে কিছু শর্তে শুল্ক আরোপ সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে, বাণিজ্য আইন ১৯৭৪-এর একটি ধারা অনুযায়ী ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ১৫০ দিনের জন্য আরোপ করা যায়। আর ১৯৩০ সালের শুল্ক আইন অনুযায়ী, যদি কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্য করে, তাহলে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ থাকে। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা নতুন কৌশল গ্রহণ করবে। প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তিনি হয়তো ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের দিকে যেতে পারেন,যা তার আগের পরিকল্পনার চেয়েও কঠোর হতে পারে।

এই রায় কেবল একটি আইনি বিষয় নয়, এটি ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নও। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কংগ্রেস, প্রেসিডেন্ট ও আদালতের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন রয়েছে। আদালত মনে করছে, বাণিজ্য নীতি নির্ধারণ কংগ্রেসের দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্তে তা হওয়া উচিত নয়।

এই রায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ভবিষ্যতে বাণিজ্য নীতি বা জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করতে চাইলে কংগ্রেসের সমর্থন প্রয়োজন হবে। সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত মার্কিন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। এটি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং আইনের শাসনের গুরুত্বকে পুনরায় সামনে এনেছে।ট্রাম্প প্রশাসন এখন নতুন কৌশল গ্রহণের কথা বলছে, কিন্তু বিষয়টি দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। বিশ্ববাণিজ্যের ভবিষ্যৎ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি কোন দিকে যাবে কিনা তা এখন দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: শুল্কনীতি নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি, বরং নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)