একের পর এক হুঙ্কার ছাড়ছে বিরোধী দলের নেতারা। কেউ বলছেন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ভোটের ফলাফল পাল্টে ক্ষমতায় গিয়েই জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস ভুলে গেছে বিএনপি। আবার কারো কণ্ঠে তরুণরা আবারও রাস্তায় নামিয়ে আনবেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজনৈতিক মাঠে এবিষয়গুলির প্রতি বিএনপির নজর আছে। আছে সন্দেহের চোখ।
কে কি বলছেন
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ইঞ্জিনিয়ারিং করে ভোটের ফলাফল পাল্টে ক্ষমতায় গিয়েই জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস ভুলে গেলেন। মনে রাখবেন, আগামীর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে জনগণ। অন্যদিকে একিই দলের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা সংসদের ভেতরে জনগণের অধিকারের পক্ষে কথা বলব। যদি সেই দাবি মেনে নেওয়া হয়, সাধুবাদ জানাব। জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নিলে শুধু সমর্থন নয়, সহযোগিতা করব। আবার জনগণের কোনো অধিকার অধিকার হরণ করা হলে চুপ থাকব না, তার তীব্র প্রতিবাদ করব। প্রতিবাদে কাজ হলে আলহামুদলিল্লাহ, না হলে প্রতিরোধ করব। আমরা থামব না, ইনশাআল্লাহ। আমাদের লড়াই চলবে, এ লড়াই হোক জনতার বিজয়ের লড়াই।
এদিকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বৈষম্যহীনতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কার যদি নিশ্চিত না হয়, তবে বাংলাদেশের তরুণরা আবারও রাস্তায় নামবে। হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, সরকার যদি সংসদে আলোচনার পথ সংকুচিত করে, তাহলে বারবার আন্দোলন-সংগ্রাম রাজপথে গড়াবে।
হুঙ্কারের নেপথ্যে কি
কারো কারো মতে, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বড়ো একটি অংশ চরম হতাশা মধ্যে নিমজ্জিত। কেননা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাঠে নামিয়ে বলা হয়েছিল এবার দলটি ক্ষমতায় বসবেই। তা না হলে অনেক বেশি আসন পেয়ে দরকষাকষি করে একটি জাতীয় সরকারের দিকে দলটিকে নিয়ে যাবে তারা। এতে করে তারা সংবিধান সংশোধনের জন্য কার্যকরি পদক্ষেপ নেবে। এসব সম্ভব না হলেও সংসদে অনেক আসন পেয়ে বিএনপি’কে একচেটিয়া ব্যাটিং করার সুযোগ দেবে না। একারণে তৈরি করা হয়েছিল বিএনপির বিরুদ্ধে সাইবার যোদ্ধা নামে ‘বিশাল এক বট বাহিনী’। ঢালা হয়েছিল কোটি কোটি টাকা। কারো কারো মতে, জামায়াতে ইসলামীর এলক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বট বাহিনীর নেতৃত্ব ও এর সাথে সম্পৃক্ত তরুণদের একটি বড়ো অংশের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তারা মনে করে এবারেই জামায়াতে ইসলামীর একটি বড়ো সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে দলটি এমন সুযোগ আর পাবে না। এর পাশাপাশি সাইবার জগতে এই বটবাহিনী চিহ্নিতও হয়ে গেছে।
অন্যদিকে একটি সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জামায়াতে ইসলামী বেশ দাপটের সাথে প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ এমন কি মাঝারি-নিম্নপদেও তাদের মতাদর্শের লোক বসিয়ে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছে। সেসময়ে জুলাই বিপ্লবের ইমেজকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়ে তারা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের ধাপে ধাপে নিজেদের মতাদর্শের লোকজনকে চাকরি-ব্যবসা বাণিজ্যের পথকে সহজ করে দেয়। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর মতাদর্শে বিশ্বাসী গণমাধ্যমকর্মীদের তারা বিভিন্ন পত্রিকায় শক্তভাবে আসন গেড়ে বসে ব্যবস্থা করে দেয়। জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত গণমাধ্যমগুলিকে আর্থিকভাবে লাভবান করতে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে সব ধরনের সুযোগ সুবিধাও হাতিয়ে নেয় তারা। এবিষয়গুলো এখন বিএনপি সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। জানা গেছে, বিএনপি যেনো প্রশাসনে কিংবা বেসরকারি খাতের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে অর্ন্তবর্তী সরকারের আমলে সুবিধাভুগীদের সরিয়ে দিতে না পারে সেজন্য জামায়াতে ইসলামী মাঠে গর্জন দিচ্ছে। আর একাজে সুচারুভাবে কাজে লাগাতে জুলাই বিপ্লবীদের সুকৌশলে ব্যবহার করতে চাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। কারো কারো মতে রাজনৈতিক মাঠে হুঙ্কার গর্জন দিয়ে জামায়াতে ইসলামী এখন বিএনপি’কে চাপে রাখার কৌশল নিতে চায়। কেননা বিএনপি ইতোমধ্যে প্রশাসনে, গণমাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর আদর্শে বিশ্বাসীদের সরিয়ে দিতে পদক্ষেপ নিতে শুরু করায় দলটি বিচলিত হয়েই রাজনৈতিক মাঠে নানান ধরনের হুঙ্কার ছাড়ছে।
শেষ কথা ও কি করবে বিএনপি
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বৈষম্যহীনতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কার যদি নিশ্চিত না হয়, তবে বাংলাদেশের তরুণরা আবারও রাস্তায় নামার হুমকি- এসব বিষয়গুলিকে বিএনপি ঠিকই আমলে নেবে বলে দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো এসব হুঙ্কার বা গর্জনের বিপরীতে কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্দা দিয়ে আপাতত ক্ষমতাসীন বিএনপি নমনয়ীয়ভাবেই মোকাবেলা করে যাবে। কারো প্রতি কোনো ব্যাপারে প্রতিহিংসায় জড়াবে না। তারই প্রমাণ মেলে যখন দেখা যায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে মামলা করায় বিএনপি নেতা আশরাফুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেয় দলটির কেন্দ্রীয় কমিটি। অবশ্য এমন ঘটনাতে এই প্রজন্মের দল এনসিপি মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও রোববার (৮ মার্চ) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে তিনি বিএনপিকে ধন্যবাদ দিয়ে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করেন। আবার দেখা যায় বিরোধী দলকে লিখিতভাবে ডেপুটি স্পিকারের প্রস্তাব দেওয়ার বিধান না থাকলেও জামায়াতে ইসলামীকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়। জানা গেছে, কারো কারো বা প্রতিহিংসার জবাব রাজনীতি ভাষাতেই দেওয়ার পথে হাঁটবে বিএনপি। দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা অতি উৎসাহী দলীয় নেতাকর্মীদের মতো নয়। এমনটাই আভাস মেলে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সাথে কথা বলে। জানা গেছে, রাজনৈতিক মাঠে হুঙ্কার গর্জন এনসিপির পক্ষ থেকে এলে তাদের ব্যাপারে বিএনপির উদারতা বেশি থাকবে। তবে অন্য কেউ জুলাই বিপ্লবীদের ইমেজে গড়ে উঠা দল এনসিপিদের ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে ফেলে কি-না সেব্যাপারে বিএনপির সন্দেহের চোখ চলমান থাকবে বলেও দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়।