মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর সাথে সাথে মাথায় হাত পরার অবস্থা বাংলাদেশের। এমনিই বিগত আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া ভঙুর অর্থনীতি। বিভিন্ন পর্যায় সিঙ্গাপুরের স্পট মার্কেট থেকে বেশি রেট দিয়ে তেল ক্রয় করে এক শ্রেণীর ব্যাবসায়ীদের অধিক মুনাফা করার সুযোগ করে দেয়া। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের দের বছর টালমাটাল অবস্থা। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর নতুন সরকার ক্ষমতা নেয়ার পরই নেমে আসে অনাকাংখিত ওই সঙ্কট। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার পর চরম বিপাকে পড়ে সরকার। দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে চলে যায় এক চোট। কি পরিমাণ মজুদ রয়েছে এমন এক বার্তা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে তোলপাড়। পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ লাইন। নির্ঘুম রাত পার। অবশেষে সরকার রেশনিং সিস্টেম চালু করে দেয়, যাতে সবাই তেল পেতে পারে। এভাবে চলার পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া শুরু এবং বেশ দ্রুতই।
শঙ্কা বেড়েছিল ওই অবস্থা কন্টিনিউ করলে আসন্ন ঈদে যাত্রী পরিবহনই করতে পারবে না, দূরপাল্লার বাস। বাস পরিচালকেরা বলছিল, পেট্রোল পাম্পে তেল, ডিজেল পাওয়া যাচ্ছিল না। লাইন দিয়েও না। অনেকে গাড়ি সাইড করেছে। মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যায় গাড়ি চলাচল কমে যাওয়া। শঙ্কা ছিল খাদ্যপণ্য পরিবণে এ সঙ্কট আকাশ ছোয়া হয়ে যাবে পণ্য। এসবই এখন কেটে গেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব বন্ধ থাকলেও চীনের জাহাজ চলতে অনুমতি দেয়ার পর বাংলাদেশ সরকারও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুযোগটা নিতে সক্ষম হয়। পাশাপাশি চীনের কাছে তেল ক্রয়ের সুযোগ চায়। তার আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও তেল লাভের চেষ্টা চালায়। এ সবই ছিল পজেটিভ নতুন সরকারের জন্য। সবাই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আশ্বাস দেয়।
ইরান বাংলাদেশের জাহাজ ছেড়ে দিলে হরমুজ প্রণালীতে তাৎক্ষণিক আসার জন্য ওয়েটিংয়ে থাকা যে কটা জাহাজ ছিল সেগুলোও চলে আসে। এবং পৌঁছে যায় বাংলাদেশে। এ থেকেই সঙ্কট কমতে শুরু। এ রিপোর্ট লেখাকালীন সময় (মঙ্গলবার , ১০ মার্চ) পুরাপুরি সঙ্কট কাটেনি। অনেক পেট্রোলপাম্প, স্বাভাবিক প্রক্রিয়াল তৈল বিক্রি শুরু করতে পারেনি। তবে আগের চেয়ে পরিস্থিতি অনেক উন্নত। মানুষের মধ্যেও আস্থা ফিরেছে।
এরই মধ্যে খবর এসেছে ইরান আর হরমুজ প্রণালীতে বাংলাদেশী জাহাজ চলাচলে বাধা দেবে না। ভাতৃপ্রতীম এমন পদক্ষেপে বাংলাদেশে অনাঙ্খিত সঙ্কট অনেকটাই কেটে গেল। এর আগে বাংলাদেশের অন্যান্য পদক্ষেপের মাঝেও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী নিয়ে শঙ্কা তৈরি হলে বাংলাদেশ ইরানের কাছে তেল ও এলএনজি বহনকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা চায়।
জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা জানান, প্রণালীতে প্রবেশের আগে ইরানি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলে বাংলাদেশি জাহাজগুলোকে ওই কৌশলগত জলপথ দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে। এতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ কিছুটা কমেছে।
এদিকে গত সোমবার ৯ মার্চ, সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার টন ডিজেলবাহী একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া চলতি সপ্তাহে আরও চারটি জাহাজে মোট এক লাখ ২০ হাজার ২০৫ টন জ্বালানি নিয়ে বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। যা হরমুজ প্রণালী দিয়ে এসেছে। এই জাহাজগুলোতে রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)।
দুই দেশের মোট বাণিজ্যের ৮৫ শতাংশই মূলত ভারত থেকে পণ্য আমদানি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও এরই মধ্যে জ্বালানি পণ্য নিয়ে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ভারতের কাছে বাড়তি ডিজেল আমদানির প্রস্তাব দেয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে আজ বাংলাদেশে আসছে পাঁচ হাজার টন ডিজেল।
বিবিসি, বিপিসি সূত্রের উদৃতি দিয়ে জানাচ্ছে, পাইপলাইনে করে এ ডিজেল বাংলাদেশে পৌঁছনোর কথা। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভারতের ওপর বাংলাদেশের বাণিজ্যনির্ভরতা আরো বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে জানায় বিবিসি।
প্রথমত কিছুটা হতাশা ছড়িয়ে পড়লেও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ থাকার কথা জানানো হয়। বর্তমানে নিয়মিত বাজার তদারকির পাশাপাশি জ্বালানি তেল, গ্যাস ও এলএনজির সরবরাহ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যেদিকে মোড় নিচ্ছে তাতে সামনের দিনগুলোতে জ্বালানি পণ্যের পাশাপাশি খাদ্যপণ্যেরও সংকট তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে আইআরজিসি হুঁশিয়ারি
এদিকে দ্যা গার্ডিয়ান জানায়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে ‘এক লিটার তেলও’ রপ্তানি করতে দেয়া হবে না। এই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, “ইরান যদি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তবে দেশটিকে আগের চেয়ে অনেক গুণ শক্তিশালী হামলার মুখোমুখি হতে হবে।”
চলমান সংঘাতের কারণে ওই নৌপথে পণ্যবাহী জাহাজের চলাচল ইতোমধ্যেই চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর আগে ট্রাম্প যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। জবাবে আইআরজিসি তাদের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা “যুদ্ধের সমাপ্তি নির্ধারণ” করবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “অঞ্চলের সমীকরণ এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে; মার্কিন বাহিনী এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে পারবে না।”
ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ পোস্টে লিখেছেন, “ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে তেলের প্রবাহ বন্ধ করার কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর এ যাবৎকালের চেয়ে ২০ গুণ বেশি কঠোর হামলা চালাবে। আমরা এমন কিছু সহজে ধ্বংসযোগ্য লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানব, যা ইরানের ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব করে তুলবে। তাদের ওপর মৃত্যু, আগুন ও ধ্বংসযজ্ঞ নেমে আসবে তবে আশা করি তা হবে না।”