মারাত্মক ঝুঁকিতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা


খন্দকার সালেক , আপডেট করা হয়েছে : 11-03-2026

মারাত্মক ঝুঁকিতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট ধ্বংসাত্মক সংঘাতে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইরানের পাল্টা জবাবে কাতার, সৌদি আরব, ইউএই, কুয়েত অর্থাৎ আরব এবং পারস্য উপসাগর অঞ্চল এখন আগুনে জ্বলছে। কাতার স্থগিত করেছে এলএনজি উৎপাদন এবং রফতানি। সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো ইরানি ড্রোন আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত রাস টানুরা রিফাইনারি বন্ধ করে দিয়েছে। এ অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত এবং পরিশোধিত তেল, এলএনজি এবং এলপিজি রফতানির মূল জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সাপ্লাই চেন ছেদ পড়েছে। সংঘর্ষ প্রথম সপ্তাহে। ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে ৮৫ মার্কিন ডলার হয়ে গাছে। অনেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞের ধারণা আগামী সপ্তাহেই মূল্য ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১২০-১৩০ ডলার হয়ে যেতে পারে। জাহাজ চলাচল, বিমান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটায় শুধু জ্বালানি নয় বিশ্ব বাণিজ্য, বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়েছে।

বাংলাদেশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মূলত সৌদি আরব আর ইউএই থেকে আমদানি করে। পরিশোধিত তেল আসে সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে। এলএনজি আমদানির সিংহ ভাগ আসে কাতার ও ওমান থেকে। এমতাবস্থায় বর্তমান সংকট বাংলাদেশে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করবে সেটা সহজেই অনুমেয়। 

বর্তমানে রোজার সময় গ্যাস চাহিদা ৪ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গত ৩ মার্চ পেট্রোবাংলা সরবরাহ করেছে ২ হাজার ৬৬২ মিলিয়ন ঘনফুট। ৯৫২ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল আর এলএনজি। ধীরে ধীরে গরম বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ছে। পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা ছিল শিগগির এলএনজি সরবরাহ ১ হাজার ৫০ উন্নীত করার। পরিস্তিতির কারণে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি স্থগিত হলে বাংলাদেশ হয়তো শিগগির এলএনজি সরবরাহ ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না। সেই পরিস্থিতিতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় আসন্ন গ্রীষ্মকালে লোডশেডিং মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে ২০২৬ তাদের পরিকল্পনা ছিল মোট ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির। দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে ৪০, ওমান থেকে ১৬ এবং স্পট মার্কেট থেকে ৫৯ কার্গো আসার কথা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কাতার ওমান থেকে আমদানি কমে যাবে। আর পরিস্থিতির কারণে স্পট মার্কেট মূল্য আকাশ ছোঁয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলশ্রুতিতে সাবসিডি বাড়বে, দেনার দায় বৃদ্ধি পাবে। জানা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির আওতায় আমদানি করা ১১ কার্গো এলএনজি বাংলাদেশের পথে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। এগুলো মহেশখালী পৌঁছলে হয়তো মার্চ-এপ্রিল চাহিদা কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া যাবে।

জানা গেছে, বাংলাদেশে এখন ১ লাখ ৩৬ হাজার টন জ্বালানি তেল মজুত আছে। ২০২৬ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৮ লাখ ২০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানির অনুমোদন আছে। সৌদি আরব ও ইউএই থেকে আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিকল্প সূত্র খুঁজতে হবে। আর সুয়েজ ক্যানেল এড়িয়ে বিকল্প রুটে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে। আর অপরিশোধিত তেলের মূল্য সামাল দিয়ে কতটুকু আমদানি করা যাবে সন্দেহ আছে। বাংলাদেশকে হয়তো পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম দ্রবাদি বাড়তি মূল্যে বেশি পরিমাণে কিনে পরিস্থিতি সামাল দিতে হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে না সংঘাত অতি শিগগির শেষ হবে। আর হলেও যে ক্ষত ইতিমধ্যে হয়েছে তার জের দীর্ঘ দিন বইতে হবে সারা বিশ্বকে। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের সংগতি আরো গভীর। নতুন সরকার নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে সবে ক্ষমতায় এসেছে। এমনিতেই জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নাজুক। তার উপর মধ্য প্রাচ্যে চলমান সংকট এসেছে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন মার্চ মাসে সংকট ততটা তীব্রভাবে অনুভূত হবে না। কিন্তু বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক জ্বালানি রিজার্ভ (গ্যাস, তেল, এলএনজি, এলপিজি) না থাকায় সংকট আরো ঘনীভূত হবে। সরকার জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক দল এবং বিষয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনা করে সকল পর্যায়ে কৃচ্ছ্রসাধনের পরিকল্পনা জরুরিভাবে গ্রহণ করতে পারে। বিকল্প খুব একটা আছে মনে হয় না। সরকারি যান বাহনসমূহ চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে, দেশব্যাপী পরিকল্পিত লোডশেডিং করতে হবে এবং শিল্প কারখানাগুলোতে রুফটপ সোলার স্থাপন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। সঠিক প্রণোদনা দেয়া হলে ২০২৬ ডিসেম্বর নাগাদ ১৫০০-২০০০ মেগাওয়াট রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া যেতে পারে। আর এ সময়ের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের একটি ইউনিট উৎপাদনে আনতেই হবে। বাংলাদেশে রেল এবং সড়ক যোগাযোগ বিদ্যুৎনির্ভর করার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হলে ডিজেল ব্যবহার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। এর ফলে পরিবেশদূষণ অনেকটা কমবে আর বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ায় ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদানের দায় কমে আসবে। মনে রাখতে হবে জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট জাতীয় সমস্যা। এটি নিয়ে যেন রাজনীতি না হয়।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)