তারেক কি পারবে আ.লীগের সঙ্গে প্রতিশোধ বিরতি বজায় রাখতে


মঈনুদ্দীন নাসের , আপডেট করা হয়েছে : 11-03-2026

তারেক কি পারবে আ.লীগের সঙ্গে প্রতিশোধ বিরতি বজায় রাখতে

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০০৮ সালে যখন নির্বাসনে যাচ্ছেন ব্রিটেনে, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপির সমর্থক এক শিক্ষিকা লিখেছিলেন, তারেক জিয়ার কাতর দেহ দেখে আমার প্রাণ শিহরিত হয়েছিল, হায়রে কপাল; কিন্তু তেমন খারাপ লাগেনি কারণ নির্বাসন তার যথার্থ প্রাপ্য। তবে জিয়াউর রহমানের পুত্র কিভাবে ২০০৬ সালে কৃত্রিমতার মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে মইন ইউ আহমদের ক্রীড়নকে পরিণত করেছিল তা বোধগম্য নয়। তখন হাওয়া ভবনকে সেই পরিণতির জন্য দায়ী করেছিল মানুষ। নির্বাচনে বিএনপিকে ৩০টি আসন দিয়ে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। মইন ইউ আহমদের দেয়া অস্ত্র দিয়ে আওয়ামী লীগ বিএনপির নেতাকর্মীদের উৎখাতের ষড়যন্ত্র করে। সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে ১৫ বছর যাবৎ বিএনপিকে ধুলোয় মিটিয়ে দিতে চায়। সেখান থেকে ২০২৪ সালের ছাত্রজনতার আন্দোলন এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি আবার ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠে। ১৭ বছর নির্বাসনে কাটানোর পর তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘটে। তার আগে নির্বাচনকে ‘ইনক্লুসিভ’ করার আপ্ত শব্দ দিয়ে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কয়েকজন, সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ্জামান ও ভারত সমস্বরে আওয়াজ তোলে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের পেছনের শক্তি বিশেষ করে বিদেশি শক্তি যারা সহায়তা দিয়ে ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছে এবং নির্বাচনের আগে তার বিচার সম্পন্ন করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে সে শক্তি চাইনি যে, কোন ‘আওয়ামী লীগ ইনক্লুসিভ’ নির্বাচন হোক। যেভাবে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র ভারত ১৫ বছর যাবৎ তা চায়নি। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে থাকলে ফলাফল কি হতো সরকার কীভাবে হতো, তা বিশ্লেষণ এখন করবো না। তবে সরকারের বর্তমান রূপ যে থাকতো না তা বলা বাহুল্য।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ভারতের পত্রপত্রিকায় দুটি বিষয় নিয়ে টানা বিডিআর বিদ্রোহ পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রিপত্রিকায় লেখা হয়। তার একটি বিষয় হচ্ছে বাংলাদশের ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার। ইসলামী ব্যাংক নাকি জঙ্গিদের মদতদাতা। অথচ অধিকাংশ ইসলামী ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা আওয়ামী ঘরানার লোক। এস আলম তার মধ্যে একজন। ভারত সরাসরি ইসলামী ব্যাংক ও তারেক রহমানকে আক্রমণ করেছিল। জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে ভারতের আক্রমণ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ভারত তার নগ্ন দাঁত দেখিয়েছে বাংলাদেশের দিকে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রে সুবাতাস যখন সমুদ্র ঝড়ে উড়ে যায় তখন গণতন্ত্রের পক্ষে বার বার ঝড় উঠে। ১৯৭৫ সালের গণতন্ত্রবিরোধী অবস্থায় গণতন্ত্রের ঝড় উঠেছিল ১৯৭৯ সালে। এরপর গণতন্ত্রহীন সামরিক মহড়ায় গণতন্ত্রের ঝড় উঠেছিল ১৯৯০ সালে। তারপর ২০০১ সালে। এরপর নিভু নিভু গণতন্ত্রে ঝড় উঠেছে ২০২৪ সালে। অনেক বিএনপি নেতা যখন সে সময় দাবি করেছিলেন যে তারা মাঠে ছিলেন, তখন খালেদা জিয়া স্বয়ং বলেছিলেন ‘আপনারা বিএনপির অনেক খেয়েছেন কিন্তু এ কথা ঠিক নয় যে, আপনারা মাঠে ছিলেন।’ বিষয়টা তারেক জিয়া জানলে ভালো। না জানলে তার দুর্ভাগ্য। বিএনপির লোকেরা খালেদা জিয়ার বাসার সম্মুখ থেকে বালির ট্রাক পর্যন্ত সরায়নি। কারণ তারাই যেন ট্রাকগুলো আওয়ামী লীগকে বলে সেদিন স্তূপ করেছিল। বিএনপির ট্রাকগুলোতে আগুন জ্বালানোর শক্তি পর্যন্ত ছিল না। তারপর ছাত্র-জনতার হাতে ফ্যাসিবাদের পতন হয়। বিএনপির লোকজনও সেখানে আত্মাহুতি দেয়। মির্জা ফখরুলের বাসভবনে বৈঠক হয়; কিন্তু মাঠে নেতৃত্ব আসে না। যাক লন্ডনে ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের বৈঠকে অংক নির্ধারণ হয়। তারেক জিয়া ঘোষণা দিলেন তিনি ‘প্ল্যান’ বা পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। এখন আমরা তার বাস্তবায়ন দেখবো।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের পর ঐক্যবদ্ধ দেশ গড়ার কোন পথ দেখেনি বা দেখায়নিও। বর্তমান ১৩তম সংসদ রাজনীতির ময়দানে বলতে এক আশ্চর্য ঘটনা। যাও সম্ভব এ জীবনে দেখলাম। বাংলাদশের মুক্তিযুদ্ধের চ্যাম্পিয়ন দাবিদার আওয়ামী লীগের কেউ সংসদে নেই। তবে বিএনপি তাদেরকে জীবনদান করেছে। যেমন ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান একবার আওয়ামী লীগকে জীবনদান করেছিল। তেমনি এবার তারেক রহমানও নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের জীবন দিয়েছেন আরেকবার। আগামী দিনের আওয়ামী লীগ বলে যদি কিছু বাংলাদেশের রাজনীতিতে পতাকা ওড়ায় তা হবে তারেক জিয়ার আশীর্বাদে।

চাকরি কোটা নিয়ে যে আন্দোলন জুন ২০২৪ সালে শুরু হয়েছে তা হাসিনার অপসারণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ৩৬ দিনের গণহত্যার মতো বিষম কান্ডের বিরুদ্ধে জীবনদানের মধ্য দিয়ে। সে আন্দোলন বিশ্ববাসী দেখেছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যেমন করে মুজিব দেখেনি তেমনি ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনও তারেক জিয়া দেখেনি। তার নেতৃত্ব ও বিএনপি তেমন কার্যকরভাবে বহন করতে পারেনি। বেগম জিয়ার বর্তমানেই বিএনপির কুচক্রী নেতারা আন্দোলনের ফসল দখলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যে কারণে এনসিপি দলকে বিএনপি সঙ্গে নিতে চায়নি। এনসিপিকে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে হয়। কারণ জামায়াত আন্দোলনে থেকে জীবনবাজি রেখে যারা যুদ্ধ করেছে তাদের দেখেছে। তারা সেভাবে বুঝেছে।

২০২৪ সালের আন্দোলনের পর অনেকেই আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা ভারতকেই নিজের আশ্রয়স্থল মনে করে বারবার তাকে ক্ষমতায় ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টির জন্য রাজনৈতিক হইচই করলেও গণহত্যা নিয়ে কোনো ক্ষমা চায়নি। তাতে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমাট বাধা ছাড়া অন্যকিছু ঘটেনি। এতো লোক বিনা বিচারে, জনগণের অর্থ দিয়ে কেনা বুলেটে হত্যা করেও ফ্যাসিবাদের রক্ত পিপাসা মেটেনি। বাবার নাম ভাঙিয়ে খাবার মতো আর কোনো অবস্থারও সৃষ্টি হয়নি। মুজিবের মূর্তি, মুজিবের বাড়ির ধ্বংস হয় অবলীলায়। আর এখন এমনভাবে ইতিহাস রচনা করছে যে, সংবাদপত্রের পতনের কার্যকর শক্তিই তার জন্য দায়ী।

ড. ইউনূস যখন দায়িত্ব নেন ৮ আগস্ট তখন তার লক্ষ্য ছিল যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার যাতে ফ্যাসিবাদ নিয়ে না আসে। সামনে আসে জুলাই সনদ। এ জুলাই সনদ ফ্যাসিবাদ কায়েম না করতে পারার মূল প্রতিবন্ধকতা হবে। যাতে আবার কেউ একতরফা নির্বাচন দিয়ে ১৫ বছর থাকতে না পারে। সে জুলাই সনদ বিএনপিও সই করেছে। কিন্তু তাদের অকথিত কারণে তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচনের গণভোটে জুলাই সনদ জিতেছে। কিন্তু যেন বিএনপি হেরে গিয়েছে। 

তারেক রহমান অবশ্য অতীতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় না। যুদ্ধবিরতি চান। কিন্তু যুদ্ধবিরতির এ ‘প্ল্যান’ তারেক রহমানকে যদি সুখকর পরিস্থিতি এনে দেয়, তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু বিশ্বে ভারতীয়দের নিয়ে শঙ্কার কোনো শেষ নেই। সে কারণে তারেক কি পারবে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে?


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)