অভিনয় দক্ষতা আর ব্যক্তিত্বের দ্যুতিতে দুই বাংলাতেই এখন দারুণ জনপ্রিয় আজমেরী হক বাঁধন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমানে তিনি পার করছেন পেশাজীবনের এক সোনালি সময়। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ার ও জীবনের গভীর উপলব্ধির কথা শেয়ার করে ভক্তদের চমকে দিয়েছেন এই অভিনেত্রী। জীবনের ৪০ বসন্ত পেরিয়ে এসে আজ তিনি অনেক বেশি সাহসী, আত্মবিশ্বাসী এবং ঋজু। সংগ্রাম, প্রাপ্তি আর জীবনকে নতুন করে দেখার সেই গল্পগুলো নিয়েই দেশ পত্রিকার জন্য সাজানো হয়েছে এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি। সঙ্গে ছিলেন আলমগীর কবির।
প্রশ্ন : সাম্প্রতিক একটি পোস্টে আপনি বলেছেন, ক্যারিয়ারের দিক থেকে এটি আপনার জীবনের দ্বিতীয় সেরা বছর। এই অর্জন বা সাফল্যের অনুভূতিটাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
বাঁধন: আলহামদুলিল্লাহ, সময়টা সত্যিই দারুণ কাটছে। আসলে ‘সেরা বছর’ বলতে আমি শুধু কাজের সংখ্যা বা বাণিজ্যিক সাফল্যকে বোঝাচ্ছি না, বরং কাজের গুণগত মান এবং শিল্পী হিসেবে আমার যে তৃপ্তি সেটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছি। অনেক চড়াই-উতরাই পার করে আজ আমি এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছি, যেখানে নিজের পছন্দমতো কাজ করার স্বাধীনতা পাচ্ছি। এই যে প্রাপ্তি, এটা আমাকে মানসিকভাবে অনেক শান্তি দিচ্ছে। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে প্রতিটি দিনকে আমার কাছে নতুন এবং সম্ভাবনাময় মনে হচ্ছে।
প্রশ্ন : আপনার যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতাই কি আপনাকে আজকের এই ‘বাঁধন’ হিসেবে গড়ে তুলেছে? এই পথচলায় সুন্দর এবং কষ্টের স্মৃতিগুলো আপনাকে কতটা পরিণত করেছে?
বাঁধন: আমি বিশ্বাস করি, একজন মানুষের অতীত অভিজ্ঞতাগুলোই তার ভবিষ্যতের কারিগর। আমার জীবনের সব অভিজ্ঞতা কিন্তু সুখকর ছিল না। অনেক সময় আমাকে ভীষণ কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, অনেক ভাঙনের শব্দ আমি নিজে শুনেছি। কিন্তু আজ পেছনে তাকালে মনে হয়, সেই অন্ধকার সময়গুলো না এলে আমি আজকের এই আমি হতে পারতাম না। প্রতিটি কষ্ট আমাকে নতুন করে গড়েছে, আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে হয়। সেই অভিজ্ঞতাগুলোই আজ আমাকে মানসিকভাবে অনেক বেশি পরিণত ও শক্তিশালী করেছে।
প্রশ্ন : প্রতিকূল সময়ে টিকে থাকার জন্য আপনি আপনার ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর বিশ্বাসের কথা বলেছেন। এই তিনটি স্তম্ভ আপনার জীবনে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলেছে?
বাঁধন: এই তিনটি জিনিসই আসলে আমার টিকে থাকার মূল মন্ত্র। এমন অনেক মুহূর্ত এসেছে যখন চারপাশটা ভীষণ ক্লান্তিকর আর শ্বাসরুদ্ধকর মনে হতো। মনে হতো আর বোধহয় সামনে এগোতে পারব না। কিন্তু ঠিক সেই সময় আমার ভেতরের প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর নিজের ওপর বিশ্বাস আমাকে টেনে তুলেছে। আমি জানি, পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। আমি কখনো হাল ছাড়িনি, আর নিজের সততার ওপর বিশ্বাস রেখেছি। এই জেদটাই আমাকে প্রতিটি কঠিন মুহূর্ত জয় করতে সাহায্য করেছে।
প্রশ্ন : ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে নির্মাতাদের ওপর আপনার কৃতজ্ঞতাবোধ কেমন? একজন শিল্পী হিসেবে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ পাওয়াটা কতটা জরুরি ছিল?
বাঁধন: আমি সেইসব নির্মাতাদের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব, যারা আমার ওপর ভরসা রেখেছেন। একজন শিল্পীর জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পরিচালকের আস্থা। তাঁরা আমাকে শুধু অভিনয় করার সুযোগই দেননি, বরং শিল্পী হিসেবে আমাকে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার একটা পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের সেই বিশ্বাস না থাকলে হয়তো আমি আমার সামর্থ্যের অনেক কিছুই জানতে পারতাম না। তাঁদের এই সমর্থনই আমাকে আজ এই অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।
প্রশ্ন : ৪০ বছর বয়সের পর জীবন নিয়ে আপনার উপলব্ধি বদলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এই নতুন ‘শুরু’ বা নতুন জীবনদর্শন নিয়ে কিছু বলুন।
বাঁধন: একটা সময় ছিল যখন বয়সের সংখ্যা নিয়ে অনেক দ্বিধা কাজ করত। কিন্তু ৪০ পার হওয়ার পর আমার মনে হচ্ছে, এটা যেন জীবনের এক নতুন এবং শক্তিশালী শুরু। এখন আমি অনেক বেশি নির্ভীক, অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। জীবনকে এখন আমি অনেক গভীর থেকে দেখতে পারি। আমার কাছে এখন মনে হয়, জীবনকে পুরোপুরি অনুভব করা আর প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করাই আসল কথা। বয়সের এই ধাপটা আমাকে শিখিয়েছে ভয় না পেয়ে নিজের শর্তে জীবনকে ভালোবাসতে।
প্রশ্ন : নিজেকে যে কথা দিয়েছেন ‘পুরোপুরি বাঁচবেন এবং গভীরভাবে অনুভব করবেন’ ভবিষ্যৎ জীবনে এই সংকল্প ধরে রাখার পরিকল্পনা কী?
বাঁধন: আমি নিজেকে কথা দিয়েছি যে, সামনের দিনগুলোতে আমি প্রতিটি মুহূর্ত বাঁচব। জীবন অনেক ছোট, তাই কোনো কৃত্রিমতা বা চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আমি নিজের আনন্দকে বিসর্জন দিতে চাই না। আমি প্রতিটি আবেগকে গভীরভাবে অনুভব করতে চাই, হোক সেটা আনন্দ কিংবা বেদনা। কাজের ক্ষেত্রে হোক বা ব্যক্তিগত জীবনে আমি সৎ থাকতে চাই। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে জীবনের প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে বাঁচার এই সংকল্পই আমার আগামীর পথচলা।