রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ ঘিরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তুলকালাম কাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারো কারো মতে, এই রাষ্ট্রপতিকে কেবল ফ্যাসিবাদের দোসর বা দালাল বলে অভিহিত করো বিরোধীতাকারীরা আর কিছু অর্জন হয়েছে কি-না সেব্যাপারে সন্দিহান অনেকে। তারা এই রাষ্ট্রপতিক ভাষণ না শুনেই বিভিন্ন ধরনের কর্মকান্ডকে অনভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন বলে কেউ কেউ মনে করেন। কারণ আওয়ামী লীগ আমলের নিয়োগ পাওয়া এই রাষ্ট্রপতি বিএনপি আমলে কিভাবে অন্যসুরে কথা বললেন? আর এমন রাষ্ট্রপতি দিয়ে যে তার ভাষণের বিরোধীতাকারীরা কিছুই করতে পারবে না তাও তারা ঘুণাক্ষরে বুঝলেন না। কারো কারো অভিমত, সংসদীয় রাজনীতির এই কাঠামোতে তৈরি হওয়া রাষ্ট্রপতির বিরোধী করে কার ঘরে এর বেনিফিট নেওয়া হলো তা সময় বলে দেবে।
কি হয়েছে সংসদে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ ঘিরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল সংসদের প্রথম অধিবেশনে। রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রত্যাখ্যান করে প্রায় পাঁচ মিনিট বিক্ষোভের পর সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউটও করে ফেলেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা গেলো স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতিকে ভাষণের জন্য সংসদে আমন্ত্রণ জানালে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম কিছু বলার জন্য স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। স্পিকার মাইক না দিলে নাহিদ ইসলাম দাঁড়িয়ে বলেন, ‘কিলার ইন দা পার্লামেন্ট!’ তিনি ‘নো, নো’ বলে প্রতিবাদ জানান। এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় সব সদস্য নানা বক্তব্য দিয়ে তৈরি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। তখন বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে শুধু জামায়াতের আমির তাঁর আসনে বসে ছিলেন। স্পিকার বিরোধীদলীয় সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁরা বিক্ষোভ দেখাতেই থাকেন।
একপর্যায়ে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ‘কিলার চুপ্পু, বয়কট চুপ্পু’ বলে শ্লোগান দেন। এই হৈ চৈর মধ্যেই রাষ্ট্রপতি সংসদে স্পিকারের আসনের পাশে আসেন। স্পিকার তাঁকে চেয়ারে বসার অনুরোধ জানান। তখনো বিক্ষোভ চলছিল। একপর্যায়ে স্পিকার রাষ্ট্রপতিকে তাঁর ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ জানান।
তবে এনসিপির নেতারা রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে এমন বিক্ষোভ দেখালেও তিনি ভাষণ দিতে দাঁড়ালে তখন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের দাঁড়িয়ে দেওয়া বক্তব্য অনেকের কাছে রহস্যজনক ঠেকেছে। যেখানে এনসিপির নেতারা ওই ভাষায় রাষ্ট্রপতিকে তিরষ্কার করে যাচ্ছেন তখন শফিকুর রহমান বলে বসেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনি রাষ্ট্রের অভিভাবক ছিলেন। কিন্তু আপনি সেই অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। আপনি ফ্যাসিবাদের দোসরের ভূমিকা পালন করেছেন। অন্য সংসদ সদস্যরা ‘গেট আউট, গেট আউট’ বলে শ্লোগান দেন। এ পরিস্থিতিতে কিছু সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিরোধী দলের সদস্যরা ‘ফ্যাসিবাদের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘স্বৈরাচারের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘ফ্যাসিবাদ আর গণতন্ত্র, একসাথে চলে না’ ইত্যাদি শ্লোগান দেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণ শুরু করেন। তখন বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি দলের সদস্যদের দিকে তাকিয়ে ‘লজ্জা লজ্জা’ হলে বিদ্রুপ করেন। প্রশ্ন হচ্ছে এই রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শোনার পরে কি বলা যাবে তিনি এখন ফ্যাসিবাদের দোসর? কারণ রাষ্ট্রপতি তো তাঁর ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। শেখ মুজিবুর রহমান বা অন্য কোনো নেতার নাম বলেননি। বরং বলেছেন, এরা মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা ‘সকল নেতা’। অথচ এই রাষ্ট্রপতি ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি অন্যরকম ভাষণ দিয়েছেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী ভাষণে বিএনপি ও এর সহযোগীদের দেশবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। সেবার তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে অভিহিত করে ষড়যন্ত্র ও গুজব রটনাকারীদের সম্পর্কে সজাগ থাকতে বলেছিলেন দেশবাসীকে। তা-হলে এই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে বা পক্ষে বলে কি কোনো লাভ ঘরে তুলতে পেরেছেন বিরোধী দলের নেতারা? মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির পক্ষের এই রাষ্ট্রপতি-তো বিগত সংসদ ও বর্তমান সংসদের মধ্যকার সময়ে যেসব সাবেক জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রয়াত হয়েছেন, তাঁদের স্মরণে আনা শোক প্রস্তাবকে মেনে নিয়েছেন। এর বিরুদ্ধে-তো তার কোনো বক্তব্যই নেই। কেননা ওই শোক প্রস্তাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও জুলাই শহীদদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ আমলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দন্ডিত ব্যক্তিদের নামও আছে। এসব নিয়ে তার বক্তব্যে তো কোনো আপত্তি লক্ষ্য করা যায়নি। বরং রাষ্ট্রপতির প্রতি ঘৃণা দেখাতে গিয়ে জাতীয় সংগীত বাজানোর মুহূর্তের পরিস্থিতি নিয়ে অন্যরকম আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেননা জাতীয় সংগীত বাজানোর মুহূর্তে যেভাবে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের একাংশ নিজ নিজ আসনে বসে ছিলেন বলা হচ্ছে যা বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণকে অন্য মেসেজ দেওয়া হয়ে গেছে। যদিও পরবর্তীতে বলা হয়েছে যে, ওই সময় কারিগরি ত্রুটির কারণে তাঁরা জাতীয় সংগীত বাজানোর বিষয়টি শুনতে পাননি। যদিও পরবর্তী মুহূর্তে তাঁরা দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছিলেন। কিন্তু এননিপি-জামায়াতের ইমেজের যা হবার তা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। মাঝখানে রাজনৈতিক ইমেজের ক্ষেত্রে জুলাই বিপ্লবীদেরও জামায়াতের কাতারে চলে যেতে হলো বলে কারো কারো অভিমত। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু করেন, তখন রেওয়াজ ভেঙ্গে সমস্বরে প্ল্যাকার্ড নিয়ে যে প্রতিবাদ করেছেন তাকে অসৌজন্যমূলক বলেও মনে করছেন কেউ কেই। এমন আনাড়ি কর্মকান্ডের পেছনে যারা রয়েছে তারা কি ভবিষ্যতে এর দায়ভার নেবেন? তাছাড়া এটা সবাই জানেন কোনো রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে নিজের মতামতকে প্রাধান্য নিয়ে বক্তব্য রাখতে পারেন না। এটা রেওয়াজ। কিন্তু এমন রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কারো কোনো বক্তব্য নেই, নেই দিক নির্দেশনা। তাহলে শুধু মো. সাহাবুদ্দিন নামের এই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে সংসদে তুলকালাম করে কার পাল্লা ভারী করা হলো? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে। বিষয়গুলো এনসিপির জন্য ক্ষতিকর হয়েছে বলে কারো কারো অভিমত। প্রশ্ন উঠতে পারে সংসদের ভেতরে বাইরে এনসিপি আসলে কার উদ্দেশ্য লক্ষ্য বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে? জুলাই বিপ্লবীদের আদর্শ না অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই তাদের সব কর্মকান্ড?
অথচ এ-ই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন যখন ফ্যাসিবাদী সরকারের কথা বলছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপির সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন করে আসল রাজনৈতিক চাল ঠিকই চেলে দিলেন। আর তখন দেখা গেলো জামায়াত ও এনসিপি ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যাচ্ছে।