সব কুশীলব গোয়েন্দা জালে, উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য


বিশেষ প্রতিনিধি , আপডেট করা হয়েছে : 01-04-2026

সব কুশীলব গোয়েন্দা জালে, উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

গোয়েন্দা জালে ওয়ান-ইলেভেনের সব কুশীলব। আপাতত সেখানে রেখেই যাচাই-বাছাই হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের। সত্যতা মিললে গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে তাদের। এরই অংশ হিসেবে গত ২৯ মার্চ রাতে রাজধানীর ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আফজাল নাছেরকে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের নির্দেশে তাকে নেওয়া হয়েছে ছয় দিনের রিমান্ডে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওয়ান-ইলেভেন এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের সময় গুম, খুন, জোরপূর্বক অর্থ আদায় এবং প্রতারণার অভিযোগে আরো একডজন কর্মকর্তাকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তথ্য যাচাইয়ের জন্য ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত অনেক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। প্রয়োজনে তাদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে নিশ্চিত করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ সূত্র।

সূত্র বলছে, একডজন কর্মকর্তার অনেকেই বর্তমানে দুবাই, আমেরিকা, কানাডা, মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। তবে তাদের ফেরানোর জন্য ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্নার থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।

সূত্র আরো বলছে, ওয়ান-ইলেভেনের সময় মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিনের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন তৎকালীন মেজর সুলতানুজ্জামান সালেহ। শুরুতে তাকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরে (ডিজিএফআই) অ্যাটাচমেন্টে নিয়ে আসেন মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন। ‘জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা হয়। তিনি সারা দেশে ব্যাটালিয়ন অধিনায়কদের সঙ্গে অপারেশন সমন্বয় করতেন। অনেক ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও সমন্বয় করতেন তিনি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর তিনি ডিজিএফআইতে সিটিআইবির কর্নেল ‘জিএস’ হিসেবে পদোন্নতি পান। সবশেষ মেজর জেনারেল হয়ে অবসরে যান। ইভিএম মেশিন কেলেঙ্কারিসহ নানা গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে সালেহর বিরুদ্ধে।

সূত্রের দাবি, ওয়ান-ইলেভেনের সময় গ্রেফতার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, এটিএম আমিন এবং গ্রেফতার মামুন খালেদ অন্তত ছয়জন কর্মকর্তাকে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ডিজিএফআইতে অ্যাটাচমেন্টে নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার আসামি কর্নেল মাহফুজের দুই সন্তানও ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮-এর ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের আগে স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্টের জন্য তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার মামুন খালেদকে আনসার বাহিনীতে পদায়ন করা হয়। নীলনকশার নির্বাচনের জন্য দেওয়া বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট বাস্তবায়ন করেন তিনি। জানা গেছে, ওয়ান-ইলেভেনের নেপথ্য কারিগর এবং পরবর্তী নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত দেড় ডজন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। এ তালিকায় সশস্ত্র বাহিনীর চার বাহিনী প্রধানের নাম রয়েছে। তারা ওয়ান-ইলেভেনে দেশকে বিরাজনীতির দিকে ঠেলে দিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে ছিলেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে থাকা গ্রেফতার দুজন সাবেক লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং শেখ মামুন খালেদ এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টদের।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, মাসুদ এবং মামুন নানা কৌশল করে অনেক কিছুই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে তাদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদায় করা গেছে। এগুলোর সত্যতা যাচাইবাছাই করা হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আফজাল নাছের অনেক কিছুর সঙ্গেই জড়িত ছিলেন। আদালতের নির্দেশে মাত্র রিমান্ডে আনা হলো। যেহেতু তিনি অনেক কিছুর সাক্ষী, তাই তার কাছ থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।

খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা নিতে দেননি নাছের

খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেননি ডিজিএফআইর সাবেক পরিচালক, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) মো. আফজাল নাছের। আদালতে রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক এই তথ্য তুলে ধরে বলেন, আফজাল নাছের ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ে কর্মরত ছিলেন। মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের আমলে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ব্যবসায়ীদের অত্যাচার করেছিল। বিশেষ করে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আবদুল আউয়াল মিন্টু, লুৎফুজ্জামান বাবর, মোসাদ্দেক আলী ফালুকে মিথ্যাচার করে গ্রেফতারের টিমে ছিলেন আফজাল নাছের। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা টিমের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের পর অত্যাচার করেও জিঘাংসা শেষ হয়নি ফ্যাসিস্ট হাসিনার। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে জেলে আটকে রেখে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তাকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়নি। নিরুপায় হয়ে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তবে ইউনাইটেড গ্রুপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি (নাছের) খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা নিতে দেননি। সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হয়েও নাছের নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। তিনি ফ্যাসিস্ট হাসিনার সহযোগী ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হাসিনাকে রক্ষা করার জন্য কাজ করেছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তার সাত দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করেছি। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে জুলাই আন্দোলনের সময় দেলোয়ার হত্যা মামলায় আফজাল নাছেরকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদনের শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী হেলাল উদ্দিন রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন প্রার্থনা করেন। দেলোয়ার হত্যা মামলার নথিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর ফলপট্টি এলাকায় ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় আওয়ামী লীগের ৫০০-৭০০ নেতাকর্মী। এ সময় অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদের নির্দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। তাতে গুলিবিদ্ধ হন দেলোয়ার হোসেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২১ জুলাই শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

মইন ইউকে রাষ্ট্রপতি করার শর্তে রাজি হন শেখ হাসিনা

সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদকে রাষ্ট্রপতি করার শর্তে রাজি হন শেখ হাসিনা। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ড বৈধতা দেওয়ার বিষয়েও একমত পোষণ করেন তিনি। এ ব্যাপারে রাজধানীর একটি আবাসিক এলাকার সেফহোমে কারাবন্দি শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকেও অংশ নেন মইন ইউ আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তিনজন সদস্য, একটি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্তাব্যক্তি। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে রিমান্ডে থাকা সাবেক দুই লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে এসব বিষয় জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র বলছেন, শুধু দুই বছর নয়, মাইনাস টু ফর্মুলার মাধ্যমে অন্তত টানা ১০ বছরের ক্ষমতায় থাকার টার্গেট ছিল ওয়ান-ইলেভেন কুশীলবদের। সে পথেই এগোচ্ছিলেন তাঁরা। তবে অতিমাত্রায় দমনপীড়ন, রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একের পর এক ঘটনায় দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যেতে থাকে কলকারখানা। সবশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সঙ্গে সেনাসদস্যদের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় কুশীলবদের সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

লে. জেনারেল মামুন খালেদের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের পুরোটা সময় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের পার্ট দেখভাল করতেন মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন। বিএনপির অংশ দেখতেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ফজলুল বারী। শুরুর চার-পাঁচ মাস এভাবে চললেও একপর্যায়ে সবকিছুই সমন্বয় করতে শুরু করেন এ টি এম আমিন। গুরুত্বহীন হয়ে পড়েন বারী। শেখ হাসিনাও তাঁর কমিটমেন্ট থেকে সরে যান। তবে সেইফ এক্সিট দেন মইন ইউ আহমেদকে।’

সূত্র বলছেন, ওয়ান-ইলেভেন শুরুর কিছুদিন পরই এ টি এম আমিনের হয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু করেন মামুন খালেদ। বাড়ি গোপালগঞ্জ হওয়ায় শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। মামুনের হয়ে কাজ করতেন লে. কর্নেল (বরখাস্ত) আবজাল নাছের। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি চাকরি থেকে বহিষ্কৃত হন। পরে নিজেকে আওয়ামী লীগ প্রমাণে উঠেপড়ে লাগেন আবজাল। বেগম খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা না দেওয়ার নেপথ্যেও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

অন্যদিকে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার জন্য মামুন খালেদ তাঁর ওপর অর্পিত বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট সুচারুভাবে বাস্তবায়নও করেন। প্রতিদান হিসেবে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক হন তিনি। বিডিআর হত্যাকাণ্ডসহ অনেক ঘটনায় নেপথ্য নায়কের ভূমিকা পালন করেন। যাবতীয় শর্ত চূড়ান্ত করার জন্য নির্বাচনের তিন মাস আগে সংসদ ভবন এলাকার বিশেষ জেল থেকে শেখ হাসিনাকে বের করে নেওয়া হয় সন্ধ্যা ৭টার দিকে। টানা আড়াই ঘণ্টা বৈঠক এ টি এম আমিন পরিচালনা করলেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন মামুন খালেদ। রাত সাড়ে ১০টার দিকে শেখ হাসিনাকে পুনরায় রেখে আসা হয় সাবজেলে।

সূত্র আরও বলছেন, ওয়ান-ইলেভেনে মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিনের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন তৎকালীন মেজর সুলতানুজ্জামান সালেহ। শুরুতে তাঁকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরে (ডিজিএফআই) অ্যাটাচমেন্টে নিয়ে আসেন মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন। ‘জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা হয়। তিনি সারা দেশে ব্যাটালিয়ন অধিনায়কদের সঙ্গে অপারেশন সমন্বয় করতেন। অনেক ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও সমন্বয় করতেন তিনি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর তিনি ডিজিএফআইতে সিটিআইবির কর্নেল ‘জিএস’ হিসেবে পদোন্নতি পান। সবশেষ মেজর জেনারেল হয়ে অবসরে যান। ইভিএম কেলেঙ্কারিসহ নানান গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে সালেহর বিরুদ্ধে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্মকমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো খোলাসা হয়নি। এজন্য জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের নির্দেশে মামুন খালেদকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, আবজাল নাছের দেশের অনেক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সাক্ষী ছিলেন। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে।’

গোয়েন্দাদের জেরার মুখে মাসুদ ও খালেদের মুখে অনেকের নাম বেরিয়ে এসেছে। গ্রেপ্তার সাবেক দুই কর্মকর্তা নিজেদের অপরাধ স্বীকার না করে দোষ দিচ্ছেন সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ এবং সাবেক ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল এটিএম আমিনের ওপর। মামুন খালেদ দাবি করেছেন, মইন ইউ আহমেদ নির্দেশ দিতেন এটিএম আমিনকে। আমিন ওই সময় ডিজিএফআইতে কর্মরত কর্মকর্তাদের বাধ্য করেছিলেন তার আদেশ বাস্তবায়ন করতে। যদিও সবকিছুর কলকাঠি নেড়েছেন মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন এবং লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তবে বহুল আলোচিত চরিত্র জেনারেল (অব.) মইন ইউ আহমেদ অধিনায়কের ভূমিকায় থাকলেও তাকে সার্বিক সহায়তা করেছেন তৎকালীন বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) শাহ মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান এবং নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস এডমিরাল (অব.) সরওয়ার জাহান নিজাম। এক-এগারোর পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধান হয়েছিলেন জেনারেল আবদুল মুবীন। তিনি ২০০৯ সালের ১৫ই জুন থেকে ২০১২ সালের ২৪শে জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

তার সময়েই ২০১০ সালের ১৩ই নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াকে শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ওই সময় বাড়ি ভাঙার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের আস্থাভাজন তৎকালীন ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের এক্সিকিউটিভ অফিসার নাজমুছ সাদাত সেলিম।

২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি সেনাবাহিনীর একটি অংশের সমর্থনে ওই সময় গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়েছিলেন ফখরুদ্দীন আহমেদ। তবে ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। পরবর্তী সময়ে তদন্তসহ সব ঝামেলা এড়াতেই আওয়ামী লীগের সহায়তায় নির্বাসিত জীবন বেছে নিয়েছেন এক-এগারোর অনেক কুশীলব। ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ নাগরিকত্ব নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। গ্রেপ্তার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী অবশ্য দেশে অবস্থান করছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে সামরিক অ্যাটাশে হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার আরেক আলোচিত কর্মকর্তা ব্রি. জে. (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী। গণতান্ত্রিক সরকারের জমানায় এক-এগারোর ঘটনাবলির তদন্তের প্রয়োজনে তাকে ডাকা হলেও আর দেশে ফেরেননি। এর পর থেকেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে। এক-এগারোর সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন ব্রি. জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন। বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।

সূত্র বলছেন, গোয়েন্দা চ্যানেলে তাকে দেশে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের আরেক ক্ষমতাধর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) সাঈদ জোয়ার্দার দুবাই-কানাডা যাওয়া-আসার মধ্যে আছেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী এক-এগারো সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ এবং একের পর এক মামলা করে আলোচনায় ছিল দুদক। তিনি এখন কোথায় আছেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে একটি সূত্র জানায় তিনি নিউজিল্যান্ডে রয়েছেন। সেখানে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও রয়েছেন। এ ছাড়া ওই সময়ের আলোচিত ও বিতর্কিত আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন; যাদের মধ্যে অনেকেই এখন দেশে আছেন বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ধারণা করছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সেনাসমর্থিত এক-এগারোর সরকার গঠনের আগে প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেয়া হয়। ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি বঙ্গভবনে এই পদত্যাগ করানোর মিশনে অংশ নেন সশস্ত্র বাহিনীর তৎকালীন প্রভাবশালী ছয় কর্মকর্তা। এরপর থেকেই দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। পদত্যাগ করানোর জন্য বঙ্গ ভবনে গিয়েছিলেন তিন বাহিনীর প্রধান, ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রিমান্ডে নির্যাতনের বিষয়ে মাসুদ রিমান্ডে বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে একেবারেই জানতেন না। পরদিন টিভিতে দেখে বিস্মিত হন। তখন তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের নির্দেশে ডিজিএফআই-এর কিছু কর্মকর্তা ওই টর্চারে ভূমিকা রাখেন।

সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমেদকে ১/১১ সরকারের প্রধান হিসেবে মনোনীত করার বিষয়ে মাসুদ বলেন, প্রথমে ড. ইউনূসকে সরকারপ্রধান হওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। ওই প্রস্তাব নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে যান মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও তৎকালীন ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী। কিন্তু তিনি সে প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তারা যান ফখরুদ্দীনের কাছে। পরে তিনি রাজি হয়ে যান। গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, মোসাদ্দেক আলী ফালু, নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু এবং হাজী সেলিমসহ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র প্রভাবশালীদের গ্রেপ্তারে ২০০৭ সালের ১২ই জানুয়ারি থেকে যৌথ অভিযান শুরু হয়। সেখানে তার ভূমিকা কী ছিল জানতে চাইলে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, তিনি গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির মুখ্য সমন্বয়ক ছিলেন। তবে গ্রেপ্তারের তালিকা তিনি করেননি। উচ্চপর্যায়ের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালিত হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ প্রধান দু’দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার নিয়ে বলেন, তিনি আদেশ পালন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন। গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হিসেবে তাকে গ্রেপ্তারের অনুমোদন দিতে হতো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিটি সেক্টর ধরে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তবে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনী মিলে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিতো। সংসদ ভবনের বিশেষ কারাগারে এসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে দরকষাকষি নিয়ে গোয়েন্দা বলেন, সাবজেল থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে একজন মেজর শেখ হাসিনাকে বের করে নিয়ে যেতেন এমন তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। তাকে নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে করা গোপন বৈঠকে সেনাবাহিনীর সদস্য ছাড়াও এক-এগারো সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা অংশ নিতেন। রাষ্ট্র ক্ষমতায় শেখ হাসিনাকে কীভাবে আনা হবে সেসব বিষয়ে দেনদরবার হতো ওইসব বৈঠকে। শেখ হাসিনাকে নিয়ে বৈঠক করতে দেয়া হলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে বের হতে দেয়া হতো না।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী রিমান্ডে জানিয়েছেন, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনেক দূর এগিয়েও গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত নানা বাধার কারণে রাষ্ট্রপতি হতে পারেননি। তবে তিনি গোপনে নানা প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেননি নানা কারণে। মইন ইউ আহমেদের কারণে তাকে সেনাবাহিনী থেকে বেরিয়ে যেতে হয় বলেও জানিয়েছেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। মইন ইউ আহমেদ সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ দুই বছরেরও বেশি সময় দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এক-এগারো সরকারের শেষ বছরে এসে সেনাবাহিনীর বেশির ভাগ জেনারেল ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার বিপক্ষে ছিলেন। এমন একটা পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রক্ষমতায় সেনাবাহিনীর থাকা উচিত কিনা এ নিয়ে ভোটাভুটি হয়েছিল সেনাবাহিনীতে। তখন সেনাবাহিনীর বেশির ভাগ জেনারেল মইন ইউ আহমেদকে রাজনীতিবিদদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে দেয়ার অনুরোধ জানান। এ ছাড়া দুই নেত্রীকে কারামুক্ত করার পক্ষে মত দেন। একটি প্রভাবশালী দেশের পক্ষ থেকেও বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য সেনাপ্রধানকে চাপ দিয়েছিল।

ফের রিমান্ডে মামুন খালেদ : বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজধানীর মিরপুর থানার দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদের ফের ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গত ৩০ মার্চ এ মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে তাঁকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। আসামি পক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিলপূর্বক জামিন চেয়ে শুনানি করেন। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. জুয়েল রানা ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম রাজধানীর মিরপুরে অভিযান চালিয়ে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)