সুপ্রিম কোর্টে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে শুনানি শুরু


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 01-04-2026

সুপ্রিম কোর্টে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে শুনানি শুরু

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ১ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মসূত্রভিত্তিক নাগরিকত্ব বন্ধ করার বিতর্কিত নির্বাহী আদেশের বৈধতার ওপর শুনানি শুরু করেছে। এ শুনানি ট্রাম্প প্রশাসনের ইমিগ্রেশন নীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং এটি প্রথমবার যে উচ্চ আদালত কোনো দায়িত্বরত প্রেসিডেন্ট ইমিগ্রেশন নীতির বৈধতা সরাসরি বিচার করবে। মামলার মূল প্রশ্ন হলো, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ কি ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারা এবং সেই ধারা সংরক্ষিত ফেডারেল আইনের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করছে কি না।

১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারা বলে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ বা নাগরিকত্বপ্রাপ্ত সকল ব্যক্তি, যারা এখানকার প্রশাসনিক অধীনে আসে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের এবং যেখানে তারা বসবাস করে সে রাজ্যের নাগরিক। এ ধারা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা নাগরিকত্বপ্রাপ্ত সকলকে দেশের নাগরিক হিসেবে গণ্য করে, তবে কয়েকটি সীমিত ব্যতিক্রম রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথম দিনেই জন্মসূত্র ভিত্তিক নাগরিকত্বের ওপর একটি নির্বাহী আদেশ স্বাক্ষর করেন। আদেশটি নির্ধারণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুরা যদি কোনো অভিভাবক দেশে অবৈধভাবে থাকে অথবা যারা নাগরিক বা স্থায়ী অধিবাসী নয়, তাহলে তাদের নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে না। এছাড়াও যদি মা আইনসিদ্ধ অস্থায়ী স্থিতিতে থাকেন এবং পিতা নাগরিক বা স্থায়ী অধিবাসী না হন, তাদের শিশুদেরও নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে না। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দেয়, ১৪তম সংশোধনী কখনও সর্বজনীনভাবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব প্রদানের ব্যাখ্যা দেয়নি। তারা বলেন, যারা আইনগতভাবে দেশের অধীনে নয়, তাদের সন্তানদের নাগরিকত্ব দেওয়া আইনগতভাবে বৈধ নয়। আদেশ কার্যকর হলে, ৩০ দিনের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের নাগরিকত্ব প্রদান থেকে ফেডারেল সংস্থাগুলো বিরত থাকবে। তবে আদেশটি এখনো কার্যকর হয়নি, কারণ স্বাক্ষরের পরই এটি নিম্ন আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং বিচারকরা তা ব্লক করেছেন।

গত বছর জুনে, সর্বোচ্চ আদালত একটি মামলায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যাতে ন্যায়বিচারকরা জাতীয় নিষেধাজ্ঞা বা আদেশ জারি করার ক্ষমতা সীমিত করা হয়। এরপর আমেরিকান সিভিল লিবারটিজ ইউনিয়ন এবং অন্যান্য সংস্থা একটি ক্লাসে অ্যাকশন মামলা দায়ের করে। মামলায় তিনজন শিশুর পক্ষে দাবি করা হয়, যাদের জন্মের পর ট্রাম্প প্রশাসনের আদেশের কারণে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হতে পারত।

নিউ হ্যাম্পশায়ারের জেলা বিচারক জোসেফ লাপলান্ট শিশুদের পক্ষ থেকে এ ক্লাস মান্যতা প্রদান করেন এবং প্রশাসনকে আদেশ কার্যকর করতে বাধা দেন। ট্রাম্প প্রশাসন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রথম সার্কিট কোর্টে আপিল করে এবং একই সঙ্গে সর্বোচ্চ আদালতকে সরাসরি মামলাটি গ্রহণ করার জন্য আবেদন জানায়। সর্বোচ্চ আদালত ডিসেম্বর ২০২৫-এ মামলাটি গ্রহণের সিদ্ধান্ত দেয়।

জন্মসূত্রভিত্তিক নাগরিকত্বের বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতের বিচার শতাব্দী আগে হয়েছে। ১৮৯৮ সালে ইউনাইটেড স্টেটস বনাম ওয়ং কিম আর্ক মামলায় আদালত স্থির করে যে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী শিশু, যাদের পিতা-মাতা বিদেশি নাগরিক হলেও যদি তারা স্থায়ীভাবে দেশের অধীনে থাকে, তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত। ওয়ং কিম আর্ক ক্যালিফোর্নিয়ায় ১৮৭৩ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতামাতা চীনের নাগরিক ছিলেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতেন। ১৮৯৪ সালে তিনি চীনে যান এবং ১৮৯৫ সালে দেশে ফিরে আসার সময় তাকে নাগরিকত্ব না থাকার কারণে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। সর্বোচ্চ আদালত সিদ্ধান্তে উল্লেখ করে যে, ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী, যারা দেশের স্থায়ী অধীনে জন্মগ্রহণ করে, তারা নাগরিক। আদালত তখন ৬-২ সিদ্ধান্তে ওয়ং কিম আর্ককে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

প্রশাসন আদালতে যুক্তি দেয়, ১৪তম সংশোধনী সেই শিশুদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে না যারা অভিভাবক দেশের মধ্যে অবৈধভাবে বা অস্থায়ীভাবে থাকে। অভিভাবকরা যারা ভিসা ওয়ার্কার, স্টুডেন্ট বা ভিসা ওয়েজার প্রোগ্রামের মাধ্যমে আছেন, তাদের শিশুদের নাগরিকত্ব হওয়া উচিত নয়। এই আইন "সম্পূর্ণভাবে দেশের প্রশাসনিক অধীনে" থাকা ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য। প্রশাসনের যুক্তি, জন্মসূত্র ভিত্তিক নাগরিকত্ব ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং এটি অনুপ্রবেশকে উস্কে দেয়।

আমেরিকান সিভিল লিবারটিজ ইউনিয়নও শিশুদের পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী, শিশুরা জন্মসূত্রে নাগরিক হয়, পিতামাতার অভিবাসন অবস্থা, দেশীয়তা বা বাসস্থানের নির্বিশেষে। তারা উল্লেখ করেন যে, ইংরেজি সাধারণ আইন অনুযায়ী জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হয়। পলেন্টিফরা বলেন, ‘সরকার জাতির সংবিধানগত ভিত্তি পুনর্গঠন করতে চাইছে। এই আদেশ যদি মান্য হয়, তবে কোটি কোটি আমেরিকান নাগরিকত্ব হারাতে পারেন।’ তারা ১৮৪৪ সালের লিঞ্চ বনাম ক্লার্ক মামলার উদাহরণ দেন, যেখানে নিউ ইয়র্কে জন্মানো শিশুর নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হয়। ১৮৫৪ সালে ওয়ং কিম আর্ক মামলার মাধ্যমে আদালত জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে, যা ১২৮ বছর ধরে প্রচলিত।

সর্বোচ্চ আদালত আদেশকে বৈধ বা অবৈধ ঘোষণা করতে পারে। যদি আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের বিপক্ষে রায় দেয়, তবে আদেশ ফেডারেল ইমিগ্রেশন আইনের বিরুদ্ধে ধরা হতে পারে। যদি আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ সমর্থন করে, তবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাচ্ছেনা এমন শিশুদের জন্য আদেশ কার্যকর হবে। প্রশাসনের দাবি, এটি প্রোস্পেকটিভ অর্থাৎ আদেশ কার্যকর হওয়ার ৩০ দিনের পর জন্ম হওয়া শিশুদের জন্য প্রযোজ্য।

যদি আদেশ কার্যকর হয়, কোটি কোটি শিশু এবং তাদের পরিবার নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তারা ভোট দিতে পারবে না, পাসপোর্ট পাবেন না এবং নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। ২০০-এরও বেশি ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য বলেন, মিলিয়ন মিলিয়ন আমেরিকান নাগরিকতা হারাতে পারেন। সর্বোচ্চ আদালতের রায় শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের জন্মসূত্র ভিত্তিক নাগরিকত্ব নীতি নির্ধারণ করবে না, এটি ভবিষ্যতের অভিবাসন নীতি, শিশু নাগরিকত্ব এবং সংবিধানগত অধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে। এ মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের মূলনীতি, সংবিধান ও অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করবে।

সর্বশেষ ২০২৬ সালের রায়ের জন্য সকলের নজর কেন্দ্রীভূত, কারণ এটি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও সংবিধানগত ব্যাখ্যার উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)