জ্বালানি সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ?


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 01-04-2026

জ্বালানি সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ?

৩১ মার্চ মঙ্গলবার সরকারের নীতি নির্ধারকের একটা অংশ আলোচনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে দেশের বিশেষ করে মেট্রোপলিটন এলাকায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সপ্তাহের অর্ধেকটা অনলাইনে ক্লাশ হবে। বাকিটা অফলাইনে। তবে সরকারি ঘোষণা এখনও হয়নি। তবে হয়ে যাবে সহসাই। বিগত করোনাকালীন সময়ে অনলাইনে ক্লাশ করে চরম ভোগান্তিতে পরে শিক্ষার্থীরা। সেই রেশ বয়ে বেড়াচ্ছেন এখনও সেই সময়ের অনেক শিক্ষার্থী। এবার ওইসব জেনে বুঝেও সরকার সপ্তাহের একটা সময়ে অনলাইনে ক্লাশ নিতে নির্দেশনা প্রদান বার্তা দেয় দেশের জ্বালানি সেক্টর কতটা নাজুক অবস্থানে। 

ইতিমধ্যে এর প্রভাবও পড়তে বসেছে। ঢাকার পেট্রোলপাম্পগুলো কখনই ফাঁকা দেখা যায় না। দীর্ঘ লাইন প্রতিনিয়ত। এ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা দেয়া হয়েছে। রাজধানীতে গণপরিবহন অনেকটাই কমে গেছে। সঙ্কট আসন্ন বলে মনে হচ্ছে। 

এমন প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে সংঘাত এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের প্রভাবে ছড়িয়ে পড়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশ প্রথম বড় ক্ষতিগ্রস্ত দেশে পরিণত হতে পারে। এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। সংবাদ মাধ্যমটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেল ও গ্যাসের মারাত্মক ঘাটতির মুখে পড়তে পারে।

ঢাকায় টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে জ্বালানি রেশনিং চললেও সরকার এখনো কার্যকর পরিকল্পনা দাঁড় করাতে হিমশিম খাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে এবং জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

তবে সংকট শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালি অবরোধের ফলে ভারতের শিল্প উৎপাদন কমে গেছে। একই সময়ে ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে জ্বালানি রেশনিং শুরু হয়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়া জনসাধারণের জ্বালানি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপের কথা বিবেচনা করছে। কিছু দেশ বাধ্য হয়ে চীনের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির জন্য আলোচনা শুরু করেছে, যেখানে বেইজিং এই সংকটকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে যুক্তরাজ্যেও দুই সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এ বাংলাদেশই প্রথম বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং এলএনজির প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ায় যায়, যার ওপর বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ তার তেল ও গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে, যার দুই-তৃতীয়াংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকসহ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। টেলিগ্রাফ বলছে, চলতি মাসে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল আমদানি করেছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ৩২ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

মার্চের শেষ দিকে রাষ্ট্রীয় পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রায় ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুদ ছিল, যা দিয়ে মাত্র ১৭ দিন চলা সম্ভব। ডিজেল ও পেট্রলের মজুদও একইভাবে সীমিত। ফলে নতুন জ্বালানি সংগ্রহে সরকার বিশ্বজুড়ে দৌড়ঝাঁপ করছে।

সরকার এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৬ লাখ টন রাশিয়ান ফুয়েল অয়েল আমদানির অনুমতি চেয়েছে এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে ৬০ হাজার টন পেয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এসব জ্বালানির দাম আগের তুলনায় অনেক বেশি। একই সময়ে ভারতের কাছ থেকে ৬০ হাজার টন ডিজেল পাওয়ার চুক্তি থাকলেও, নিজস্ব সংকটের কারণে দিল্লি সরবরাহে গড়িমসি করছে।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ঢাকায় ইতোমধ্যে পরিস্থিতির প্রভাব স্পষ্ট। পেট্রল পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা দেয়া হয়েছে। রাজধানীতে গণপরিবহন কমে গেছে, ডেলিভারি কর্মীরা বসে থাকছে এবং শহরের স্বাভাবিক জীবন প্রায় থমকে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির মজুদ মাত্র ১০ থেকে ২১ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, নতুন চালান আসার সম্ভাবনা থাকায় পুরোপুরি জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এখনই নিশ্চিত নয়। যদিও শিল্প খাতের সূত্রগুলো বলছে, কিছু অনানুষ্ঠানিক সিন্ডিকেট সরবরাহ আটকে রেখে সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলছে।

সরকার অবশ্য সংকটের কথা অস্বীকার করেছে। জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সংসদে বলেছেন, বাংলাদেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই, বরং গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বেড়েছে। তার মতে, অতিরিক্ত চাহিদাই সমস্যার মূল কারণ মোটরসাইকেল চালকেরা আগের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি জ্বালানি কিনছেন।

এদিকে ভারতেও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কমে চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। যদিও দেশটি জানিয়েছে, তাদের কাছে ৬০ দিনের জ্বালানি মজুদ রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের চিন্তা চলছে।

ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনও সংকটে পড়েছে। ভিয়েতনামের কৌশলগত মজুদ তিন সপ্তাহ চলার মতো, আর ফিলিপাইনের কাছে মাত্র ৪০ দিনের জ্বালানি রয়েছে। দেশটি ইতোমধ্যে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং চীনের সঙ্গে সরবরাহ নিয়ে আলোচনা করছে।

অন্যদিকে জাপান ৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুদ ছেড়েছে, যা প্রায় ৪৫ দিন চলবে। মিয়ানমারে সেনাবাহিনী রেশনিং চালু করেছে এবং কম্বোডিয়ায় এক-তৃতীয়াংশ পেট্রল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)