ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে নিউ ইয়র্ক সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন এবং অন্যান্য অ্যাডভোকেসি গ্রুপ কর্তৃক দায়েরকৃত ইমিগ্রেশন আদালতে হাজির হওয়া ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা আইনসম্মত কি না এবং তা ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কি না, এই বিষয়ে চলমান একটি সিভিল রাইটস চ্যালেঞ্জ মামলায় সম্প্রতি নতুন মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) গত ২৬ মার্চ আদালতে একটি গুরুতর ভুল স্বীকার করেছে। আদালতে দাখিল করা সরকারি নথিতে স্বীকার করা হয়েছে যে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের একটি আইনি দলিল নিয়ে ভুল তথ্য দাখিল করা হয়েছে, যার ওপর নির্ভর করে অভিবাসীদের ব্যাপক গ্রেফতার কার্যক্রমের ‘আইনি ভিত্তি’ দাঁড় করানো হয়েছিল। বিচার বিভাগের আইনজীবীরা আদালতে দাখিল করা এক চিঠিতে স্বীকার করেছেন যে তারা পূর্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। গত ২৬ মার্চ জমা দেওয়া এই চিঠিটি দেওয়া হয় ইউএস সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারক কেভিন ক্যাস্টেলের কাছে, যিনি ইমিগ্রেশন আদালতে গ্রেফতার সংক্রান্ত বিতর্কিত মামলাটি দেখছেন। এ স্বীকারোক্তি সামনে আসার পর থেকেই বিষয়টি আইনি ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ইমিগ্রেশন নীতি ও আদালত প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
নিউ ইয়র্কের ফেডারেল বিচারক কেভিন ক্যাস্টেলের কাছে দাখিল করা এক চিঠিতে বিচার বিভাগের আইনজীবীরা জানান, তারা ভুলভাবে ২০২৫ সালের মে মাসে জারি করা ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর একটি নীতিমালা মেমো উদ্ধৃত করেছিলেন। তারা দাবি করেছিলেন যে, এ মেমো ইমিগ্রেশন আদালতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যা আদালত প্রাঙ্গণে গ্রেফতারের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পরে তারা স্বীকার করেন, মেমোটি মূলত অন্যান্য আদালতের জন্য প্রযোজ্য এবং ফেডারেল ইমিগ্রেশন আদালতের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। বিচার বিভাগের ভাষায় এটি একটি ‘দুঃখজনক’ এবং ‘গুরুতর তথ্যগত ভুল’, যা সম্ভবত আইসের এক আইনজীবীর ভুল ব্যাখ্যা থেকে এসেছে।
এই মামলা শুরু হয় অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর উদ্যোগে, যাদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করে নিউ ইয়র্ক সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন। তারা অভিযোগ করে, আদালতে হাজির হওয়া অভিবাসীদের গ্রেফতার করা তাদের আইনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের অধিকার ক্ষুণ্ন করছে এবং এটি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এই গ্রেফতার কার্যক্রম মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে শুরু হয়, যেখানে আদালতে হাজির হওয়ার পরই অনেক অভিবাসীকে আইস কর্মকর্তারা আটক করে দ্রুত বহিষ্কারের প্রক্রিয়ায় পাঠায়। সমালোচকদের মতে, এতে আইন মেনে আদালতে যাওয়াই অভিবাসীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে বিচারক কেভিন ক্যাস্টেল এ মামলায় প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞার আবেদন নাকচ করেছিলেন এবং তার সিদ্ধান্তে ওই বিতর্কিত মেমোর উল্লেখ ছিল। তবে বিচার বিভাগের সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তির পর তিনি মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব নথি এবং বিচার বিভাগ ও আইসের মধ্যে যোগাযোগ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন, যা ইঙ্গিত করে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হতে পারে। অন্যদিকে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসছে না এবং তারা ইমিগ্রেশন আদালতে গ্রেফতার কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। তাদের মতে, আইন ভঙ্গকারীদের যেখানে পাওয়া যায় সেখানেই গ্রেফতার করা যুক্তিসংগত।
অভিবাসী অধিকারকর্মীরা বলছেন, এ নীতি আদালতে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভীতি তৈরি করছে এবং ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াকে দুর্বল করছে। নিউ ইয়র্ক সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন জানিয়েছে, সরকারের এ ভুল স্বীকারের ‘সুদূরপ্রসারী প্রভাব’ রয়েছে, কারণ আদালতের আগের সিদ্ধান্তের ফলে অনেক অভিবাসী ইতিমধ্যে আটক হয়েছেন এবং অনেককে দূরবর্তী ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ম্যানহাটনের ইমিগ্রেশন আদালতগুলোতে এ ধরনের গ্রেফতার সবচেয়ে বেশি হয়েছে, যা এ নীতির ব্যাপক প্রয়োগের ইঙ্গিত দেয়।
এই ঘটনায় সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং অভিবাসন নীতির বৈধতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আদালতে ভুল তথ্য উপস্থাপন শুধু একটি আইনি ত্রুটি নয়, বরং এটি বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থার বিষয়কেও প্রভাবিত করে। ফলে এই মামলার ভবিষ্যৎ রায় এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিচার বিভাগকে আদালতে অভিবাসীদের গ্রেফতারের রেকর্ড সংরক্ষণের নির্দেশ
ফেডারেল আদালত ২৭ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর সঙ্গে তাদের আদালতে গ্রেফতার সম্পর্কিত সব যোগাযোগ সংরক্ষণ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। ম্যানহাটনের ফেডারেল বিচারক কেভিন ক্যাস্টেল তার সংক্ষিপ্ত আদেশে বলেছেন যে, প্রসিকিউটরদের অফিসকে আইস কর্মকর্তাদের, এজেন্সির আইনজীবী দলের এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের জানাতে হবে যে, মে ২০২৫ সালে জারি করা একটি মেমো সম্পর্কিত সব অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের যোগাযোগ সংরক্ষণ করতে হবে। ওই মেমোটি ভুলভাবে ইমিগ্রেশন আদালতে গ্রেফতারের ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। ম্যানহাটনের যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি অফিস, যারা এই মামলায় সরকারের পক্ষে মামলা করছে, গত ২৪ মার্চ আদালতকে জানিয়েছে যে, আইসের নির্দেশে তারা যে মেমোটি ব্যবহার করেছিল তা আসলে আদালতে গ্রেফতারের অনুমোদন দেয় না। এ স্বীকারোক্তির মাধ্যমে পরিষ্কার হয়েছে যে, গত এক বছরে নিউ ইয়র্ক এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আইসের গ্রেফতার কার্যক্রমের জন্য কোনো বৈধ আইনি ভিত্তি ছিল না।
গত এক বছরে ম্যানহাটনের ২৬ ফেডারেল প্লাজাতে আইস এবং কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশনের ছদ্মবেশী এজেন্টরা মাস্ক ও বালাক্লাভা পরে এক হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারের মধ্যে শিশুদেরও অন্তর্ভুক্ত, যদিও তারা তাদের পিতা-মাতার থেকে আলাদা করা হয়েছে কি না তা স্পষ্ট নয়। অনেক মানুষ আদালতে হাজির হওয়ার পর তাদের আসল লক্ষ্য ছিল অ্যাসাইলাম আবেদন পুনর্নির্ধারণ এবং তারা তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে ছিলেন না।
অভিবাসী অধিকারকর্মীরা এ প্রক্রিয়াকে নৃশংস এবং অমানবিক হিসেবে সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, যারা নিয়ম মেনে আদালতে হাজির হয়েছেন, তাদেরই আইস লক্ষ্য করেছে, যা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। বিচারক কেভিন ক্যাস্টেল, যিনি জর্জ ডব্লিউ. বুশ প্রশাসনের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত, গত বছর আফ্রিকান কমিউনিটিজ টুগেদার এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর মামলা নাকচ করে আইসকে আদালতে গ্রেফতারের অনুমতি দিয়েছিলেন। সেই সময় প্রসিকিউটররা তাকে মে ২০২৫ সালের আইস মেমোর দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন।
মামলার প্রসিকিউটর, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইউএস অ্যাটর্নি তোমোকো অনোজাওয়া আদালতকে জানান যে বিচারককে পুনরায় ব্রিফিং দিতে হবে এবং তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘তথ্যগত ত্রুটি’ প্রসিকিউটরদের তত্ত্বাবধানে না থাকায় ঘটেনি, বরং আইসের এক অজ্ঞাত আইনজীবীর কারণে। প্রসিকিউটররা আরো জানান, তারা প্রতিটি ব্রিফ জমা দেওয়ার আগে আইসের সঙ্গে পরামর্শ করেছিল। তবে এখনো স্পষ্ট নয় যে, এ প্রকাশিত তথ্যের প্রভাব কী হবে, তাদের ওপর যারা ইতিমধ্যেই ইমিগ্রেশন আদালতে আটক হয়েছে, কিংবা ট্রাম্প প্রশাসনের বহিষ্কার নীতি কতটা পরিবর্তিত হবে। বিচারক বাদীর অনুরোধ মঞ্জুর করে তাদের দুই সপ্তাহ সময় দিয়েছেন নতুন তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়া জানাতে।