এখনো পুরাপুরি দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। তবে মোটা দাগে যে পরিকল্পনা সেটা ঈদুল আজহার পরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নামতে পারে নির্বাচন কমিশন। এ ব্যাপারে এখন বড় বাধা বৈশ্বিক সমস্যা। জ্বালানি নিয়ে যে সমস্যা বিশ্বের অন্যসব দেশের মতো বাংলাদেশেও এতো ওই ঈদুল আজহার পরপর যে চিন্তা, সেটাতে কিছুটা ভাটাও পড়তে পারে। জ্বালানি নিয়ে দেশের অবস্থা যতদিন ঠিক না হবে, ততদিন ইচ্ছে থাকলেও এ ধরনের কর্মকা-গুলো কিছুটা বিলম্ব হতেই পারে। এছাড়াও স্থানীয় সরকার প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশসমূহ সংসদে আইনে পরিণত হওয়ার একটা বিষয় রয়েছে। ওটাও ফায়সালা হওয়ার পর নির্বাচনের পথে হাঁটতে পারবে নির্বাচন কমিশন। যদিও আশা করা হচ্ছে এ সমাধান শিগগির হয়ে যাবে।
এদিকে দেশে চলমান জ্বালানি-সংক্রান্ত পরিস্থিতি ক্রমশ ঠিক হয়ে যাবে এটাই আশা এবং এ ভাবনা থেকেই আগামী ঈদুল আজহার পর একটা দিনক্ষণ ধরে দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। অন্যসবের মতোই স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ ও দ্বিতীয় ধাপে পৌরসভার ভোট গ্রহণ করা হবে। পরবর্তী সময়ে উপজেলা ও জেলা পরিষদ নির্বাচন এবং সব শেষে সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগ।
জানা গেছে, বর্তমানে দেশের মোট ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৩ হাজার ৭৫৫টি নির্বাচন উপযোগী হয়ে উঠেছে। এছাড়া আগামী বছরে আরো ৩৪৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনযোগ্য হবে। ফলে ধাপে ধাপে বিপুলসংখ্যক ইউনিয়ন পরিষদে ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ভেঙে দেওয়া ৩৩০টি পৌরসভাও এখন নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশন প্রস্তুত রয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কেন্দ্র নির্ধারণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পনা প্রণয়ন শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর এত বড় পরিসরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন রাজনৈতিক পরিবেশকে সক্রিয় করে তুলবে। একই সঙ্গে স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকারের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখন নির্বাচন উপযোগী হলেও কখন ভোট হবে তা মূলত সরকারের ওপর নির্ভর করছে। কেননা এ ভোটগুলোর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে স্থানীয় সরকার। কমিশন কেবল ভোটের আয়োজন করে। এদিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তথ্য চেয়ে জেলায় জেলায় চিঠি পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমান মাছউদ সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন কমিশনের কোনো অবসর নেই। সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছাড়াও অনেক স্থানীয় নির্বাচন আছে, তা আয়োজন করতে হয়। সারা বছর ধরে নির্বাচন হবে। ঈদের পর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হবে। খুব দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। গত ৪ এপ্রিল রাজধানীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশসমূহ সংসদে আইনে পরিণত হওয়ার পরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত নির্বাচন হবে। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন সংসদের মাধ্যমে বাতিল করা হবে। এছাড়া আরো কিছু অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন।’
এর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কাজ চলছে। নিঃসন্দেহে এ বছরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব এ নির্বাচন হবে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার ১১টি সিটি করপোরেশনে নতুন করে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। একইভাবে ৫৬ জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বর্তমান সরকার। এছাড়া উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার মেয়রদেরও অপসারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। অন্যদিকে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর দলীয়ভাবে নির্বাচিতরা পালিয়ে যাওয়ায় অনেক ইউনিয়ন পরিষদও হয়ে পড়ে জনপ্রতিনিধিহীন। ফলে প্রায় ১৯ মাস ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়া চলছে অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার যাত্রা শুরুর পর চলতি বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানা যায়। সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন বড় আয়োজনের ব্যাপার। তবে এ ক্ষেত্রে বড় বাধা অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা স্থানীয় সরকারবিষয়ক অধ্যাদেশ।
এতে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেই অধ্যাদেশগুলো এখন নতুন সংসদে আইনে পরিণত না হওয়া বা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের পথে হাঁটার সুযোগ নেই। বর্তমান চলমান সংসদে অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত হলেই ভোটের দরজা খুলে যাবে। জানা গেছে, অধ্যাদেশগুলো বর্তমানে সংসদের বিশেষ অধিকার কমিটিতে বিবেচনাধীন। সেখান থেকে সুপারিশ করে সংসদে উত্থাপন করবে সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটি। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের মাধ্যমে আইনে পরিণত হলে নির্বাচনের পথ খুলবে। অধ্যাদেশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে দলীয় প্রতীক তুলে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোতে এটা বড় পরিবর্তন। এগুলো বাস্তবে রূপ দিতে হলে আইনের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।