হাসিনার চরম নিষ্ঠুরতার জলজ্যান্ত এক উদহারণ ইলিয়াস আলী


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 08-04-2026

হাসিনার চরম নিষ্ঠুরতার জলজ্যান্ত এক উদহারণ ইলিয়াস আলী

ইলিয়াস আলীকে নিয়ে যা ঘটেছে বাংলাদেশে এর চেয়ে নিষ্ঠুরতা আর কী হতে পারে। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে গুম হওয়া এ রাজনীতিবিদ জীবিত আছেন কী না সেটাই নিশ্চিত ছিলেন না এ পরিবার। স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা ও সন্তানেরা দীর্ঘ এ সময় এক অসহ্য যন্ত্রনার মধ্যদিয়ে গেছেন। জন্ম নিলে মৃত্যু হবেই। সেটা যেভাবেই হোক না কেন। কিন্তু সেই মৃত্যুর খবরটুকুও কী তার আপনজনরা জানার অধিকার রাখে না? কতটা ভয়ানক ও নিষ্ঠুরতা আবৃত ছিল বিগত শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার, এটা তার জলন্ত এক উদহারণ। 

সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা সোমবার (৩০ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, ‘ইলিয়াস আলী ও সুমন পারভেজসহ আরও যারা গুম হয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা জানতে চায় তাদের স্বজনরা কোথায়? আমরা ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছি প্রায় দেড় বছরের কাছাকাছি সময় হয়ে গেল, কিন্তু আমরা এখনও জানি না আমাদের স্বজনরা কোথায়?’ অর্থাৎ লুনা ও তার পরিবার তখনও নিশ্চিত ছিলেন না ইলিয়াস আলীর পরিণতি কী। 

এরপরই পরবর্তি সব ঘটনা। বেড়িয়ে আসে এক এক ঘরে সেসব নিষ্ঠুর সব ঘটনাবহুল মুহূর্তগুলো। 

যেভাবে হলো আসল ঘটনা 

গত ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১২ টার দিকে সাবেক ডিজিএফআই মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের পর বেড়িয়ে আসছে বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী গুম নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গ্রেপ্তারের পর তাকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও রাষ্ট্রীয় অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা। জিজ্ঞাসাবাদে ইলিয়াস আলী গুম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে দায় চাপাচ্ছেন অন্যদের উপর। তবে তিনি বিএনপি নেতাকে গুম, নেপথ্য, কারা জড়িত এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিচ্ছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টদের। ডিবি তার দেয়া তথ্য যাচাই বাছাই করছে।

শেখ মামুন খালেদ গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন, গুম করার সংকেত আগেই দেয়া হয়েছিল। ইলিয়াস আলী টিপাইমুখ বাঁধ এবং পার্শ্ববর্তী একটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এই বাঁধ ও চুক্তি ওই দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইলিয়াস আলী এর বিরুদ্ধে গিয়ে আন্দোলনও করেছিলেন। এরপরই সরকারের রোষাণলে পড়েন। তাই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ইলিয়াস আলীকে সরিয়ে দেয়া হয়। শেখ হাসিনা তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান ও র‌্যাব’র মহাপরিচালকে গুমের মিশন বাস্তবায়ন করার নির্দেশনা দেন। গুমের পুরো প্রক্রিয়া রেকি ও বাস্তবায়ন করে র‌্যাব-১। আর র‌্যাবকে সহযোগিতা করে ডিজিএফআইয়ের কিছু কর্মকর্তা। সবচেয়ে বড় ভূমিকা ও ইলিয়াস আলী গুম মিশনের নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান।

শেখ হাসিনা ঘটনার আগে পরে জিয়াউলের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেন। সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ইলিয়াস আলী ও তার ব্যক্তিগত গাড়িচালককে বনানী থেকে গুম করে নেয়া হয় র‌্যাব-১ সদর দপ্তরে। সেখানে ইলিয়াসকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে মারধর করা হয়। গোয়েন্দাদের সূত্র জানিয়েছে, তুলে নেয়ার পর ১৭ থেকে ২০ এপ্রিলের কোনো এক রাতে ইলিয়াস আলীকে হত্যা করে ধলেশ্বরী নদীতে লাশ ফেলে দেয়া হতে পারে।

অন্যদিকে গুম হওয়া স্বামীর সন্ধান চেয়ে ২১ এপ্রিল ইলিয়াসপত্নী সন্তানদের নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। পরে শেখ হাসিনা জিয়াউল আহসানকে ফোন দিলে ইলিয়াস আলীকে চূড়ান্ত গুম করার ইঙ্গিত দেন ওই কর্মকর্তা।

এদিকে সরকারের নির্দেশনায় ইলিয়াস আলীকে গুম করা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের পর দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার ৫ দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করে ফের সাতদিনের রিমান্ড চান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। আদালত আবার তার ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জিজ্ঞাসাবাদে মামুন খালেদ জানান, ইলিয়াস আলীকে গুম করার জন্য কাজ করে ডিজিএফআই ও র‌্যাব’র একটি বিশেষ টিম। তাদের আগে থেকেই ব্রিফ করে তৈরি করা হয়েছিল। সার্বিকভাবে দিকনির্দেশনা মামুন খালেদ নিজেই দিয়েছিলেন।

ইতিমধ্যে আলোচিত এই গুম নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার পর গুমের সঙ্গে জড়িত র‌্যাব ও ডিজিএফআইয়ের সকল সদস্যকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যদিও তাদের কেউ কেউ দেশত্যাগ করেছেন। কেউ আগেই গা-ঢাকা দিয়েছেন। কেউ অবসরে গেছেন। অনেকেই এখনো চাকরিতে বহাল তবিয়তে আছেন। মামুন খালেদ জানিয়েছেন, ইলিয়াস আলী গুম মিশনে ডিজিএফআইতে কর্মরত দু’জন মেজর প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছিলেন। আর ইলিয়াস গুমের বিষয়ে অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষপদধারীরা অবগত ছিলেন।

গুমের স্বীকার বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী বেঁচে আছেন নাকি তাকে মারা হয়েছে এমন প্রশ্ন চৌদ্দ বছর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছিল তার ফ্যামিলি, তার কর্মী, সমর্থকদের মধ্যে। কিন্তু সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারেনি। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ নিয়ে কিছু বলা হয়নি। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তো উত্তর মিলেনি বরং ওই সময় ইলিয়াস আলী গুম নিয়ে কোনো তদন্তই হয়নি বলে দাবি করেছেন তার পরিবার ও বিএনপি। 

তবুও ইলিয়াস ফিরবেন সেই আশা 

একটি পক্ষ আগেই ধারণা করেছিলেন ইলিয়াস আলীকে হত্যা করা হয়েছে। এ নিয়ে মাঝে মধ্যেই তথ্য বেড়িয়ে আসতো। আর আরেকটি পক্ষ মনে করতেন ইলিয়াস বেঁচে আছেন এবং তিনি ফিরবেন। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর ডিজিএফআই নিয়ন্ত্রণাধীন আয়নাঘর খ্যাত বন্দিশালা থেকে গুমের শিকার অনেকেই মুক্তি পান। তখনো আশা ছিল কারো কারো যে ইলিয়াস হয়তো বেড়িয়ে আসবেন। কিন্তু ইলিয়াস আলী ফিরেননি। এরপর থেকে তার ফিরে আসার আশা একেবারেই ক্ষীণ হয়ে আসে। 

যেভাবে গুমের রোডম্যাপ হয় 

তদন্ত সূত্র জানায়, ঘটনার রাতে সন্ধ্যার পর থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ইলিয়াস আলী তৎকালীন শেরাটন হোটেলে (বর্তমান ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল) বসে মিটিং করছিলেন। রাত ১১টার দিকে তিনি নেতাকর্মীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তখন থেকেই তাকে অনুসরণ করছিল জিয়াউল আহসানের গুম স্কোয়াডের এক সদস্য। তিনি একটু পর পর ইলিয়াস আলীর গাড়ির অবস্থান জিয়াকে জানিয়ে দেন। মহাখালী পৌঁছার পর ইলিয়াস আলীর গাড়ি সরাসরি অনুসরণ শুরু করে জিয়ার টিম। মহাখালী থেকে বনানীর ২ নম্বর সড়কে যাওয়ার পর গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে থামানোর পর ড্রাইভার আনসারসহ ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করে এই টিমের সদস্যরা। তারপর সেখান থেকে নেয়া হয় র‌্যাব-১ সদর দপ্তরে। এরপর ঘটে অন্য সব ঘটনা। 

শেখ হাসিনার পৈশাচিক নাটক ও রাজনীতি 

২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল বনানী থেকে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি অপহরণ ছিল না, ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাজানো এক পৈশাচিক ঘটনা। র‌্যাবের একটি দল তাকে তুলে নেওয়ার মাত্র দুই দিনের মধ্যেই হত্যা করে লাশ ধলেশ্বরী নদীতে ডুবিয়ে দেয়। কিন্তু গা শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, মানুষটি যখন আর পৃথিবীতে নেই, তখন তার পরিবার এবং গোটা জাতির সাথে এক সপ্তাহ ধরে সমবেদনার নামে চূড়ান্ত প্রহসন চালানো হয়।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে ইলিয়াস আলীর বাসায় গিয়ে তার ছোট সন্তানদের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত¡না দিয়েছিলেন। অথচ পর্দার আড়ালে তখন ভিন্ন চিত্রনাট্য চলছিল। একদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ উপহাস করে বলছিলেন, ইলিয়াস আলী নাকি ‘খালেদা জিয়ার শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে আছেন’, অন্যদিকে র‌্যাবের কর্মকর্তারা বারবার ফোন করে পরিবারটিকে আশার বাণী শুনিয়েছেন। কখনো বলা হয়েছে পুবাইলে তাকে পাওয়া যেতে পারে, কখনো বা কুলাউড়া সীমান্তে। এ নিয়ে সে সময় নাটকও হয় বেশ কয়েকবার। 

এই মিথ্যা আশ্বাসে বুক বেঁধে নিখোঁজ মানুষটির স্ত্রী ও সন্তানরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় হন্যে হয়ে ছুটেছেন। অথচ যারা এই আশ্বাস দিচ্ছিলেন, তারা ভালো করেই জানতেন যে ইলিয়াস আলীকে ততক্ষণে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই উড়ো খবরগুলো ছড়ানো হয়েছিল মূলত জনরোষ দমানোর জন্য এবং গুমের দায় থেকে মুক্তি পেতে।

একটি পরিবার যখন তাদের প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার জন্য শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে চেষ্টা করছিল, তখন রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের সাথে যে নির্মম রসিকতা করেছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। খুনের পর সান্ত¡নার নাটক সাজানো আর তদন্তের নামে পরিবারটিকে বিভ্রান্ত করে ছুটিয়ে মারা এই পৈশাচিকতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কলঙ্কিত সত্য হয়ে থাকবে।

ফ্লাশব্যাক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তদন্ত সূত্র 

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে খুন করা হয় সিলেট অঞ্চলে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা এম ইলিয়াস আলীকে। হত্যার পর খুনিচক্র ইলিয়াস আলীর লাশ যমুনা নদীতে ফেলে দেয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিতে র‌্যাব সদস্য সার্জেন্ট তাহেরুল ইসলাম ইলিয়াস আলীকে অপহরণের পর লোমহর্ষক হত্যাকা-ের বর্ণনা দিয়ে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য দেন।

গুম তদন্ত কমিশন সূত্র সেসময় জানায়, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে এসএসএফ-এর মহাপরিচালক ছিলেন লে. জেনারেল চৌধুরী হাসান সওরাওয়ার্দী। তার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, ডিজিএফআইর তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়ে ইলিয়াস আলীকে গুম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। অথচ পরবর্তী সময়ে ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে ডেকে এনে নাটকও করেছিলেন।

পুরাতন শাড়ি পরে জড়িয়ে ধরেছিলেন ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও কন্যাকে। এসময় ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে অপহরণ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের জের হিসেবে এটা করা হয়েছে বলে ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে অবহিত করেছিলেন শেখ হাসিনা। এ নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা। প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর ইলিয়াস আলী গুম ও হত্যার আদিঅন্ত তুলে ধরা হয়েছে। 

১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিতে র‌্যাবের সদস্য সার্জেন্ট তাহেরুল ইসলাম বলেন, জিয়াউল আহসানের নির্দেশে ঘটনার রাতে শেরাটন হোটেল থেকে তিনি ইলিয়াস আলীকে অনুসরণ করেন। মহাখালী পৌঁছার পর জিয়াউল আহসান নিজেই আরেকটি টিম নিয়ে ইলিয়াস আলীর গাড়ি অনুসরণ করেন। ইলিয়াস আলীর গাড়ি বনানীর ২ নং সড়কের বাসার সামনে পৌঁছার আগেই বনানীর সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে থেকে তাকে তুলে নেয়া হয়। ইলিয়াস আলীর সঙ্গে তার ড্রাইভার আনসারকেও অপহরণ করা হয়। গাড়িটি জলখাবার হোটেলের সামনে দিয়ে বনানীর ২ নম্বর সড়কে ঢোকার পরে এই অপহরণের ঘটনা ঘটে। ট্রাইব্যুনাল সূত্র আরো জানায়, ইলিয়াসকে হত্যা ছাড়াও র‌্যাবের জিয়াউল আহসানের কিলিং স্কোয়াডের এক সদস্য একদিনে ১১ জন এবং আরেক র‌্যাব সদস্য ১৩ জনকে খুন করেছিল। 

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল সন্ধ্যার পর দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ইলিয়াস আলী সভা করেন তৎকালীন শেরাটন হোটেলে (বর্তমান ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল)। সভা শেষ করে রাত ১১টায় তিনি বের হন এবং গাড়িতে করে বাসায় ফিরছিলেন। অপহরণের লক্ষ্যে জিয়াউলের নির্দেশে শেরাটন থেকেই অনুসরণ করছিলেন র‌্যাবের সদস্য সার্জেন্ট তাহেরুল ইসলাম। পরবর্তীতে তাকে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত টিম। তাকে তদন্ত কমিটিতে আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৬৪ ধারায় তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। 

জবানবন্দিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, আমার দায়িত্ব ছিল শেরাটন থেকে অনুসরণ এবং বেতার বার্তায় গতিপথ জিয়াউল স্যারকে জানানো। নির্দেশনা অনুযায়ী, তিনি ইলিয়াস আলীর গাড়ি অনুসরণ এবং প্রতিটি মুহূর্তে গাড়ির গতিপথ জিয়াকে অবহিত করা। মহাখালী পৌঁছার পর ইলিয়াস আলীর গাড়ি সরাসরি অনুসরণ শুরু করেন জিয়ার টিম। মহাখালী জলখাবার হোটেলের অদূরে বনানীর ২ নম্বর সড়কে গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে থামানোর পর ড্রাইভার আনসারসহ ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করে এই টিমের সদস্যরা। এরপরই জিয়া তাহেরুলকে বলেন, ‘তোমার ডিউটি শেষ, চলে যাও।’ নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব শেষে তিনি ফিরে যান। জিয়ার টিম ইলিয়াস আলীকে নিয়ে যাওয়ার পর কী হয়েছে সেটা তিনি বলতে পারবেন না। ’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইলিয়াস আলীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছিল। হত্যার পর তৎকালীন র‌্যাব কর্মকর্তা এবং পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীতে পদোন্নতি পেয়ে মেজর জেনারেল হওয়া জিয়াউল আহসান অফিসে ফিরে স্বস্তি ও আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আজ বড় একটি অপারেশনে সাকসেসফুল হলাম। শেষ করে তাকে যমুনায় ফেলে দিয়ে এসেছি। জিয়া এ কথাও বলেন যে, ইলিয়াস আলী অপারেশনের কথা ঊর্ধ্বতনকে জানিয়েছি। ঊর্ধ্বতন বলতে তিনি মেজর জেনারেল তারেক সিদ্দিকি কিংবা শেখ হাসিনাকে বুঝিয়েছেন বলে সূত্রের ধারণা।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)