নিউইয়র্কের রাজধানী আলবানীর কাছে মারাত্মক এক সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ বাংলাদেশীসহ ৪ জন নিহত হয়েছে। গত ৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় আলবেনীর ক্লেভারাকে রুট নাইন এইচ এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুটো গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন বাংলাদেশীসহ চারজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। কম্যুনিটি এক্টিভিস্ট ও রাজনীতিবিদ প্রফেসর নূরুল আমিন পালাশ জানান, নিহত ৩ বাংলাদেশীর মধ্যে একই পরিবারের সদস্য ২ জন। বাব এবং ছেলে। অপরজন ছেলের বন্ধু। তারা বাংলাদেশী অধ্যুষিত ব্রঙ্কসে থাকতেন। তারা সবাই মিলে নতুন বাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তাদের সকলের সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। দুর্ঘটনাটি ভ্যান ওয়াইক লেনের ঠিক দক্ষিণে রাত ৭টার দিকে ঘটে। নিহতদের মধ্যে তিনজন প্রিয়াস গাড়ির যাত্রী এবং একজন টয়োটা ক্রাউন গাড়ির যাত্রী ছিলেন। আহতদের মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী এবং এক বছর বয়সী কন্যা শিশু গুরুতর অবস্থায় আলবানি মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দুর্ঘটনায় জড়িত ২০০৯ সালের টয়োটা প্রিয়াস গাড়িটি চালাচ্ছিলেন লাউডনভিলের ২৯ বছর বয়সী মোহাম্মদ হীরামনের ছেলে নাজমুল রুবেল। শেরিফ অফিস জানিয়েছে, প্রিয়াসটি অজানা কারণে কেন্দ্রীয় লাইন পার হয়ে বিপরীত দিকের লেনে প্রবেশ করে, যা মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণ হয়। প্রিয়াসের যাত্রীদের মধ্যে মোহাম্মদ হীরামন (৬০, নাজমুল রুবের বাবা) এবং ফাহিম হালিম (২৫, নাজমুল রুবেলের বন্ধু) ঘটনাস্থলেই নিহত হন। প্রিয়াসের একমাত্র বেঁচে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক যাত্রী ফাতিমা আক্তার (৩৩) গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। প্রিয়াসের চতুর্থ যাত্রী, ১ বছর বয়সী কন্যা শিশু ফাতিমা আক্তারের মেয়ে, একই হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তাকে হেলিকপ্টারে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তারা নাজমুল রুবেলের বোন ও ভাগনী।
দুর্ঘটনায় জড়িত ২০২৫ সালের টয়োটা ক্রাউন গাড়িটি চালাচ্ছিলেন ব্রুকলিনের ২৪ বছর বয়সী লুকা পালবেনিয়ান। তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, পরে ছাড়া পেয়েছেন। ক্রাউনের যাত্রী জুলিয়া রিচি (৬২) ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন। স্থানীয় ভিডিওগ্রাফার ল্যান্স হুইলার জানিয়েছেন, দুই গাড়ির সামনের অংশ একেবারে ভেঙে গিয়েছে। ধাক্কা এত তীব্র ছিল যে ধাতব অংশ ছিঁড়ে গাছের ডালও ভেঙেছে। পাশের বাড়ির লোকজন তীব্র শব্দ শুনে ছুটে এসেছিলেন। এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আমি রাস্তায় দৌড়ে গিয়ে দেখি শিশুটি রক্তমাখা এবং কাঁপছে। মা ও অন্যরা আহত অবস্থায় পড়ে আছে। মনে হচ্ছে এক মুহূর্তে সব কিছু শেষ হয়ে গেছে।
শেরিফ জাকি সালভাটোরে বলেন, দুর্ঘটনার দৃশ্য হৃদয়বিদারক। শিশু থাকায় উদ্ধারকারীদের মানসিক চাপ ছিলো আলাদা। আমাদের দল মানসিক সুরক্ষা ব্যবহার করে কাজ চালিয়েছে। অনেকেই এই ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা দেখতে অক্ষম। উদ্ধার কাজে অংশ নিয়েছিল ক্লেভারাক ফায়ার কোম্পানি, লিভিংস্টন ফায়ার কোম্পানি, গ্রীনপোর্ট রেসকিউ স্কোয়াড, ভ্যালাটি রেসকিউ স্কোয়াড এবং চাতহাম রেসকিউ স্কোয়াড। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। স্থানীয়রা আহতদের পাশে দাঁড়াতে ছুটে আসেন।
ফাতিমা আক্তারের এক আত্মীয়, সোহেল রহমান, জানান, “আমরা শোকস্তব্ধ। ফাতিমা এবং শিশুটি খুবই অসুস্থ। আমরা সকলের কাছে দোয়া চাই। আমাদের পরিবার বর্তমানে গভীর দুঃখ ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।” স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি আহতদের সহায়তা ও মানসিক সমর্থন দিচ্ছে এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
দুর্ঘটনার কারণে রুট নাইন এইচ প্রায় চার ঘণ্টা বন্ধ ছিল। শেরিফ অফিস জানিয়েছে, দুর্ঘটনার তদন্ত চলছে, বিশেষ করে প্রিয়াস কেন কেন্দ্রীয় লাইন পার হয়েছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন এখন সচেতনতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়।
প্রফেসর নূরুল আমিন পালাশ আরো জানান, মোহাম্মদ হীরমনের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার নাজমুল রুবেল আলবেনী এলাকায় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান এবং একটি বড় বাড়ি ক্রয় করেছিলেন। সবাই মিলে সেই বাড়িতেই যাচ্ছিলেন। তারা ব্রঙ্কসের বাসা ছেড়ে নতুন বাড়িতে চলে যাচ্ছিলেন কিন্তু নিয়তির কি নির্মম পরিহাস দুনিয়াবি বাড়িতে না গিয়ে তাদের চিরস্থায়ী বাড়িতে চলে যেতে হলো। ঘটনার দিন কয়েকটি গাড়ি যোগে তারা যাচ্ছিলেন, যার মধ্যে নাজমুল রুবেল যে গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন সেটি দুর্ঘটনায় পতিত হলো। উল্লেখ্য, তাদের দেশের বাড়ি কুমিল্লায়।