ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর আওয়ামী লীগের ক্ষোভ সম্ভবত কোনোদিনই যাবে না। ছাত্রলীগের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যে কাজটা করেছে ওই সরকার, সেটা নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই এ দলটির। নির্বাচনের প্রত্যাশাও ছিল এ দলটির। অন্তত পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের অবসান ঘটে একটি নির্বাচনি সরকার আসুক। বিপুল ব্যবধানে জিতে ক্ষমতায় এখন বিএনপি। স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা স্বস্তিতে আওয়ামী লীগ। বাস্তবে কী তাই?
বিএনপি জোট সরকার দুইমাসের শাসনে অনেক নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলেই প্রতিয়মান হচ্ছে। একে তো মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব জুড়ে ঘনায়মান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ, তদুপরি বিএনপি সরকার দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ সংগঠনসমূহের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক আরোপকৃত নিষেধাজ্ঞাকে আইনে পরিবর্তন করার উদ্যোগ ঘোষণা করে দেশকে সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। এতে যেমনটা আওয়ামী লীগ মাঠে নামার উপলক্ষ্য খুঁজে পাবে এবং অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগ পাবে। সব বুঝেশুনে সরকারের শুরুতেই আওয়ামী লীগকে ক্ষেপিয়ে তোলার কাজটা করবে কি না, এ নিয়ে আলোচনা শুরু।
এমনিতেই সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্রমাগত বচন নিত্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। গণভোট আর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে সরকার এবং বিরোধী দল মুখোমুখি সংঘাত পূর্ণ অবস্থানে। তদুপরি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তৃণমূলে ব্যাপক সমর্থন থাকা স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ রুদ্ধ করার প্রচেষ্টায় বিএনপি যে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারছে সেটি বলাই বাহুল্য। সন্দেহ নেই আওয়ামী লীগ নিজেদের ব্যর্থতার ভারেই নৌকা দিয়ে ডুবেছে। একটি ঐতিহ্যবাহী দলকে নিষিদ্ধ করা দলকে নিষিদ্ধ করার প্রয়াস যে ব্যর্থ হবে সেটি অনুমেয়। আমি দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর শান্তিপূর্ণসহ অবস্থাকে পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করছি। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগকে ফিরে আসার প্রক্রিয়া রুদ্ধ হলে দেশজুড়ে আন্দোলনের সৃষ্টি হতে পারে।
এমনিতেই দুই মাস সময়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। ঈদযাত্রায় জনগণ ভুগেছে সরকার যানবাহন চলাচলে ব্যর্থ ব্যবস্থাপনার কারণে। দেশজুড়ে হাম মহামারির আকার ধারণ করেছে। জ্বালানি সংকটে দিশেহারা সরকার। সরকার মুখে যতই বলুক দেশে জ্বালানি সংকট নেই, কিন্তু মাঠের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। পাম্পগুলোতে জ্বালানির তীব্র সংকট। প্রতিদিন বিপুল সংকট জ্বালানি গ্রহীতা জ্বালানি সংগ্রহে হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছে। জ্বালানি সংকটে সাগরে মাছ ধরতে পারছে না উপকূল অঞ্চলের জেলেরা, বন্ধ দেশের অধিকাংশ সার কারখানা, বন্ধ হতে চলেছে দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার। দেশের এই সংকট মুহূর্তে যখন প্রয়োজন জাতীয় একতা তখন সরকার বিভেদ সৃষ্ট করার আত্মঘাতী পথে হাঁটছে।
সংসদে সংসদ নেতা তারেক জিয়া মুখে কিছুই বলছে না। সংবিধান আর আইনের ব্যাখ্যা আইনমন্ত্রীর পরিবর্তে দিচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গণভোট আর সংবিধান সংস্কার বিষয় নিয়েও বিএনপির সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে জামায়াত-এনসিপি বিরোধী জোটের। গ্রীষ্মের উত্তাপ যত বাড়ছে চতুর্মুখী সংকট ততই সরকারকে অক্টোপাসের মতো বেঁধে ফেলছে। আশা করি, সরকারের উপদেষ্টারা সরকারকে ধ্বংসাত্মক পথ থেকে ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিবে।
জ্বালানি সংকট কিন্তু বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট অর্থনৈতিক সংকটের সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের অনভিজ্ঞ মন্ত্রিসভা সংকটের ব্যাপ্তি আর গভীরতা উপলব্ধি করতে পারছে বলে মনে হয় না। সরকার কিছু দিন পরেই জ্বালানি বিদ্যুৎ মূল্য বাড়াতে বাধ্য হবে। তার পরেও দেশব্যাপী লোডশেডিং এড়ানো যাবে না। শিল্প-কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হলে রফতানি আয়ে ধস নামবে। এমনিতেই যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্স কমে যাবে। অর্থনৈতিক বিপর্যয় সামাল দেওয়াই হবে সরকারের প্রধান চ্যলেঞ্জ। সরকারকে কিন্তু এখন থেকেই বিষয়টি সবাইকে নিয়ে একতাবদ্ধ হয়ে সামাল দেওয়ার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নেওয়া উচিত।