ওয়ান ইলেভেন ও তার পরবর্তিতে দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র নেতাকর্মীর উপর নিপীড়ন ও বিএনপিকে মাইনাস করার অন্যায় যেসকল ফর্মুলা বাস্তবায়নের নেপথ্যে ছিলেন তাদের বিরুদ্বে অ্যাকশন শুরু। ইতিমধ্যে ওয়ান ইলেভেনের বেশ কয়েকজন কুশীলবকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে আরো অনেককে আটকের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন সদ্য বিলুপ্ত হওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ওয়ান-ইলেভেনের সময়কার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।
একইভাবে সাবেক স্পিকার শিরিন শারমীনকে ৬ এপ্রিল সোমবার রাতে আটক করেছে পুলিশ। ৫ আগষ্টের আওয়ামী লীগ সরকার পতনের বেশ কিছুদিন পর ২৭ আগস্ট পদত্যাগ করেছিলেন তিনি স্পিকার পদ থেকে। সে থেকেই তিনি লুকিয়ে ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। তাকে খোঁজা হলেও পায়নি পুলিশ। এভাবেই কেটে যায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমল। ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর সংসদে শপথ পড়ানো থেকে নানা জটিলতায় পড়তে হলেও সেটা কোনো না কোনো ব্যাখ্যা নির্বাচন কমিশনার ও বিভিন্ন উপায় সম্পন্ন হয়। পরিশেষে তাকে আটক করা হয় তার নিজ ধানমন্ডিস্থ বাড়ি থেকে।
এদিকে আরো যারা গ্রেফতার হতে পারেন তাদের মধ্যে রয়েছে সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন, এমন খবর এখন বাংলাদেশের মিডিয়ায় চাউর। জানা গেছে ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম অনুকুশীলব, কুচক্রীদের সঙ্গে ওই নির্বাচন কমিশনের পক্ষে যোগাযোগ রক্ষা করা, বিএনপি ভাঙার অপচেষ্টা ও অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে শাখাওয়াত পুত্র এম সাফাক হোসেনের একচ্ছত্র প্রভাবে বন্দরে অচলাবস্থার সৃষ্টির বিষয়গুলো নিয়েও তদন্ত হবে বলে জানা গেছে।
ওয়ান-ইলেভেনের সময় সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন নির্বাচন কমিশনের প্রভাবশালী কমিশনার। সম্প্রতি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের পর সাখাওয়াত হোসেন সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে বলে খবরে প্রকাশ।
ওই সূত্রের দাবি একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মূলত মইন, মাসুদের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নির্বাচন কমিশনের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তার দায়িত্ব ছিল কমিশনের পক্ষে কুচক্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। তারা যেভাবে নির্দেশনা দিতেন তা বাস্তবায়ন করা।
সে সময় বিএনপিকে ভাঙার অপচেষ্টার নেতৃত্বও তিনিই দিয়েছিলেন। সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হলো ২০০৮-এর নির্বাচনে বিএনপিকে পরাজিত করতে কথিত, যে অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানো হয়, সেগুলো তার তত্ত্বাবধানেই হয়েছিল। ব্যালটের ডিজাইনসহ অন্যান্য প্রিন্টিং তথ্য-উপাত্ত লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে তিনি সরবরাহ করেছিলেন। শেখ মামুন তখন ডিজিএফআইয়ের পরিচালক ছিলেন।
এ বিষয়ে মিডিয়ার দীর্ঘ এক রিপোর্টে জানা যায়, ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন ড. এ টি এম শামসুল হুদা ও অপর কমিশনার ছিলেন মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন। সচিব ছিলেন হুমায়ূন কবির। মইন, মাসুদদের প্রভাবে এই তিনজনকে সব সময় চাপে রাখতেন সাখাওয়াত। সে কারণে সাখাওয়াতের সিদ্ধান্তের বাইরে তাদের কিছুই করার ছিল না। এ সময় ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রকল্পের পিডি ছিলেন ব্রিগেডিয়ার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী।
যুগ্ম সচিব ছিলেন ড. রফিকুল ইসলাম। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা কমিশনে এই দুইজনকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেয়। সূত্র জানিয়েছে, ওয়ান-ইলেভেনের সময় মইন, মাসুদ ও শেখ মামুনের অন্যতম সহযোগী হিসেবে যেসব অপকর্মের অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাই করতে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন সাখাওয়াত হোসেন। বর্তমানে তিনি গোয়েন্দা নজরদারিতে আছেন বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ওয়ান-ইলেভেনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে অন্তর্বর্তী সরকারে তাকে উপদেষ্টা করা হয়। কিন্তু একপর্যায়ে নানান কর্মকা- ও কথাবার্তায় সরকার বিব্রত হলে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং পদত্যাগের হুমকি দেন।
কিন্তু সরকারের বিভিন্ন স্পর্শকাতর দপ্তরে তার কর্মকাণ্ডের কিছু তথ্যপ্রমাণ থাকার কারণে সেই সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে আসেন। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার কিচেন কেবিনেটের সদস্যরা তাকে আর আস্থায় নিতে পারেননি। সে কারণে নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো আলোচনায়ও তাকে রাখা হয়নি। অবশ্য কিচেন কেবিনেট ও নির্বাচনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তাকে না রাখার ব্যাপারে তিনি নিজেই সম্প্রতি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে তথ্য প্রকাশ করেছেন। সেই সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার পর অন্য উপদেষ্টারা তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার পর তার পুত্র এম সাফাক হোসেন মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করতেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডেও সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক ছিল সাফাক হোসেনের বলেও জানা গেছে। তার নেপথ্য নেতৃত্বেই চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত হয়।
হুড়োহুড়িতে সিঁড়িতে পড়ে গেলেন শিরীন শারমিন
সাবেক এই স্পিকারকে অভ্যুত্থানের সময়কার একটি হত্যাচেষ্টার মামলায় হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন ছিল পুলিশের। তবে তাতে সায় দেননি আদালত। আবার জামিনের আবেদনও নাকচ করে দেন বিচারক। ঢাকার মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২০ মিনিটের শুনানি শেষে শিরীন শারমিনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। এ আদেশের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান তুললে তাদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের ধাক্কাধাক্কি হয়। শিরীন শারমিনকে হাজতখানায় যখন নেওয়া হচ্ছিল, তখন আওয়ামী লীগ সমর্থক একদল আইনজীবী স্লোগান তুললে উত্তেজনা দেখা দেয়। তাদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের ধাক্কাধাক্কি হয়।
এ সময় আদালত থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামানোর সময় ভিড়ের মধ্যে নিচতলার সিঁড়িতে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান শিরীন শারমিন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে টেনে তোলেন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। তবে ঢাকা সিএমএম আদালতের হাজতখানায় দায়িত্বরত উপপরিদর্শক মো. মোরশেদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, উনি পড়েননি। শেষ সিঁড়িতে এসে তার পা একটু বেঁকে যায়। আমাদের নারী পুলিশ সদস্যরা তাকে চারদিক থেকে ধরে রাখেন। তিনি পড়েননি।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের করা দুই দিন রিমান্ডের আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী। ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এই আসামি ‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ ছিলেন। তিনি বিনা ভোটে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি ‘ফ্যাসিস্ট সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে আন্দোলনে গুলি চালানোরও নির্দেশ’ দেন। এ মামলার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাঁকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে রিমান্ড আবেদন বাতিল করে শিরীন শারমিনকে জামিন দিতে আবেদন করেন ব্যারিস্টার মামুন, শামীম আল সাইফুল সোহাগসহ কয়েকজন আইনজীবী। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, এ মামলায় ১৩০ জনের নামসহ অজ্ঞানতানামা অনেকে আসামি আছেন। এজাহারে শিরীন শারমিনের নাম ছাড়া আর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এজাহারে ৩ নম্বরে তাঁর নাম থাকা ছাড়া আর একটা শব্দও যদি কিছু থাকে, তবে জামিন চাইব না।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে আজিমপুর সরকারি কলোনির ভেতরে গুলিবর্ষণে মো. আশরাফুল (ফাহিম) স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঘটনায় এই মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এবং শিরীন শারমিনসহ অন্যান্য আসামিদের প্রত্যক্ষ মদতে এই হামলা চালানো হয়। মামলার ৩ নম্বর আসামি হিসেবে গত রাতে ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ।