নিউ ইয়র্কের ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ স্বাস্থ্যবীমা সুবিধা হারাবেন ১ জুলাই থেকে


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 08-04-2026

নিউ ইয়র্কের ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ স্বাস্থ্যবীমা সুবিধা হারাবেন ১ জুলাই থেকে

নিউ ইয়র্কে ফেডারেল দারিদ্র্যসীমার ২০০ শতাংশ থেকে ২৫০ শতাংশ আয়ের মধ্যে থাকে যারা এসেনশিয়াল হেলথ প্ল্যান গ্রহণ করছেন তাদের স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদি স্টেট সরকার দ্রুত কোনো পদক্ষেপ না নেয় তাহলে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ আগামী ১ জুলাই থেকে তাদের স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা হারাবেন। ইতোমধ্যে এই সম্ভাব্য ক্ষতির বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনপ্রণেতা, প্রশাসন এবং অধিকারকর্মীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।এই সংকটের মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল পর্যায়ে নেওয়া বাজেটসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। গত বছর রিপাবলিকানদের অনুমোদিত ব্যয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কিছু পরিবর্তন ও কাটছাঁট করা হয়, যার ফলে নিউ ইয়র্কের এসেনশিয়াল প্ল্যান নামে পরিচিত স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি বড় ধরনের প্রভাবের মুখে পড়ে।

এই এসেনশিয়াল প্ল্যানটি মূলত কম ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য স্বল্প বা বিনামূল্যে স্বাস্থ্যবিমা নিশ্চিত করত। আগে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, এই পরিবর্তনের কারণে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ তাদের স্বাস্থ্যবিমা হারাতে পারেন। তবে সাম্প্রতিক ট্রাম্প প্রশাসনের এক ফেডারেল অনুমোদনের ফলে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজারে।

যারা ফেডারেল দারিদ্র্যসীমার ২০০ শতাংশ থেকে ২৫০ শতাংশ আয়ের মধ্যে পড়েন, তারাই মূলত এ ঝুঁকিতে আছেন। আগে স্টেট সরকারের সম্প্রসারণের কারণে এ শ্রেণির মানুষও এসেনশিয়াল প্ল্যানের আওতায় ছিলেন। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী তারা আর এ সুবিধার জন্য যোগ্য থাকবেন না। ফলে এ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখন স্বাস্থ্যবীমা হারানোর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

ফেডারেল সেন্টার ফর মেডিকেয়ার অ্যান্ড মেডিকেইড সার্ভিসেস গত ২০ মার্চ নিউ ইয়র্কের একটি অনুরোধ অনুমোদন করে। এর ফলে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ তাদের বর্তমান স্বাস্থ্যবিমা ধরে রাখতে পারবেন। তবে এর মূল্য দিতে হয়েছে ওই ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষের জন্য, যারা এখন এ সুবিধা থেকে বাদ পড়ছেন। এই অনুমোদনের ফলে নিউ ইয়র্ক আবার অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের অধীনে পরিচালিত বেসিক হেলথ প্রোগ্রামে ফিরে যাচ্ছে, যার আওতায় এখন কেবল দারিদ্র্যসীমার ২০০ শতাংশ পর্যন্ত আয়ের মানুষই অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিউ ইয়র্ক স্টেটের আইনপ্রণেতারা নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। স্টেট সিনেটের স্বাস্থ্য কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর গুস্তাভো রিভেরা একটি বিল প্রস্তাব করেছেন, যার লক্ষ্য হলো এ ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য নতুনভাবে স্বাস্থ্যবিমা নিশ্চিত করা। একই ধরনের প্রস্তাব আনতে যাচ্ছেন অ্যাসেম্বলি সদস্য অ্যামি পলিন। প্রস্তাবিত এ বিল অনুযায়ী, স্টেট সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ওই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যবিমা খরচ বহন করবে। অর্থাৎ যারা ফেডারেল সুবিধা হারাবেন, তাদের জন্য স্টেট নিজেই একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

এ পরিকল্পনার খরচ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। সিনেটর রিভেরার মতে, এর খরচ সর্বনিম্ন ৪০০ মিলিয়ন ডলার হতে পারে এবং সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, যদিও তিনি মনে করেন সর্বোচ্চ খরচের সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, ফান্ড আছে এবং খরচও খুব বেশি হবে না। আমরা ৪০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে শুরু করতে পারি। তবে নিউ ইয়র্ক স্টেট বাজেট পরিচালক ব্লেক ওয়াশিংটন এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। তার মতে, পুরো ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে কভার করতে গেলে খরচ ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এ ব্যয় নিউ ইয়র্ক স্টেটের জন্য একটি বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।

অ্যাসেম্বলি স্পিকার কার্ল হেস্টি মনে করেন, প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্যবীমা পুরোপুরি হারানো মানুষের সংখ্যা ৪ লাখ ৫০ হাজারের চেয়ে কম হতে পারে। তার মতে, অনেকেই আবার তাদের নিয়োগকর্তার দেওয়া স্বাস্থ্যবীমা বা অন্য কোনো বেসরকারি পরিকল্পনায় ফিরে যেতে পারেন। তিনি ধারণা দেন, প্রকৃতপক্ষে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সম্পূর্ণভাবে বীমাহীন হয়ে পড়তে পারেন।

বাজেট পরিচালক ওয়াশিংটনও এ ধারণার সঙ্গে একমত। তিনি জানান, প্রায় ৩ লাখ মানুষ তাদের পুরোনো কর্মস্থলের বীমা বা স্বাস্থ্য এক্সচেঞ্জের পরিকল্পনায় ফিরে যেতে পারেন, যদিও এতে তাদের খরচ বাড়বে। এ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে রাজ্য ক্যাপিটলে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। অধিকারকর্মীরা দাবি করছেন, সরকার যেন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে এ মানুষদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করে। তাদের মতে, স্বাস্থ্যবীমা একটি মৌলিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে কাউকে এর বাইরে রাখা উচিত নয়।

নিউ ইয়র্ক স্টেটের স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যে সম্ভাব্য পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। এসেনশিয়াল প্ল্যানের নির্বাহী পরিচালক ড্যানিয়েল হোলাহান জানান, তার দল ইতোমধ্যে গ্রাহকদের কাছে চিঠি পাঠানো শুরু করেছে, যাতে তারা আগাম পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেন। এছাড়াও ইমেইল ও টেক্সট মেসেজের মাধ্যমেও তথ্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, যাতে মানুষ সহজ ভাষায় বুঝতে পারেন কী ঘটতে যাচ্ছে এবং তাদের কী কী বিকল্প রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা চাই মানুষ স্পষ্টভাবে জানুক যে কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে এবং কখন থেকে কার্যকর হবে।

তবে পুরো পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত। ঠিক কতজন মানুষ শেষ পর্যন্ত বিমাহীন হয়ে পড়বেন, তা নির্ভর করছে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর যেমন নিয়োগকর্তারা কী সিদ্ধান্ত নেন, এবং মানুষ কী বিকল্প বেছে নেন। হোলাহান স্বীকার করেন, সব ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিমাহীন হয়ে পড়বেন এমনটা আমরা মনে করি না। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি কী হবে, তা বলা কঠিন। তিনি আরো বলেন, ফেডারেল সরকারের সিদ্ধান্ত পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে, যার ফলে পরিকল্পনা প্রণয়নেও বিলম্ব হয়েছে। এখন খুব অল্প সময়ের মধ্যে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

বর্তমানে নিউ ইয়র্ক স্টেটের বাজেট নিয়ে আলোচনা চলছে, এবং স্বাস্থ্যবীমার এ বিষয়টি সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। আইনপ্রণেতারা আশা করছেন যে একটি সমাধান বের হবে, তবে সেটি সম্পূর্ণ স্টেট অর্থায়নে হবে, আংশিক সহায়তার মাধ্যমে হবে, নাকি অন্য কোনো উপায়ে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

নিউ ইয়র্কের এ স্বাস্থ্যবীমা সংকট শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি লাখো মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়বহুল হওয়ায় বীমা ছাড়া চিকিৎসা পাওয়া অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে রাজ্য সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর নির্ভর করবে লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসুরক্ষা। একদিকে আর্থিক চাপ, অন্যদিকে মানুষের মৌলিক অধিকার, এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই এখন নিউ ইয়র্কের নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)