সকালটা শুরু হয়েছিল সিন্টাগমা স্কোয়ারের পাশের ছোট্ট ক্যাফেতে এক কাপ গাঢ় গ্রিক কফি দিয়ে। অ্যাথেন্সের শীতল বসন্তের হাওয়া তখনও রাস্তার গাছগুলোর পাতা নাড়িয়ে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময় ক্যাফের দরজা ঠেলে ভেতরে এলো সোফিয়া-আমার সেদিনের গাইড। নীল চোখ, কাঁধ পর্যন্ত কালো চুল, হালকা হাসিতে গালে টোলপড়া। হাতে একটা পুরোনো ডায়েরি।
সুরেলা গলায় বললো, kalimera।
আমিও প্রত্যুত্তরে বললাম, kalimera।
(গ্রিক ভাষায় ‘kalimera’ শব্দের অর্থ হলো, ‘শুভ সকাল’ বা ‘সুপ্রভাত’। এটি সাধারণত সকালে কাউকে অভিবাদন জানানোর জন্য ব্যবহার করা হয়, ঠিক যেমন আমরা বাংলায় বলি ‘সুপ্রভাত’)। আমাদের সেদিনের গন্তব্য ডাফনি মঠ (Daphni Monastery)। অ্যাথেন্স শহর থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার পশ্চিমে, হাইদারি শহরতলিতে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত এ মঠটি, তার অপূর্ব সোনালি পটভূমির মোজাইকের জন্য গ্রিসের সেরা শিল্পকর্মগুলোর একটি। আমরা রওনা হলাম M3 মেট্রোতে চড়ে, Agia Marina স্টেশন পর্যন্ত। সোফিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে বললো-জানো, এ পথটা একটা সাধারণ রাস্তা নয়। এটা ছিল Iera Odos-পবিত্র সড়ক। প্রাচীন গ্রিসে এ পথ ধরেই তীর্থযাত্রীরা অ্যাথেন্স থেকে ইলিউসিসে যেতেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর মঠটা এই পথেই?’ সে হাসলো। বললো, ঠিক মাঝামাঝি জায়গায়। সাত বর্গমাইল বিস্তৃত লরেল বনের মাঝখানে এ মঠটি দাঁড়িয়ে আছে, যে বন থেকেই এর নাম ‘ডাফনি’, গ্রিক ভাষায় যার মানে ‘লরেল পাতা’। মেট্রো থেকে নেমে বাসে উঠলাম। জানালা দিয়ে দেখলাম
অ্যাথেন্সের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে, কংক্রিটের জায়গায় সবুজ গাছপালা, শহরের কোলাহলের বদলে পাখির ডাক।
বাস থামলো ‘Byzantio’ স্টপে। সামনেই সেই লরেল বন, সবুজ, ঘন, রহস্যময়। তার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়লো পাথরের উঁচু দেওয়াল। ‘এ দেওয়াল দেখো-সোফিয়া বললো হাত দিয়ে পাথর স্পর্শ করতে করতে। ‘এ প্রতিরক্ষা-প্রাচীর, বুরুজ আর দ্বিদ্বার-সবই বলে দেয়, একসময় এটি শুধু প্রার্থনার জায়গা ছিল না, ছিল একটা দুর্গও।’ ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দিকে এ মঠটি প্রথম নির্মিত হয়েছিল, সেই জায়গায়, যেখানে গথরা ৩৯৫ খ্রিস্টাব্দে অ্যাপোলোর মন্দির ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছিল।
ভেতরে ঢুকে প্রথমেই যা চোখে পড়লো, একটি একাকী আয়োনিক স্তম্ভ, নার্থেক্সের পাশে দাঁড়িয়ে। সোফিয়া বললো, ‘এটি সেই অ্যাপোলো মন্দিরের স্তম্ভ। লর্ড এলগিন বাকি সব স্তম্ভ খুলে লন্ডনে নিয়ে গেছেন। এটিই শুধু টিকে আছে।’ একটু থেমে যোগ করলো, ‘গথরা ধ্বংস করেও ছেড়ে দিয়েছিল, কিন্তু একজন ব্রিটিশ লর্ড সেটা পারেননি।’
আমরা দুজনেই হাসলাম। মূল গির্জার ভেতরে ঢুকতেই থমকে গেলাম।
সিলিং থেকে মেঝে পর্যন্ত, সর্বত্র মোজাইক। সোনালি পটভূমিতে নীল, লাল, সবুজের বিচিত্র সমাহার। আর সবার উপরে, গম্বুজের কেন্দ্রে ক্রাইস্ট প্যান্টোক্রেটর-সর্বশক্তিমান খ্রিস্টের মুখ। গম্ভীর, অনুভবহীন দৃষ্টি, কিন্তু অপার শক্তির ছায়া। সোফিয়া আস্তে বললো, প্রায় ফিসফিস করে-‘এ গির্জার স্থাপত্যের ধারণাটা ছিল-গম্বুজ হলো স্বর্গ আর মেঝে হলো পৃথিবী। পুরো চার্চটি যেন মহাবিশ্বের একটি প্রতীক। আমি গম্বুজের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। হাজার বছরের পুরোনো সে চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে, মনে হলো সময় যেন এখানে থেমে গেছে।
মোজাইকগুলোতে রয়েছেন ষোলোজন পুরোনো নিয়মের নবী, কুমারী মেরির জীবনের দৃশ্য এবং খ্রিস্টের জীবন কাহিনির নানা মুহূর্ত। শিল্পীরা নাম রেখে যাননি, কিন্তু তাদের হাতের স্পর্শ হাজার বছর পরেও জ্বলজ্বল করছে। এ মোজাইকগুলো তৈরির কাচ ইতালি বা কনস্টান্টিনোপল থেকে আসেনি, সোফিয়া বললো। ‘গবেষকরা মনে করেন, এ কাচ এখানেই তৈরি হয়েছিল। সোনালি রঙের অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতা এ মোজাইককে পৃথিবীর সেরা বাইজেন্টাইন শিল্পকর্মগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
বাইরে বেরিয়ে আঙিনায় দাঁড়ালাম। একটু দূরে নবম শতাব্দীর ছোট্ট আগিওস নিকোলাস চ্যাপেল, মঠের গোরস্তানের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে। ক্রুসেডাররা এসে এ মঠ লুট করে গিয়েছিল ১২০৫ সালে, বললাম আমি। ‘হ্যাঁ। এরপর ডিউক অব অ্যাথেন্স এটি সিস্টার্সিয়ান সন্ন্যাসীদের দেন। তারা গথিক ধাঁচের স্তম্ভ যোগ করেন, কিন্তু মোজাইকে হাত দেননি। তারপর অটোমানরা এলেন, মঠটি আবার অর্থোডক্স সন্ন্যাসীদের ফিরিয়ে দেওয়া হলো। সোফিয়া একটু হাসলো। এ মঠ অনেক শাসক দেখেছে। কিন্তু প্রতিবারই টিকে থেকেছে।
হাঁটাহাঁটিতে পেট জানান দিচ্ছিলো ক্ষুধা লেগেছে। এ কথা বলতেই সোফিয়া দ্রুত আমাকে নিয়ে শহরতলিতেই একটি ছোট্ট তাভেরনায় ঢুকলো- সাদা দেওয়াল, নীল জানালার পাল্লা, টেরাকোটা টাইলের মেঝে। মেনুতে চোখ বুলিয়ে সোফিয়া বললো, আজকের দিনটা পুরোপুরি গ্রিক হওয়া উচিত। মৌসাকা এবং হরিয়াতিকি সালাতা-মানে গ্রিক সালাদ। কেমন? আমি রাজি। খাবার এল- বেগুন, কিমা আর বেশামেল সস-এর মৌসাকার উপর পাউরুটির মতো মচমচে চাদর, সঙ্গে তাজা টমেটো, জলপাই আর ফেটা পনিরের সালাদ। আমি সোফিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, ইতিহাস কি তোমার খুব প্রিয়?
সোফিয়া সামান্য হাসলো। বললো, আমার দাদু বলতেন, গ্রিসে যে হাঁটে, সে ইতিহাসের ওপর দিয়েই হাঁটে। আমি শুধু মানুষকে সেটা দেখাতে সাহায্য করি। রোদের আলো জানালা দিয়ে পড়ছে তার মুখে সে মুহূর্তটা এখনো মনে আছে। ফেরার পথে, Agia Marina মেট্রো স্টেশনের কাছে একটা ছোট ক্যাফেতে থামলাম। টেরেসে বসা যায়, সামনে ছোট্ট পার্ক।
সোফিয়া অর্ডার করলো ফ্রেডো ক্যাপুচিনো-গ্রিসের নিজস্ব ঠান্ডা কফি। আমি নিলাম মাস্টিহা চা-চিওস দ্বীপের গাছের রস থেকে তৈরি, হালকা সুগন্ধী। সঙ্গে এল কৌলৌরি-তিল ছড়ানো রিং রুটি। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে, আমরা আবার ফিরে যাচ্ছি এথেন্স শহরের দিকে। বিদায়ের সময় সোফিয়া বললো, আজকের দিনটা মনে থাকবে?
আমি বললাম, এ মঠের জন্য থাকবে আর একটু তোমার জন্যও। সে হেসে বললো, তাহলে আবার এসো। অ্যাথেন্সে গল্পের শেষ কখনো হয় না। মেট্রোতে ফেরার পথে অ্যাথেন্সের সন্ধ্যা নামছিল। অ্যাক্রোপোলিসের পাথুরে মাথায় কমলা রঙের আলো। আমি ভাবছিলাম, এ শহরে একদিন প্রাচীন গ্রিস ছিল, তারপর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য, তারপর অটোমান, তারপর আধুনিক গ্রিস। কিন্তু ডাফনির সেই গম্বুজ, সেখানে সময় আটকে আছে। হাজার বছর ধরে। সোফিয়া ট্রেনে উঠতে উঠতে বললো, পরের বার আসলে হোসিওস লৌকাস মঠে নিয়ে যাবো। এটাও এ ডেলফির পথে।
আমি হাসলাম। ‘ইন্তেজার থাকবো।’ দরজা বন্ধ হলো। ট্রেন ছুটলো অ্যাথেন্সের বুকে। আর আমি জানালা দিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, শহরটা এগিয়ে চলেছে, কিন্তু সেই লরেল বনের ভেতরে একটা মঠ স্থির দাঁড়িয়ে আছে, যেন কালের সাক্ষী হয়ে।