নিউ ইয়র্ক বনাম ট্রাম্প প্রশাসন : ৭৩ মিলিয়ন ডলারের তহবিল স্থগিত


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 29-04-2026

নিউ ইয়র্ক বনাম ট্রাম্প প্রশাসন : ৭৩ মিলিয়ন ডলারের তহবিল স্থগিত

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ও নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্য সরকারের মধ্যে নীতিগত দ্বন্দ্ব আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। নন-সিটিজেনদের কমার্শিয়াল ড্রাইভার লাইসেন্স (সিডিএল) বাতিল না করায় নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের জন্য নির্ধারিত ৭৩ মিলিয়ন ডলারের ফেডারেল হাইওয়ে তহবিল স্থগিত করে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এরই প্রেক্ষিতে নিউ ইয়র্ক স্টেট সরকার ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করেছে, যা এখন গড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আপিল আদালতে।

নিউ ইয়র্ক স্টেট অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস গত ২৪ এপ্রিল ইউএস কোর্ট অব আপিলস ফর দ্য সেকেন্ড সার্কিট এ মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, ফেডারেল সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ও আইনবহির্ভূতভাবে তহবিল আটকে দিয়ে নিউ ইয়র্ককে চাপ সৃষ্টি করছে, যাতে তারা তাদের বৈধভাবে ইস্যু করা ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করতে বাধ্য হয়।

নিউ ইয়র্ক স্টেটের বর্তমান আইন অনুযায়ী, যারা যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস করছেন এবং ফেডারেল ওয়ার্ক অথরাইজেশন রয়েছে, তারা কমার্শিয়াল ড্রাইভার লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য। এ লাইসেন্সধারীরা ট্রাক, বাসসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক যান চালাতে পারেন, যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি নির্দেশ দেয় যে, শুধু নির্দিষ্ট তিন ধরনের ভিসাধারী এইচ-২ এ, এইচ-বি এবং ই ট-২ নন-সিটিজেনদেরই সিডিএল দেওয়া যাবে। এ নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে নিউ ইয়র্ক নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করলেও, ইতোমধ্যে বৈধভাবে ইস্যু করা লাইসেন্সগুলো বাতিল করতে অস্বীকৃতি জানায়। এ সিদ্ধান্তই মূলত দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফেডারেল সরকারের পক্ষে ট্রান্সপোর্টেশন ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারি শন ডাফি নিউ ইয়র্কের এই নীতিকে জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অপরীক্ষিত ও অযোগ্য বিদেশি চালকদের কারণে আমেরিকানদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। তিনি আরো বলেন, ফেডারেল সরকার রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য, এবং নিউ ইয়র্কের নীতিকে তিনি অ্যান্টি-আমেরিকান বলে উল্লেখ করেন। এ অবস্থানের ভিত্তিতেই হাইওয়ে তহবিল স্থগিত করা হয়েছে বলে জানায় ফেডারেল প্রশাসন।

অন্যদিকে নিউ ইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোচুল এবং অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস এ অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, নিউ ইয়র্ক সবসময়ই ফেডারেল নিয়ম মেনেই সিডিএল ইস্যু করেছে এবং করছে। হচুল বলেন, এটি কোনো নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নয়, বরং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত তহবিল কেটে নেওয়া শুধু বেআইনি নয়, বরং এটি জনগণের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

লেটিশিয়া জেমস তার দায়ের করা মামলায় কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, ফেডারেল সরকারের সিদ্ধান্ত খামখেয়ালি ও যুক্তিহীন, এটি প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নিয়মের ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে। মামলায় উল্লেখ করা হয়, পরিবহন বিভাগ তাদের নিজস্ব নিয়মকেই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছে এবং কোনো শক্ত প্রমাণ ছাড়াই নিউ ইয়র্ককে অসঙ্গতিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এ ৭৩ মিলিয়ন ডলারের তহবিল নিউ ইয়র্কের রাস্তা, সেতু ও পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল। এ অর্থ স্থগিত হওয়ার ফলে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বিলম্বিত হতে পারে বা বাতিল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। মামলায় আরো বলা হয়েছে, যদি এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে প্রতি বছর প্রায় ১৪৭ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত তহবিল হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এই আর্থিক ক্ষতি শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই প্রভাব ফেলবে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জননিরাপত্তার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

নিউ ইয়র্ক কর্তৃপক্ষের মতে, নন-সিটিজেন ড্রাইভারদের লাইসেন্স বাতিল করা হলে পরিবহন খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ট্রাকিং, ডেলিভারি এবং স্কুল বাস সার্ভিসে চালকের অভাব দেখা দিতে পারে। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে এবং স্কুলগামী শিশুদের পরিবহনেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ফেডারেল আইনের অধীনে, পরিবহন বিভাগের মতো সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে তা ফেডারেল সার্কিট কোর্টে দায়ের করতে হয়। সেই অনুযায়ী নিউ ইয়র্ক ইউ এস কোর্ট অব আপিলস ফর দ্য সেকেন্ড সার্কিটে পিটিশন দায়ের করেছে। রাজ্য সরকার আদালতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে, দ্রুত এই মামলার শুনানি সম্পন্ন করা হোক, যাতে তহবিল বন্ধ হওয়ার আগে একটি সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এ বিরোধ শুধু ড্রাইভার লাইসেন্স ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ফেডারেল বনাম অঙ্গরাজ্য ক্ষমতার সংঘাতের একটি বড় উদাহরণ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যেখানে নিউ ইয়র্কের মতো ডেমোক্র‍্যাট-নিয়ন্ত্রিত রাজ্যগুলো তুলনামূলকভাবে উদার নীতি অনুসরণ করে আসছে। এই নীতিগত পার্থক্যই একাধিক ইস্যুতে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে যার সর্বশেষ উদাহরণ এ তহবিল সংকট।

বর্তমান পরিস্থিতি নিউ ইয়র্কের জন্য শুধু একটি আইনি চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর নীতিগত ও রাজনৈতিক লড়াই। একদিকে রয়েছে ফেডারেল সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতি, অন্যদিকে রাজ্যের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদা। আদালতের রায় এই দ্বন্দ্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি নিউ ইয়র্ক জয়ী হয়, তবে তা রাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে একটি বড় নজির স্থাপন করবে। আর যদি ফেডারেল সরকার জয়ী হয়, তাহলে অভিবাসন ও লাইসেন্স নীতিতে আরো কঠোরতা আসতে পারে। এখন নজর সবার ইউএস কোর্ট অব আপিলস ফর দ্য সেকেন্ড সার্কিটের দিকে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)