স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরও ক্ষমতায়নে বিভাগীয় পর্যায়ে “লোকাল পার্লামেন্ট” গঠন করতে হবে


বিশেষ প্রতিনিধি , আপডেট করা হয়েছে : 30-04-2026

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরও ক্ষমতায়নে বিভাগীয় পর্যায়ে “লোকাল পার্লামেন্ট” গঠন করতে হবে



স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরও ক্ষমতায়নের বিভাগীয় পর্যায়ে “লোকাল পার্লামেন্ট” গঠন করতে হবে।  যেখানে বিভাগের সংসদ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে সমস্যা ও সমাধান উপস্থাপন করতে পারবেন। এছাড়া পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিতে প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে একজন পেশাজীবী পরিকল্পনাবিদ নিয়োগের ব্যবস্থা থাকবে।


এসব প্রস্তাব উঠে আসে মঙ্গলবার(২৮ এপ্রিল) ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) উদ্যোগে “উপজেলা পরিষদে এমপি অফিসঃ বিকেন্দ্রীকরণ না কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ?” শীর্ষক একটি সংবাদ সম্মেলনে। ঢাকাস্থ প্ল্যানার্স টাওয়ারের বিআইপি কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয়। বিআইপি’র সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান, পিএইচডি এর সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউটের সহ-সভাপতি (এক) পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান।


মূল প্রবন্ধে পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন,আঞ্চলিক ও গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনা মূলত স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। অধিকাংশ উন্নয়ন কার্যক্রম স্থানীয় পর্যায়েই বাস্তবায়িত হয়; তাই পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ যদি কে›ন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে, তবে তা কার্যকর ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। চলমান সংসদ অধিবেশনে উত্থাপিত প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ স্থাপনের সরকারি উদ্যোগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখতে পাই সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর ফলে জবাবদিহিতা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পরে এবং স্থানীয় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, ভিন্ন রাজনৈতিক দলের যেমন, সরকারদলীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য বা বিরোধীদলীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও সরকারদলীয় সংসদ সদস্য উপস্থিতিতে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায় “দ্বৈত নেতৃত্ব” পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা, বিলম্ব ও দ্বন্ধ সৃষ্টি করে এবং বঞ্চিত হন সাধারণ জনগন। তবে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সাংবিধানিক সীমারেখা অনুসরণ করা হলে এই অবস্থান কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেও সহায়ক হতে পারে। তিনি জানান, একজন সংসদ সদস্যের মূল কাজ আইন প্রণয়ন করা, অন্যদিকে স্থানীয় সরকারের কাজ হচ্ছে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেয়া- এই দুইয়ের স্পষ্টত সীমারেখা থাকা জরুরি। বর্তমান বাস্তবতায় উপজেলা পর্যায়ে পেশাজীবী পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ করার মাধ্যমে উপজেলা পরিষদের কাঠামোকে সুদৃঢ় করা সম্ভব। কারণ উপজেলা পর্যায়ে সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার অভাবই উন্নয়নের প্রধান বাধা। একজন পেশাজীবী পরিকল্পনাবিদের মাধ্যমে ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো, পরিবেশ ও নগর-গ্রাম সংযোগকে সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন।


পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মুঃ মোসলেহ উদ্দীন হাসান, পিএইচডি তার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে উপজেলা, জেলা ও পৌরপরিষদের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি সম্পর্কে সবার সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। তিনি বলেন, নিরাপদ নগর, ফুটপাত সংকট, মানসম্মত গণপরিবহন, জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত উন্নয়নসহ স্থানীয় সমস্যাগুলোর সমাধান স্থানীয় সরকারের কার্যকর ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল। তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরও ক্ষমতায়নের আহ্বান জানান এবং বিভাগীয় পর্যায়ে “লোকাল পার্লামেন্ট” গঠনের প্রস্তাব দেন, যেখানে বিভাগের সংসদ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে সমস্যা ও সমাধান উপস্থাপন করতে পারবেন। এছাড়া পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিতে প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে একজন পেশাজীবী পরিকল্পনাবিদ নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরও জানান, এমন প্রশ্ন আমরা প্রতিনিয়তই করি, যে আমাদের নগর ব্যবস্থা, পরিবহন ব্যবস্থা, পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত দেশের নগরব্যবস্থার ন্যায় কেন হয় না। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, এই প্রত্যেকটি উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালনার দ্বায়িত্বগুলো স্থানীয় সরকারের উপর ন্যাস্ত। একটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এর মাঝে একটি ক্ষমতার টানাপোড়ন লক্ষ করা যায়, এখন উপজেলা পরিষদে এমপির কার্যালয় স্থাপন করা হলে এই সংকট আরও বৃদ্ধি পাবে।


সংবাদ সম্মেলন থেকে সুপারিশমালায় বলা হয়, এমপি’র অফিস থাকতে পারে - কিন্তু স্থানীয় সরকারের ভেতরে নয়। প্রয়োজনে এমপিদের জন্য স্বতন্ত্র কনস্টিটুয়েন্সি অফিস (উপজেলা-জেলা পর্যায়ে) স্থাপন করা যেতে পারে-তবে প্রাথমিকভাবে ভার্চুয়াল প্লাটফরম স্থাপন করা যেতে পারে। এমপি’র ভূমিকা নীতিনির্ধারণ ও নজরদারিতে সীমাবদ্ধ রাখা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সরকারের ওপর কেন্দ্রীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ না করা। স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় এমপি’র সরাসরি সিদ্ধান্তগ্রহণ ভূমিকায় না থাকা। এমপি - উপজেলা চেয়ারম্যান - প্রশাসনের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় কাঠামো তৈরি। এমপিদের জন্য নির্দিষ্ট জনসেবা প্ল্যাটফর্ম (ঢ়ঁনষরপ যবধৎরহম ংুংঃবস) চালু করা। এঠাড়া শক্তিশালী ও কার্যকর উপজেলা পরিষদ গঠন এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন বিষয়ক সুপারিশমালায় বলা হয় অবিলম্বে স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের নেতৃতে উপজেলার পরিচালন নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা পরিষদকে প্রকৃত স্থানীয় শাসন কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে উপজেলা পরিষদের পূর্ণ ক্ষমতা নিশ্চিত করা। উপজেলা পর্যায়ে পেশাদার পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ দিতে হবে। সেজন্য উপজেলা সমন্বিত স্থানিক (ঝঢ়ধঃরধষ) পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা এবং সে মোতাবেক সকল উন্নয়ন কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে।


এছাড়া স্থানীয় সরকার কমিশন ২০২৫ এর রিপোর্ট পুনঃমূল্যায়নের জন্যে একটা সর্বদলীয় চধৎষরধসবহঃধৎু কমিটি গঠন এবং এই কমিতিতে পরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন পেশাজীবী এবং বিষয়ভিত্তিক এক্সপার্ট অর্ন্তভুক্ত করা এবং স্থানিয় সরকার ব্যাবস্থার আধুনিকায়নের জন্যে প্রয়োজনীয় নীতি বাস্তবায়নের কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে।   


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)