বাংলাদেশ জুড়ে এখনও রহস্যাবৃত রয়ে গেছে সেদিন মতিঝিলের শাপলাচত্বরে কী ঘটেছিল। ওই রাতের ঘটনা মিডিয়ায় যেমন কিছু আসেনি, তেমনি এ নিয়ে চাপা এক উত্তেজনা ছিল সর্বত্র। পক্ষে বিপক্ষে বহুমত বহু কথা হলেও সরকারের যে বক্তব্য সেটাকেই মেনে নিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। দীর্ঘদিন পর শেখ হাসিনার পতন ও অন্তবর্তী সরকারের আমল পেরিয়ে এবার রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে।
কেননা ২০১৩ সালের ৫ মে’র ঘটনাটি ছিল মূলত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং শাহবাগ সে সময় অনুষ্ঠিত আন্দোলনের বিপরীতে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। এক পক্ষ মনে করে এটি ছিল রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, অন্য পক্ষ মনে করে এটি ছিল নিরস্ত্র ধর্মীয় সমাবেশের ওপর বর্বরোচিত হামলা। বর্তমানে বিভিন্ন তদন্ত কমিশন ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
এদিকে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত প্রায় শেষ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত শুধু ঢাকায়ই ৩২ জনকে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
আগামী ৭ জুনের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে রোববার (৩ মে) সাংবাদিকদের জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর। এর আগে গত ৫ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় দুই মাস বাড়িয়েছিলেন।
শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মের ওই ঘটনা নিয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর অভিযোগ করেছিলেন হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুল হক।
হেফাজত নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে করা এ অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। প্রসিকিউশন সূত্র জানায়, মামলাটিতে বর্তমানে তদন্ত চলছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পেলে মামুনকে এ মামলায় আসামি করা হতে পারে।
এ মামলায় ছয় আসামি গ্রেফতার হয়েছেন। তারা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির এবং সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল।
শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট
কালের পরিক্রমায় এখন ২০২৬। এখন থেকে বহুপূর্বে অর্থাৎ ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ এবং পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা। এই ঘটনাকে কেন ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, তার পেছনে মূলত হতাহতের সংখ্যা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবির প্রেক্ষাপট রয়েছে। সেদিন হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি ছিল ঢাকা অবরোধ এর। বিকেলে কর্মসূচি শেষ করে চলে যাবার কথা যার যার অবস্থানে। কিন্তু হঠাৎ করেই অবরোধ কর্মসূচি পালনের একেবারে শেষ মুহূর্তে সবাই ছুটতে শুরু করেন মতিঝিলের উদ্দেশ্যে। জড়ো হন সবাই মতিঝিলের শাপলা চত্তরে। এর অধিকাংশই পায়ে হেটে এসেছিলেন তাদের কর্মসূচি পালনের স্থান থেকে।
পরে রাতে অবস্থান করতে থাকেন শাপলা চত্তরে এবং সেখানে সমাবেশ চলে। এক পর্যায়ে জিকিররত ছিলেন হেফাজতের ব্যানারে আসা মাদ্রাসা শিক্ষক-ছাত্রসহ সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসল্লী। কেননা তারা নেমেছিল মূলত ইসলাম ধর্মের অবমাননার প্রতিবাদে।
রাতেই চলে ওই নরকীয় কান্ড, যার প্রমাণ বের হতে শুরু করেছে।
কেন শাপলা চত্তরের ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ বলা হচ্ছে। কারণ সেদিনের হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। সরকারি হিসেবে তথা সরকারের পক্ষ থেকে সে সময় জানানো হয়েছিল যে, অভিযানে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি বা নিহতের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত নগণ্য (১১ জনের মতো, যাদের অধিকাংশই পুলিশ বা সাধারণ মানুষ)। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছিল যে, সেই রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ৬১ জন নিহত হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম দাবি করেছিল এই সংখ্যা কয়েকশ থেকে হাজার পর্যন্ত। এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর দাবি থেকেই ‘গণহত্যা’ শব্দটি সামনে আসে।
আরো একটি সন্দেহজনক বিষয় ছিল, ঘটনাটি সংগঠিত হয়, গভীর রাতে অভিযান ও গণমাধ্যম বন্ধ করে। অভিযানটি চালানো হয়েছিল ৫ মে দিবাগত রাত ২টার পর, যখন মতিঝিল এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিল। এছাড়া সেই সময়ে সরাসরি সম্প্রচার করতে থাকা দুটি টেলিভিশন চ্যানেল (দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি) বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, অন্ধকারে এবং মিডিয়ার অনুপস্থিতিতে এই শক্তির ব্যবহার ছিল নজিরবিহীন, যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় ও বিতর্কিত করে তোলে।
পরবর্তিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ এবং ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ সেই সময় গভীর রাতে বিপুল সংখ্যক ফোর্স নিয়ে আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছিল। তারা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তোলে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই ঘটনা নিয়ে পুনরায় তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অনেক ভুক্তভোগী পরিবার এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা গণহত্যা হিসেবে দাবি করে মামলা করছে।
মামলার আসামি হয়েছেন যারা
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক সংসদ সদস্য হাজী সেলিম, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ, ডিএমপির সাবেক উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার, একাত্তর টিভির সাবেক সিইও মোজাম্মেল হক বাবু, সময় টিভির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আহমেদ জোবায়ের, এবিনিউজ২৪ ডটকমের সম্পাদক সুভাষ সিংহ রায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব নাইমুল ইসলাম খান, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ এবং এনএসআইয়ের মো. মনজুর আহমেদ।