২৬৮ বিলিয়ন ডলারের বাজেট চুক্তিতে নিউ ইয়র্কের কঠোর অভিবাসন নীতি


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 13-05-2026

২৬৮ বিলিয়ন ডলারের বাজেট চুক্তিতে নিউ ইয়র্কের কঠোর অভিবাসন নীতি

নিউ ইয়র্ক স্টেটের গভর্নর ক্যাথি হোচুল ২৬৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজেট কাঠামো নিয়ে গত ৭ মে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে একটি প্রাথমিক সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছেন। এ বাজেটে একদিকে যেমন নিউ ইয়র্ক সিটির বহু মিলিয়ন ডলারের দ্বিতীয় বাড়ির ওপর নতুন কর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে, তেমনি শিশু পরিচর্যা, পরিবেশ, সড়ক নিরাপত্তা এবং অভিবাসন নীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। নিউ ইয়র্কে আইস কর্মকর্তাদের মুখোশ পরে অভিযান পরিচালনা নিষিদ্ধ, যদিও গভর্নর এ সমঝোতাকে বড় অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরেছেন, আইনসভার নেতারা স্পষ্ট করে বলেছেন যে এখনো পূর্ণাঙ্গ বাজেট চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। 

নিউ ইয়র্ক সিটির বিলাসবহুল দ্বিতীয় বাড়ির ওপর নতুন কর, যা পিয়েড-আ-তের ট্যাক্স নামে পরিচিত, সেটির বাস্তবায়ন কীভাবে হবে তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। হোচুল বলেন, এ কর কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করতে আরো চার-পাঁচদিন সময় লাগতে পারে। প্রস্তাবিত এ নতুন কর মূলত নিউ ইয়র্ক সিটিতে বসবাস না করেও সেখানে বহু মিলিয়ন ডলারের দ্বিতীয় বাড়ি রাখা ধনী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে করা হচ্ছে। রাজ্য প্রশাসনের আশা, এ কর থেকে বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব আসবে, যা নিউ ইয়র্ক সিটির বাজেট ঘাটতি কমাতে সহায়তা করবে। 

নতুন বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো নিউ ইয়র্ক সিটির বিলাসবহুল দ্বিতীয় বাড়ির ওপর নতুন কর আরোপ। এ কর মূলত সেই ধনী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে করা হচ্ছে, যাদের প্রধান বাসস্থান নিউ ইয়র্ক সিটির বাইরে হলেও শহরে তাদের উচ্চমূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ি রয়েছে। 

গভর্নর হোচুলের প্রশাসন এখনো করের সুনির্দিষ্ট হার প্রকাশ করেনি। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কর থেকে বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অর্থ নিউ ইয়র্ক সিটির প্রায় ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়তা করবে। দীর্ঘদিন ধরে ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর বিরোধিতা করলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় হোচুলের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট এবং ফেডারেল সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তাকে নতুন রাজস্ব উৎস খুঁজতে বাধ্য করেছে। 

নতুন বাজেটে শিশু পরিচর্যা খাতে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক বিনিয়োগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই অর্থের মাধ্যমে প্রি-কিন্ডারগার্টেন (প্রি-কে) ও ‘৩-কে’ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলোর জন্য শিশু পরিচর্যা সহজলভ্য করতে সরকার অতিরিক্ত সেন্টার ও সহায়তা কর্মসূচি চালু করবে। এছাড়া দুই বছর বয়সী শিশুদের জন্য পরীক্ষামূলক শিক্ষা ও পরিচর্যা কর্মসূচিও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কর্মজীবী বাবা-মায়েদের ওপর চাপ কমাবে এবং শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। 

বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অভিবাসন নীতিতে অঙ্গরাজ্যের কঠোর অবস্থান। নতুন পরিকল্পনায় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) কর্মকর্তাদের মুখোশ পরে অভিযান পরিচালনা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া বিচারকের অনুমোদিত পরোয়ানা ছাড়া অভিবাসন কর্মকর্তারা কোনো বাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল বা ধর্মীয় স্থানে প্রবেশ করতে পারবেন না। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও আইসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা চুক্তি করতে সীমাবদ্ধ করা হবে। অভিবাসন অধিকারকর্মীরা এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এতে অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়বে। তবে রিপাবলিকান নেতারা বলছেন, এসব পদক্ষেপ আইন প্রয়োগকে দুর্বল করতে পারে। 

নিউ ইয়র্কের উচ্চাকাক্সক্ষী জলবায়ু নীতির কিছু অংশ বাস্তবায়নে বিলম্বের সিদ্ধান্তও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০১৯ সালের ক্লাইমেট লিডারশিপ অ্যান্ড কমিউনিটি প্রোটেকশন অ্যাক্ট অনুযায়ী স্টেটের নির্গমন কমানোর যে সময়সীমা নির্ধারিত ছিল, তা এখন পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। স্টেট গভর্নমেন্টের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাধার কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ফেডারেল নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং প্রকল্প ব্যয়ের বৃদ্ধি এ ক্ষেত্রে বড় কারণ। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এটি নিউ ইয়র্কের পরিবেশ নেতৃত্বকে দুর্বল করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু সংকট মোকাবিলাকে আরো কঠিন করে তুলবে। 

গাড়ি বীমা খাতে পরিবর্তন আনতে গভর্নর হোচুল দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে আসছিলেন। নতুন বাজেটে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণের ওপর কিছু সীমা আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিশেষ করে বীমাবিহীন চালক, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো ব্যক্তি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত চালকদের ক্ষতিপূরণ সীমিত করা হবে। মানসিক কষ্ট, যন্ত্রণা ও ভোগান্তির জন্য ক্ষতিপূরণের সর্বোচ্চ সীমা ১ লাখ ডলার নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। বীমা কোম্পানিগুলো বলছে, এতে গাড়ি বীমার প্রিমিয়াম কমতে পারে। তবে আইনজীবী সংগঠনগুলো দাবি করছে, এটি দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন করবে। 

সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে বাজেটে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেসব চালক বছরে ১৬ বার বা তার বেশি স্কুল জোনে গতিসীমা লঙ্ঘন করবেন, তাদের গাড়িতে বিশেষ স্পিড-লিমিটিং ডিভাইস বসানো বাধ্যতামূলক করা হবে। এ প্রযুক্তি গাড়ির গতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। নিউ ইয়র্ক সিটির প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ গাড়ি এ নিয়মের আওতায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কর্মীরা এ পদক্ষেপকে ঐতিহাসিক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, এটি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

গভর্নর হোচুল আগামী নির্বাচনে পুনর্নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে এ বাজেটকে রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি বাজেটের মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং মধ্যবিত্ত পরিবারকে সহায়তা করার বার্তা দিতে চাইছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীরা বাজেটটিকে অতিরিক্ত ব্যয় ও কর বৃদ্ধির পরিকল্পনা বলে সমালোচনা করছেন। তাদের মতে, এ বাজেট সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ আরো বাড়াবে। 

যদিও গভর্নর প্রাথমিক সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছেন, আইনসভা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেট অনুমোদন করেনি। সিনেট ও অ্যাসেম্বলিতে আরো আলোচনা ও সংশোধনের পরই চূড়ান্ত ভোট অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এ বাজেট নিউ ইয়র্কের অর্থনীতি, আবাসন বাজার, পরিবেশ নীতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং অভিবাসন নীতিতে দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার বিষয়, চূড়ান্ত আলোচনার পর কতটা পরিবর্তন আসে এবং কোন নীতিগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়। 


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)