জননিরাপত্তার টেকসই রূপান্তর ও মব কালচার নির্মূলের আকাশ ছোঁয়া প্রত্যাশা ছিল সাধারণ মানুষের বিএনপি সরকারের কাছে। মানুষ অমন এক আশা থেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংসদে পাঠায়। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই যেসব বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়েছেন বিএনপি তার মধ্যে প্রধান ছিল আইনশৃংলার উন্নতি ও মানুষের আস্থা ফেরানো। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সফল। দেশে ভীতিকর সেই মব আর নেই। সন্ত্রাসও নেই। কঠোরহস্তে দমন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শেখ হাসিনার অনুপুস্থিতিতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব লাভের এক নম্বর দাবিদার ছিলেন তারেক রহমান বা বিএনপি। তারেক রহমান ছিলেন অপ্রতিদ্বন্ধী। বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সেটাই বলছিলেন। বাস্তবে মানুষ প্রমাণ দিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভীতিকর আমলে যেখানে স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টাও ছিলেন হুমকির মধ্যে। কথায় কথায় তার আবাসস্থল যমুনমুখী কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলনকারী মানুষের স্রোত বইয়ে দেয়া। কখনও কাকরাইল এলাকা, কখনও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের (পূর্বের শেরাটন) মোড়, কখনও শাহবাগ তোলপাড় হতো দাবি আদায়ে। এবং সেটা মূলত যমুনাকে ঘেরাও কর্মসূচি বা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সম্মুখে অবস্থান কর্মসূচি। এছাড়াও সেগুনবাগিচাস্থ প্রেসক্লাবের সম্মুখে, শাহবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট দাবি আদায়ের হট স্পট হয়ে উঠেছিল। রাস্তা বন্ধ করে এসব আন্দোলন চরম দুর্ভোগ তৈরি করে। পুলিশ ব্যর্থ হতো কখনও। কখনও হটিয়ে দিতো। কিন্তু কঠোর হতে পারতেন না। যদি তাদের উপরও আক্রমণ হয়। কিছু কিছু সময় পুলিশ প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা বজায় রাখতে, কাদানে গ্যাস, ওয়াটার স্প্রেসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতো। এছাড়াও সচিবলায়ে ঢুকে আন্দোলন, সচিবালয় ঘেরাও বিভিন্নভাবে আইনশৃংখলা নাজুক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল কিছুসংখ্যক মানুষ।
অন্তর্বর্তী সরকারে আমলে উল্লেখযোগ্য আন্দোলন
১. আনসার বিদ্রোহ: ২০২৪ সালের আগস্টে চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে আনসারদের সহিংস আন্দোলনে সচিবালয় এলাকায় সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত হয়।
২. আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলন: ২০২৫ সালের মে মাসে ‘জাতীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য’ ব্যানারে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ হয়, যার ফলে দলটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
৩. শ্রমিক আন্দোলন: বিশেষ করে ২০২৪-২৫ সালে আশুলিয়া ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
সামগ্রিকভাবে, ড. ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনামলে একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক সংস্কারের চেষ্টা ছিল, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মব জাস্টিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ফলে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের (১৮ মাস) মেয়াদে আন্দোলনের সংখ্যা এবং হতাহতের পরিসংখ্যান নিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও মানবাধিকার সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেশে ছোট-বড় অসংখ্য দাবি-দাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ সংগঠিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের দেওয়া তথ্যমতে, সরকারের প্রথম ১৬ মাসেই প্রায় ২,০০০টি আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। সরকারের দেড় বছর পূর্ণ হওয়ার সময় এই আন্দোলনের প্রকৃতি ও সংখ্যা সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য পাওয়া যায়: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম এক বছরেই ১,৬০৪টি সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। দেড় বছর শেষে এই সংখ্যা ২,০০০ ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
প্রধানত বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, চাকরি স্থায়ীকরণ (আনসার, গ্রাম পুলিশ, প্রাথমিক শিক্ষক), স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিলোপ এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে এসব আন্দোলন হয়েছে।
নেপথ্যে কারণ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জননিরাপত্তা যেভাবে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তাতে মানুষ ভীষণভাবে ছিল টটস্থ। কথায় কথায় মব। যেখানে সেখানে সন্ত্রাসে অস্থিরতা। মানুষ আইনশৃংখলাবাহিনীকে পাশে পাচ্ছিল না। কারণ জুলাই আন্দোলনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের রক্ষায় সাধারণ ছাত্র, তরুণ ও সাধারণ মানুষের মানসিক অবস্থা আমলে না নিয়ে যেভাবে নিজেদের রক্ষার্থে পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে ঢাল হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, তাতে আন্দোলনকারীদের শত্রুতার নিশানায় পরিণত হয় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। রাজনৈতিক পট পরির্বতনে পুলিশ যেমন আক্রমণ করেছে সরকারি নির্দেশে তেমনি পাল্টা আক্রমণও করেছে আন্দোলনকারীরা। সরকার পরিবর্তনের পরও সেই ক্ষোভ রয়ে যায়। সেটা মোটামুটি ভালই কন্টিনিউ হয় অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। ডাকলে পুলিশ আসতো না। এর কারণ হিসেবে যেটা জানা গেছে, যে অভিযোগ দেয়া বা দাবি-দাওয়া শোনার মত কেউ ছিল না। ফলে সবকিছুই পেশ হতো প্রধান উপদেষ্টার দফতর বরাবরে। আন্দোলনকারীদের অনেকে ছদ্মবেশে সন্ত্রাসীর রাজত্বও শুরু করে। মানুষ দিশেহারা হয়ে ওঠে।
মানুষের প্রত্যাশা
নির্বাচনে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অন্তত নিরাপদভাবে বেঁচে থাকার। রাত বা দিন। নিরাপদ ছিল না কোনো সময়। ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি চলে অনাবরত। তাও আবার সেনাবাহিনী মাঠে থাকার পরও। সেনা সদস্যরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। যতটুকু নিরাপত্তা সেটা তারাই ম্যানেজ করেছেন। পুলিশ ছিল অনেকটাই নিষ্কিৃয়। কারণ মবের শিকার পুলিশ সদস্যরাও হয়েছেন। নিহত হয়েছেন তারা। আহত হয়েছেন প্রচুর।
ফলে এমন একটা ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ ছিল উদগ্রীব। মুক্তিলাভের আশায় মানুষ ভোট দিতে কেন্দ্রে গেছেন। ভোট দিয়েছেন। বিএনপি সরকার প্রতিষ্টা করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা ফেরানোর জিরো টলারেন্স নিয়ে শুরু হয় কাজ। যার ফসল মানুষ দেখতে পেল তিন মাসের মধ্যে। মব, সন্ত্রাস যেন ম্যাজিকের মত উধাও। সরকার এমন কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে, যাতে পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। সর্বশেষ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা, ‘আমরা নিজেরাও ভুক্তভুগী যে জিডি ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে কোনো অভিযোগ যেন না শুনি’। পুলিশের প্রতি একের পর এক কঠোর নির্দেশনা। থানায় গিয়ে নিজ দলের বা কোনো দালালের তদবির যেন না শোনা হয় ইত্যাদি, মানুষও ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও যথেষ্ট পরিমাণ আস্থা ও ভরসাস্থল খুঁজে পেয়েছে সরকারে। এতে রাতারাতি পরিবর্তন পরিস্থিতির।
বর্তমান সরকারের ‘ম্যাজিক্যাল’ সাফল্যের প্রধান ছিল চেইন অফ কমান্ড পুনঃ প্রতিষ্ঠা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশের প্রতিটি স্তরে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব গ্রহণ করা হবে না। পুলিশের চেইন অফ কমান্ডে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনাই ছিল সাফল্যের প্রথম ধাপ।
মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা রুখতে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে ঘটে যাওয়া মব কালচারের হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সঞ্চার হয়েছে।
পুলিশের মনস্তাত্ত্বিক পুনর্বাসন: বিগত সময়ে পুলিশ যে জনরোষের শিকার হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে কাউন্সিলিং এবং জনগণের সাথে সরাসরি সংযোগ (কমিউনিটি পুলিশিং) বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুলিশ এখন থানায় আগত সাধারণ মানুষকে ভয় না পেয়ে সেবা দিতে অভ্যস্ত হচ্ছে।
অপরাধী দমনে নিরপেক্ষতা: দলীয় পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে অপরাধীকে কেবল ‘অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এটিই মূলত ‘ম্যাজিক’ হিসেবে কাজ করেছে, কারণ সন্ত্রাসীরা বুঝেছে বর্তমান প্রশাসনে কোনো ‘রাজনৈতিক শেল্টার’ নেই। সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনিক বার্তা ”অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থানায় গিয়ে কোনো লাভ হতো না, পুলিশ দরজা খুলতেও ভয় পেত। কিন্তু এখন পুলিশ নিজেই মহল্লায় টহল দিচ্ছে। রাত বিরেতে একা চলতেও আর ভয় লাগে না।”
এরপরও মানুষের আরো প্রত্যাশা সরকারের প্রতি।
মানুষ মনে করছেন-
১. এই কঠোর অবস্থান যেন দীর্ঘমেয়াদী হয়।
২. পুলিশকে আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামে আরও সমৃদ্ধ করা।
৩. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ ও পদায়ন বজায় রাখা।
সবশেষ
গত ২৫ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি যখন সৎ এবং প্রশাসনিকভাবে কঠোর হন, তখন আইনশৃঙ্খলা ফিরতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত করেছে। বর্তমান সরকারের এই সাফল্য প্রশাসনের উপর সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা পুনরায় ফিরিয়ে এনেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বর্তমান সরকার এ পরিস্থিতি যদি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে মানুষ তারেক রহমান বা বিএনপির প্রতি আরোও আস্থাশীল হয়ে উঠবে এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।