যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শহর নিউ ইয়র্কে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে বলে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট । নতুন প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিলে শহরটিতে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা নগরীর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাপক হারে নতুন পুলিশ নিয়োগ, আধুনিক কৌশলগত পরিকল্পনা এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় টার্গেটেড অভিযান পরিচালনার ফলেই এ ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টকমিশনার জেসিকা টিশ জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে শহরজুড়ে সামগ্রিক অপরাধের হার প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। তিনি বলেন, অভূতপূর্ব হারে নতুন পুলিশ নিয়োগ আমাদের অপরাধ দমন কৌশলকে আরো শক্তিশালী করেছে এবং এর ফল এখন দৃশ্যমান।
নতুন প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে নিউ ইয়র্ক সিটিতে মাত্র ১৯টি হত্যাকাণ্ড রেকর্ড করা হয়েছে। এটি একক মাসে ২০১৪ ও ২০১৭ সালের আগের রেকর্ড ২১টির থেকেও কম। এর ফলে শহরটি নতুন করে ইতিহাসের সর্বনিম্ন হত্যাকাণ্ডের রেকর্ড তৈরি করেছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে মোট ৭৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যেখানে ২০১৮ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৮৬। এছাড়া স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে এ বছর এখন পর্যন্ত কোনো হত্যাকাণ্ডই ঘটেনি, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনওয়াইপিডি কমিশনার জেসিকা টিশ বলেন, গত এক বছরে ব্যাপক নিয়োগের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, যা অপরাধ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় ৩৫,০০০ ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্য বিভিন্ন কৌশল বাস্তবায়নে কাজ করছেন।তিনি বলেন, আমরা যে কৌশলগুলো এক বছর আগে শুরু করেছিলাম, তার ফল এখন ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে। এটি একদিনে হয়নি, বরং ধারাবাহিক পরিকল্পনার ফল।
পুলিশ বিভাগ জানিয়েছে, অপরাধ কমানোর মূল ফোকাস ছিল গ্যাং সহিংসতা ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আনা। বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় টহল বাড়ানো হয়েছে। আসন্ন গ্রীষ্মকালকে সামনে রেখে এনওয়াইপিডি একটি বিশেষ সামার ভায়োলেন্স রিডাকশন প্ল্যানচালু করার ঘোষণা দিয়েছে। এটি বিভাগটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা মোতায়েন পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই পরিকল্পনার আওতায় প্রায় ৩ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্যকে শহরের ৭২টি প্যাট্রোল জোন, ৪০টি পুলিশ প্রিসিংকট, সরকারি আবাসন প্রকল্প এবং সাবওয়ে সিস্টেমে মোতায়েন করা হবে। উচ্চ অপরাধপ্রবণ এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ে পায়ে হেঁটে টহল জোরদার করা হবে। কমিশনার টিশ বলেন, আমাদের নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত তরুণ অফিসারদের ফিল্ড ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট এলাকায় মোতায়েন করা হচ্ছে, যেখানে আমরা জানি অপরাধ বেশি ঘটে।
নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাবলিক হাউজিং এলাকায় অপরাধ ৮ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। এ বছর এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৭২১টি ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে, যেখানে গত বছর একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৮৮৬টি। সাবওয়ে অপরাধও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়ে এ বছর ৭১১টি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে গত বছর একই সময়ে ছিল ৭১৫টি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে এপ্রিল মাসে। এনওয়াইপিডি জানিয়েছে, ওই মাসে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। চুরি কমেছে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ, গাড়ি চুরি কমেছে ২০ দশমিক ২ শতাংশ, ডাকাতি কমেছে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ
গুরুতর হামলা কমেছে ৬ শতাংশ, খুচরা দোকান থেকে চুরি কমেছে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এ পরিসংখ্যানগুলোকে পুলিশ বিভাগ সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে। নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কস বরোতে অপরাধ হ্রাস সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা গেছে। এ এলাকায় হত্যাকাণ্ড ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। এছাড়া এপ্রিল মাসে মাত্র চারটি হত্যাকাণ্ড রেকর্ড করা হয়েছে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। শুটিং ঘটনাও ৫৮ শতাংশের বেশি কমেছে। গত বছরের ৩১টির তুলনায় এ বছর ১৩টি ঘটনা ঘটেছে।
এপ্রিল মাসে ঘৃণামূলক অপরাধ শহরজুড়ে ৩৫ শতাংশের বেশি কমেছে। মোট ৫০টি ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে, যেখানে গত বছর ছিল ৭৭টি। তবে বছরের প্রথম অংশে কিছু উত্থান-পতন দেখা গেছে, বিশেষ করে ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে কিছু ঘৃণামূলক অপরাধ রেকর্ড করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
একটি ব্যতিক্রম হিসেবে, ধর্ষণ সংক্রান্ত রিপোর্ট ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এনওয়াইপিডি এ বৃদ্ধিকে ২০২৪ সালের একটি আইন পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা করেছে, যেখানে অপরাধের সংজ্ঞা সম্প্রসারিত করা হয়। তবে সামগ্রিকভাবে অন্যান্য সহিংস অপরাধ যেমন গুলি, ডাকাতি ও পাবলিক স্পেসে অপরাধ কমেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
কমিশনার জেসিকা টিশ বলেন, নতুন নেতৃত্ব কাঠামো ও নিয়োগ নীতির কারণে এনওয়াইপিডি আরো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সঠিক মানুষকে দায়িত্বে বসিয়েছি এবং তাদের সঠিক জায়গায় কাজে লাগিয়েছি।’ তিনি প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার উইলিয়াম ব্রাটনের একটি উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, সঠিক মানুষকে সঠিক আসনে বসানোই সফলতার মূল চাবিকাঠি।
গ্রীষ্মকালীন বড় ইভেন্ট যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা উদযাপন এবং বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ আরো বাড়বে বলে মনে করছে এনওয়াইপিডি। তাই শহরজুড়ে অতিরিক্ত নজরদারি ও টহল বাড়ানো হবে। পুলিশ বিভাগ বলছে, তারা অপরাধের এ নিম্নমুখী প্রবণতা ধরে রাখতে চায় এবং প্রযুক্তি ও ডেটা বিশ্লেষণ ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আরো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
নিউ ইয়র্কে অপরাধ কমে আসা শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে বিচ্যুতি রয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে হত্যাকাণ্ড ও সহিংস অপরাধের হ্রাস এনওয়াইপিডির জন্য একটি বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এ সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা এবং শহরের সব অঞ্চলে সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।